আসামে ৫০ লাখ মুসলিমের নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কা
আসামে ৫০ লাখ মুসলিমের নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কা

আসাম সঙ্কটের নেপথ্যে

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাজনীতিতে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতার ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। একটা গুমোটবাধা আতঙ্ক কাজ করছে শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে। আর তা এ অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। মূলত, এসব অঞ্চলের মুসলমানেরা ব্যাপকভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। চীনে উইঘুর মুসলমানদের ওপর চলছে নিকৃষ্ট দমন-পীড়ন। চীনা সরকার তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা সঙ্কুচিত করতে করতে এখন তা প্রান্তসীমায় নামিয়ে এনেছে। ভারতেও মুসলমানদের ওপর চলছে নির্মম জুলুম-নির্যাতন। কাশ্মিরের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আন্দোলন সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিয়ে প্রতিনিয়ত হত্যা করা হচ্ছে স্বাধীনতাকামীদের। ভারতীয় বাহিনীর জিঘাংসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। ভারতের বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে তথাকথিত পুশব্যাকের বিষয়টি অতি পুরনো।

পুশব্যাক খেলাটা ভারতের প্রযোজনায় মঞ্চায়িত হলেও তা আর এক নিকট প্রতিবেশী মিয়ানমারও কাজে লাগাতে শুরু করেছে। তারা ভিন্ন আদলে মুসলমানদের ওপরে একবিংশ শতাব্দীর নিকৃষ্টতম হত্যা ও নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধদের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা খোলা আকাশের নিচে অনাহারে-অর্ধাহরে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব শরণার্থীরা মানুষ, কিন্তু তাদের কোনো মানবাধিকার নেই, নেই কোনো স্থায়ী নিবাস এবং কোনো রাষ্ট্রই তাদের নাগরিক অধিকার দেয়নি। ফলে তারা রাষ্ট্রহীন ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতি। শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার কারণে বিশ্ববিবেক অনেক ক্ষেত্রেই নীরব।

ভারতের বিজেপিশাসিত রাজ্য আসামেও একই তাণ্ডব শুরু হয়েছে। প্রাদেশিক সরকার সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ৩০ লাখ বাঙালি মুসলিমকে ভিনদেশী আখ্যা দেয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ‘বাংলাদেশী অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে এসব বাঙালি মুসলিমদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। এ নিয়ে আসামজুড়ে প্রবল উৎকণ্ঠা-আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আসামে ৬০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। তারা যেকোনো মূল্যে বাঙলি মুসলমানদের সে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে চায়। কারণ, ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিমমুক্ত এক নতুন ভারতের দিবাস্বপ্নে বিভোর। কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, ‘আসামে বসবাসরত ‘অবৈধ বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করতেই এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে যাদের নাম থাকবে না, তাদের ফেরত পাঠানো হবে।’ তবে যেসব হিন্দু বাংলাদেশে কথিত নিপীড়নের শিকার হবার কথা বলে আসামে আশ্রয় নিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি অনুসারে তাদের আসামে আশ্রয় দেয়া হবে বলেও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ফলে এটি করা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আসাম রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্য- বিদেশী শনাক্ত নয়, বরং ‘মুসলিম খেদাও’ তাদের আসল লক্ষ্য। কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, কেবল বাংলাদেশী মুসলিমদের বিতাড়িত করার জন্যই নাগরিক তালিকাটি প্রকাশ করা হচ্ছে। স্থানীয় মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, নিবতুনকে ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের মতো তাদেরও রাষ্ট্রহীন করা হবে। সে প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকার অনেকটাই অগ্রসর হয়েছে চাণক্যবাদী রাজনীতিরই অংশ হিসেবে।

পলাশী ট্রাজেডি ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার নির্মম পরিণতি ছিল ইংরেজ ও তাদের এদেশীয় এজেন্টদের মুসলিমবিরোধী ষড়যন্ত্রেরই ফসল। বিষয়টি আরো দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আদেশে প্রথম বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়। ১৭৬৫ সালের পর থেকেই বিহার ও উড়িষ্যা বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে বাংলা অনেক বড় হয়ে যায় এবং বৃটিশ সরকারের পক্ষে এর সুষ্ঠু শাসনক্রিয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত এখান থেকেই। কিন্তু বাংলার এই বিভক্তির ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলমান কিছুটা হলেও উপকৃত হতেন। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণযোগাযোগের ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতেন অনেকটাই।

বঙ্গভঙ্গের কারণে পূর্ববঙ্গের মুসলমানেরা কিছুটা হলেও যে সুবিধা অর্জন করেছিল তা বর্ণ হিন্দুদের পছন্দ হয়নি। ফলে তারা বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য আন্দোলন শুরু করে। তারা এই বিভাজনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজ লাগাতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। তারা বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ‘বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদন’ ঘটেছে বলে ব্যাপক প্রচার চালায় কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় আবারো বাংলা প্রদেশ বিভক্ত হলেও অবিভক্ত বাংলার ধ্বজাধারীরা টু-শব্দও করেনি।

বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হয় এবং পরিণামে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। ভাষাতাত্ত্বিক এরই সাথে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে নয়া দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়। ফলে ঔপনিবেশিক শাসন- পরবর্তী অবিভক্ত ভারতের ধারণাটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবই এ জন্য প্রধানত দায়ী।

মূলত, ভারতীয় রাজনীতিকদের এমন সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির কারণেই পরে ভারতকে অখণ্ড রাখা সম্ভব হয়নি। আর সে জন্যই মুসলিম নেতারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে। সাম্প্রদায়িকতার কারণেই অখণ্ড ভারতে যোগ দেয়া মুসলমানদের পক্ষে মোটেই সম্ভব ছিল না। লাগোর সম্মেলনে জিন্নাহ তার দুই ঘণ্টারও অধিক সময়ব্যাপী বক্তৃতায় দ্বি-জাতিতত্ত্ব ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি দাবি করার পেছনের যুক্তিগুলো তুলে ধরেন। তার যুক্তিগুলো সাধারণ মুসলিম জনতার মন জয় করে।

লাহোর প্রস্তাব মুসলমানদেরকে একটি জাতীয় চেতনা প্রদান করে। তখন থেকে মুসলিম রাজনীতির প্রধান ধ্যান-ধারণা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব অর্জনের দাবির রূপ পরিগ্রহ করে।

২৪ মার্চ প্রবল উৎসাহের মধ্য দিয়ে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়। হিন্দু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রগুলো লাহোর প্রস্তাবকে ক্যামব্রিজে বসবাসরত ভারতীয় মুসলিম রহমত আলী কর্তৃক উদ্ভাবিত নকশা অনুযায়ী ‘পাকিস্তানের জন্য দাবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। ১৯৪০ সালের প্রস্তাবের কোথাও পাকিস্তানের উল্লেখ নেই।

হিন্দু সংবাদপত্র প্রস্তাবটিকে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ হিসেবে উল্লেখ করাতে সাধারণ জনগণের মধ্যে এর পূর্ণ গুরুত্ব¡ জনে জনে প্রচার করার ব্যাপারে মুসলমান নেতাদের অনেক বছরের পরিশ্রম কমে যায়। ১৯৪১ সালের ১৫ এপ্রিল মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাবকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্রে একটি মৌল বিষয় হিসেবে সন্নিবেশ করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা পর্যন্ত এটি লীগের প্রধান বিষয় ছিল। ১৯৪০ সালের পরবর্তী সময় থেকে ভারতীয় স্বাধীনতার বিতর্কের প্রধান প্রসঙ্গ ছিল পাকিস্তান।

ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামের পৃথক দু’টি রাষ্ট্রের উন্মেষ ঘটে। কিন্তু মুসলিম নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণে ভারত বিভাজনের ক্ষেত্রে লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী আসামও পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের মানদণ্ডে পুরো বাংলাই পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়াই যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু মুসলিম নেতাদের তাড়াহুড়ার কারণেই আসাম ও বাংলার অংশ বিশেষ পাকিস্তানের হাতছাড়া হয়ে যায়। যার পরিণাম আসাম ও পশ্চিম বাংলা সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। বর্তমান আঙ্গিকে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে অভিবাসন প্রবাহে বিধিনিষেধ ছিল না। জীবিকার সন্ধানে, বিশেষ করে গরিবেরা শ্রমিকস্বল্পতা, ভূমি প্রাপ্তি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের সুযোগ থাকার কারণে আশপাশের এলাকায় পাড়ি জমাত। গত ২০০ বছর ধরে এই এলাকার লোকজন উত্তর-পূর্ব অঞ্চলগুলোতে পাড়ি দিয়েছে। আরাকানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু বর্তমানে যে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সীমানা রয়েছে, তাতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃআঞ্চলিক উভয় ধরনের প্রতিযোগিতাই রয়েছে। শ্রম অভিবাসনকে রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করার কারণেই মিয়ানমার ও ভারতে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে ভারতের আসাম রাজ্য থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের বিতাড়নের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। আসাম থেকে বের করে দেয়া মানে, বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা সৃষ্টি করা। রোহিঙ্গা সঙ্কটে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সক্ষমতার অভাব আছে এবং দেশটি বেশ অপ্রস্তুতও। ফলে বাংলাদেশের সামর্থ্য ও সম্পদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি পড়েছে।

তাতে আসাম থেকে যদি বাংলাদেশী মুসলমানদের বহিষ্কার করা হয়, তাহলে এ অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। একই সাথে বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়দের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়বে। তৈরী পোশাকসহ অনেক খাতে বহু ভারতীয় কাজ করছে।

আসাম থেকে গণহারে মুসলমানদের বহিষ্কার করা হলে রোহিঙ্গা সঙ্কটের চেয়ে অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে। এটা বাংলাদেশের জন্য অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি আঞ্চলিক সঙ্কটও সৃষ্টি করতে পারে। অনেকের মতে, ভারত বিভাজনে লাহোর প্রস্তাবের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের অভাবেই উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে নতুন সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। তদানীন্তন নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণেই এ অঞ্চলের মুসলমানেরা এখনো বিভিন্নভাবে নিগ্রহের শিকার। আর এ অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের বিষয়টি আবারো সামনে আসা অসম্ভব নয়।
smmjoy@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.