গণ-পরিবহন ঠিক ‘ইনডেমিনিটি’ পেলো?
গণ-পরিবহন ঠিক ‘ইনডেমিনিটি’ পেলো?

গণ-পরিবহন ঠিক ‘ইনডেমিনিটি’ পেলো?

এম জি হোসেন

এক শুভ প্রভাতে ঘুম থেকে জেগেই রাজধানীর বাসিন্দারা স্ববিস্ময় দেখতে পেল ‘নগরীর ভবঘুরে টোকাই, বস্তিবাসী, দিনমজুর, হাড়সর্বস্ব গার্মেন্টকর্মীসহ নগরীর কোটি বাসিন্দা এক রাতেই কোটিপতি বনে গেছে। সড়ক ও রাজপথগুলো রাতারাতি হয়ে গেছে ২-৩ গুণ প্রশস্ত। ‘মুড়ির টিন’ কথিত ফিটনেসবিহীন লক্কড়মার্কা বাস-মিনিবাসগুলো ফিট-ফাট এসিবাসে রূপান্তরিত হয়ে যানজটমুক্ত রাজপথে সুশৃঙ্খলভাবে ছুটে চলছে, এমনটি বেগম রোকেয়ার নারীস্থান গল্পের মতো কল্পনা করা গেলেও যদি বাস্তবানুগ না হয়, তা হলে শহরের প্রায় শতভাগ গণ-পরিবহন রাতারাতি সিটিং সার্ভিস হয়ে যাওয়া এবং পাঁচ টাকার ভাড়া ২০ টাকায় গিয়ে ঠেকার বিষয়টি প্রশাসনের চোখের সামনেই কীভাবে সম্ভব হলো? না ‘তারা দেখননি’ এমন বদনাম করা যাবে না। কারণ জনগণের দুর্গতি অনুধাবন করেই বোধকরি ‘সিটিং সার্ভিস’ নিষিদ্ধ করা হয়ে থাকবে। তবে দু’দিন পর তা প্রত্যাহার করে নেয়ার মানে কী এই যে, সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল?

গণ-পরিবহন একটি সেবাখাত হলেও তাদের কর্মকাণ্ড ও অর্থলিপ্সা জুলুমের সীমাই শুধু অতিক্রম করেনি। বরং আইনশৃঙ্খলাকেও পাত্তায় নিচ্ছে না। গত ৩ এপ্রিল দুই বাসের প্রতিযোগিতায় ডান হাত হারানো রাজীব হোসেনের অবস্থা এখনো শঙ্কটাপন্ন। পিতা-মাতাহীন রাজীব তিতুমীর কলেজের ছাত্র। লেখাটা যখন শেষ করলাম তখনই রাজীবের মৃত্যুর খবরটা পেলাম। লেখাপড়ার ফাঁকে টিউশনি করে কোনো মতে নিজের ও ছোটভাই-বোনদের খরচ চালাতেন রাজীব। দুই বাসের ওভারটেক প্রতিযোগিতায় ঘটনাস্থলেই তার হাতটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার চিকিৎসা ব্যয় বহন ও চাকরি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিন্তু এমন কাহিনীরতো শেষ নেই। বিষয়টি আদালতেরও নজরে এসেছে, কিন্তু তাই বলে চালকদের বেপরোয়া ও খামখেয়ালি মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছি কি? যেকোনো বাস স্টপেজে কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। এ ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে আরো দু’জন নারী একইভাবে বাসচাপায় গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রুনি আক্তার নামের একজনের পা থেঁতলে দিয়েছে বাস। ৫ মে দুই বাসের চাপায় পড়ে রিকশা আরোহী আয়েশা খাতুনের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। ডাক্তার বলেছেন, এদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার গোপালগঞ্জে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে হাত হারিয়েছেন একজন শ্রমিক।

এখন প্রশ্ন হলো, যাত্রীদের পকেট ইজারার পাশাপাশি তাদের জীবনের ব্যাপারেও এমন দায়মুক্তি মনোভাবের উৎসটা কী? ‘মানুষ আর গরু চেনা’র যোগ্যতাও কী এদের নেই। ওভারটেকেরও তো নিয়ম আছে। সুযোগ পেলেই ডান-বাম যেকোনো দিক দিয়েই এরা ডুকে পড়বে। প্রতিদিন শত শত গাড়ির গ্লাস ভাঙ্গা, বডি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এরা কেউ কারো বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেয় না। যাত্রী উঠছে নামছে, ড্রাইভারের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। এভাবে ওঠানামার দৃশ্য অতি সাধারণ। এর কারণ নির্দিষ্ট স্থানে বাস না থামিয়ে ‘বাস দাঁড়ানো নিষেধ’ লেখা স্থানেই দৌড়ের ওপর কাজটা সেরে থাকে। সুযোগমতো এরা ৫ টাকা ভাড়া (অবশ্য বিআরটিসি ছাড়া কোনো বাসেই ৫ টাকা ভাড়া নেই বলা চলে।) ২০ টাকায় উঠে যাচ্ছে। মহিলা এবং স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা সবসময়ই এদের রূঢ় আচরণের শিকার ‘২০ টাকার নিচে ভাড়া নেই’, ‘৫০ টাকার নিচে ভাড়া নেই’ এমন বেআইনি হাঁক-ডাক সবসময়ই শুনতে পাওয়া যায়, এমনকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সামনেও। সিটিং সার্ভিসের নামে ২-৩ গুণ ভাড়া আদায় করা হলেও বাড়তি যাত্রী নিতে পিছিয়ে নেই কেউই।
যানজটের অন্যতম কারণ এই ড্রাইভাররা নিজেই। পেছনের গাড়ির গতিরোধে ৪৫০ কৌণিক অবস্থানে এরা দাঁড়াবেই। তা ছাড়া যেখানে সেখানে যাত্রী তোলার ব্যাপারটিতো আছেই। চলন্ত অবস্থায় মোবাইলে কথা বলা, ধূমপান কোনোটারই কমতি নেই। এহেন পরিপ্রেক্ষিতে নগরজীবনের বিড়ম্বনা এড়াতে নিচে কিছু পরামর্শ দেয়া গেল। ০১. স্বেচ্ছাচারিতার মূল কারণ ঘুষ ও চাঁদাবাজি। সব পর্যায়ে মূলোৎপাটনে ব্যবস্থা নেয়া হোক। ০২. ট্রাফিক রুলস যথাযথ প্রতিপালনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক। ০৩. মালিক সমিতিগুলোর কাজের আওতা নির্দিষ্টকরণসহ নিয়ন্ত্রণে আনা হোক। ০৪. একই রুটে একাধিক পরিবহন সংস্থার গাড়ি চালু থাকলে প্রত্যেকের জন্য স্টপেজ নির্ধারিতকরণ জরুরি। এটি সময়ের অপচয়, অবাঞ্ছিত প্রতিযোগিতা এবং যানজট নিরসনে অনেকটাই সহায়ক হবে। ০৫. প্রতিটি গাড়ির বডিতে স্টপেজগুলো লিখে রাখার পাশাপাশি প্রতিটি স্টপেজ অনুযায়ী ভাড়ার তালিকা বাসের ভেতর ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক হওয়া জরুরি। ০৬. সিটিং সার্ভিস-গেটলক ইত্যাদি মোট পরিবহনের ১০ শতাংশের মধ্যে সীমিতকরণ প্রয়োজন। এ ছাড়া সিটিং সার্ভিসগুলোতে দাঁড়ানো যাত্রী নেয়া প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার। ০৭. মহিলাদের জন্য আলাদা বাস এবং ২০ ভাগ সিট রিজার্ভসহ সম্ভাব্য ক্ষেত্রে আলাদা দরজার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। ০৮. সর্বনিম্ন ভাড়া ৩ টাকা, (সিটিং-এর ক্ষেত্রে ৫ টাকা) এবং কিলোমিটারপ্রতি ১.৭৫ টাকা ও ২.০০ টাকা নির্ধারিত করা উচিত। ০৯. অপরিচ্ছন্ন, নোংরা ও জরাজীর্ণ গাড়িগুলো অপসারণ।

১০. সরকার তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের প্রতি যে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে তা প্রশংসারযোগ্য। কিন্তু একই দায়িত্ববোধের হকদার অন্যরাও। সুতরাং এদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মালিকপক্ষ ও সরকারের সমঅংশীদারিত্বে বিশেষ তহবিল বা বীমার ব্যবস্থা থাকা উচিত। জাতীয় বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ জরুরি যাতে করে দুর্ঘটনাকবলিত কোনো ব্যক্তি বা পরিবারই স্বাভাবিক জীবন থেকে সিটকে না পড়ে। ১১. গড় হিসেবে দেশ মধ্যম আয়ের দিকে এগোচ্ছে মনে করা গেলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় আদৌ বাড়েনি বা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো বাড়েনি। এসব দুস্থ বেকার ও স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য বিনা ভাড়ায় বা বিশেষ ছাড়ে যাতায়াতের জন্য ‘কার্ড’ ইস্যু করা উচিত। এজন্য মালিকদের সরকারের তহবিল থেকে সিট ক্যাপাসিটির ৫-১০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে। ১২. গণ-পরিবহনে গণ-ধর্ষণ, ধর্ষিতাকে হত্যার ঘটনায় দিল্লির পরই বোধ করি আমরা দু’নম্বরে। ওখানে বাসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রচণ্ড আন্দোলন হলেও এ দেশে হয়নি কিছুই। অথচ শুধু বাসেই নয়, এ ধরনের পাশবিক ঘটনা ট্রেনে, নৌকায়, লঞ্চেও ঘটছে। গত কয়েক মাসে এমন একাধিক ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে এসে থাকলেও ওটাই আসল চিত্র এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। দেশে ধর্ষণ-গণধর্ষণের যে মহামারী দেখা দিয়েছে অনেকের দৃষ্টিতে এটি তার থেকে আলাদা কিছু নয়। এহেন পরিস্থিতির মোকাবেলায় শুধু শাস্তিই যথেষ্ট নয়। নৈতিক ও ধর্মীয় চেতনার জাগরণ ছাড়া এই পরিস্থিতির যথার্থ সমাধান আছে বলে মনে হয় না। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদের এদিকেও নজর দেয়া দরকার। ১৩. পরিবহন সেক্টরে আরেকটা বড় সমস্যা মাদকাসক্তি। শিশু-কিশোররা পর্যন্ত এতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদক অনেক অপরাধেরই সূতিকাগার। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুশীলন করছে বলে প্রতীয়মান। সুতরাং এ বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.