সাত বছর পর বাংলাদেশ থেকে আবারো কর্মী যাবে আমিরাতে
সাত বছর পর বাংলাদেশ থেকে আবারো কর্মী যাবে আমিরাতে

সাত বছর পর বাংলাদেশ থেকে আবারো কর্মী যাবে আমিরাতে

মনির হোসেন

দীর্ঘ সাত বছর জনশক্তি রফতানি (পুরুষ) বন্ধ থাকার পর অবশেষে আবারো খুলতে যাচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। সেখানে কর্মী নিয়োগকারী সংস্থা তাদবির সার্ভিস সেন্টারে কর্মীদের জমা পড়া আবেদন যাচাই বাছাইয়ের পরই নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। গত বুধবার দেশটির সরকার ১৯ ক্যাটাগরিতে কর্মী নিয়োগের জন্য বাংলাদেশের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। সর্বশেষ ২০১২ সালে দেশটিতে পুরুষ শ্রমিক গিয়েছিল। এরপর থেকে তারা শুধুই বাংলাদেশ থেকে গৃহপরিচারিকা নিতে ভিসা ইস্যু করছিল।


এ দিকে আমিরাতের বন্ধ শ্রমবাজার খুলতে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়ে দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে শ্রমবাজার দ্রুত খুলে দেয়ার জন্য দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর বৈঠক করেছেন। তাকে তারা শ্রমবাজার খুলে দেয়ার ব্যাপারে বারবার আশ্বস্ত করলেও কোথায় যেন বাধা হয়ে আটকে যায়। তারপরও তিনি আশাবাদী ছিলেন। এমন কথাই তিনি নয়া দিগন্তের প্রতিবেদকের কাছে আগে বলেছিলেন। অবশেষে তার ওই চেষ্টার ফল গত বুধবার সার্থক হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানোর লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে এমওইউ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।


শুধু রাষ্ট্রদূত নয়, শ্রমবাজার খোলার ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, সচিব ড. নমিতা হালদারসহ মন্ত্রণালয়ের পলিসিমেকাররা দফায় দফায় যৌথ বৈঠক করার কারণে সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারটি চালু হওয়ার পথে রয়েছে বলে মনে করছেন এ সেক্টরের সাথে জড়িত অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা এ মার্কেটে যাতে কোনো ধরনের ‘কালো ছায়ার’ প্রভাব না পড়ে সেই ব্যাপারে সরকার, প্রশাসন, বায়রা নেতারাসহ সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।


তাদের অভিযোগ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এবার যে সিস্টেমে কর্মী যাওয়ার ব্যাপারে এমওইউ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে তাতে সরকার নির্ধারিত এক লাখ ৬৫ হাজার টাকার অভিবাসন ব্যয়েই একজন কর্মী যেতে পারবেন। তারপরও নতুন ফর্মুলাকে বাধাগ্রস্ত করতে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের সময় দুবাইয়ে অবস্থান করাটাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তারা এসব রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের ব্যাপারে সরকারসহ সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, যদি কোনো কারণে এই বাজার বন্ধ হয় তাহলে এর দায়দায়িত্ব ওই সব ব্যবসায়ীকে নিতে হবে।


গতকাল রাতে একজন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ নাম না প্রকাশ করে নয়া দিগন্তকে বলেন, সাত বছর পর ইউএই’র শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া অবশ্যই সরকার তথা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিরাট সাফল্য। কিন্তু এ মহৎ উদ্দেশ্যকে ম্লান করতে একটি গ্রুপ কিছুদিন আগে থেকেই দেশটিতে তারা যাওয়া-আসা অব্যাহত রেখেছে। এখন থেকেই তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে বলে তিনি মনে করেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শ্রমবাজারে নজরদারি থাকার জন্য ইউএই সরকারই তাদবির নামে সরকারি একটি সার্ভিস সেন্টার গঠন করেছে। রিক্রুটমেন্ট কিভাবে হবে তা এ প্রতিষ্ঠানই নির্ধারণ করবে।


এর আগে গত বুধবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুবাইয়ের স্থানীয় সময় দুপুর সোয়া ১২টায় বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ১৯টি ক্যাটাগরির কর্মী নিয়োগে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার এনডিসি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড এমিরেটাইজেশনের আন্ডার সেক্রেটারি সাইফ আহমেদ আল সুআইদি নিজ নিজ দেশের পক্ষে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন। সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই কার্যকর হয়েছে।

এ সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড এমিরেটাইজেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নাসের আল হামলি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আজহারুল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো: সুজায়েত উল্ল্যা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক তারেক আহমেদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুবাইয়ে নিযুক্ত কনসাল জেনারেল এস বদিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশ থেকে ১৯টি ক্যাটাগরির কর্মী নিয়োগের বিধান, পদ্ধতি, রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি ও উভয় দেশের সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য, কর্মীদের অধিকার, সুযোগ-সবিধা, এমপ্লয়ারদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, নিয়োগ চুক্তির বিধান ও পৃথক একটি বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাসহ ইত্যাদির বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।


সংযুক্ত আরব আমিরাতে এসব কর্মীর স্বার্থ রক্ষার্থে ২০১৭ সালে কার্যকর হওয়া আইনের আলোকে সমঝোতা স্মারকটিতে শ্রমিক, মালিক ও উভয় দেশের সরকারের দায়িত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল শ্রম অভিবাসনের লক্ষ্য অর্জনের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষর করা হয়েছে বলে জানানো হয়। সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়নে উভয় দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি জয়েন্ট কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

এ কমিটিকে কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশী কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া আবার শুরু হবে বলে উল্লেখ করা হয়। এর আগে বুধবার আরব আমিরাতের দুবাইয়ে দুই দেশের মধ্যে সফল আলোচনার পর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার এনডিসি সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান সাংবাদিকদের জানান, ২০১২ সালের পর থেকেই এ শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে আছে। সেই ক্ষেত্রে এই এমওইউ চুক্তি একটি বড় অগ্রগতি। বৈঠকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও হিসাব নিরীক্ষকদের নিতে তারা আগ্রহী।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.