কবিতা রূপে ও বিষয়ে
কবিতা রূপে ও বিষয়ে

কবিতা রূপে ও বিষয়ে

মতিন বৈরাগী

কবিতা লিখতে যে দু’টি দিক প্রাথমিক প্রয়োজন তা হলো বিষয় এবং বিষয়কে প্রকাশ করার জন্য প্রয়োজনীয় রূপ। কবি বিষয় প্রকাশের উপযুক্ত রূপকাঠামো তৈরিতে ব্যর্থ হলে কবিতাও বিষয়বস্তুকে উপযুক্ততার সাথে প্রকাশে সমর্থ হবে না। বিষয় সমাজিক ও বস্তুগত। আর তা হলেই কবিতা-শিল্পে কোনো না কোনো রাজনীতির উপস্থিতি লক্ষণীয় হবেই। আবার আঁতেলদের মতলব অনুযায়ী বিষয় সামাজিক হতে যাবে কোন দুঃখে। কবি কি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যে সারাদিন রাজনীতি নিয়ে ভাববেন। বাস্তবে তিনি যে সারাদিন রাজনীতির মধ্যেই তার সব কর্মসম্পাদন করছেন তা অনুভব করতে চান না সার্থতার কারণে অথবা চেতনাহীনতার কারণে। কেউ কেউ শিল্পকে রাজনীতির সঙ্গে মিশ্রিত করতে রাজি নন। তাদের মতে শিল্প নিরপেক্ষ সত্তা। শিল্প আলোচনার মধ্যে রাজনৈতিক সামাজিক কাণ্ডক্রিয়ার সম্পর্ক থাকতে নেই। বাস্তবে রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই মরতে হবে/পথ জুড়ে তুই করছিস বড়াই সরতে হবে, কিংবা নজরুল যখন লিখলেন বিদ্রোহী আর তা মানুষ গ্রহণ করল। আজো তা মুক্তির আনন্দে উচ্চকণ্ঠ হয়। তাহলে স্বীকার করে নিতে কষ্ট কী কবিতার বিষয় ও রূপ রাজনীতিবর্জিত কোনো বিষয় নয়। বরং যারা এর বিরোধিতা করতে চায় করে তারাই শিল্প নিয়ে ফেরেববাজীর রাজনীতি করে। তারা প্লেটোর ভাবশিষ্য, যে দাস সমাজকেই সমর্থন করেছিল। এরিস্টেটলও তাই করেছেন, তবে দর্শনের ক্ষেত্রে গুরু প্লেটোর মতবিরুদ্ধ বিষয় নিয়ে ভেবেছেনও। যদিও ওই মত খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি, ফেলেছে প্লেটোর মতো।

কারণ, পরবর্তীরা পরবর্তী সমাজের রাজনীতির লোক হলেও সমাজ কাঠামোটা তো বদলে যায়নি, সামান্য কিছু হেরফের হয়েছে মাত্র। তাই ব্যাপক অংশ এরিস্টেটলকে গ্রহণ করে না যে ছিল প্রাক-বস্তুবাদী দার্শনিক। যে বলেছিল, ‘শিল্প প্রেরণা বস্তুলগ্ন এবং মানুষের জন্য’। মানুষের জন্যই যদি হয়; তা হলে ভালো কবিতা না হয়ে আমরা কেন তৈরি করছি স্তবস্তুতির কবিতা? নিশ্চয়ই সামাজিক ব্যধি দ্বারা শিল্পী-কবিরা কখনও কখনও আক্রান্ত হয়। সে ব্যধির চিকিৎসাগার একমাত্র বদল সমাজ, বদল রাষ্ট্র, বদল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। এরিস্টেটল আরেকটি মূল্যবান মত প্রকাশ করেছিলেন তা হলো- ‘মানুষ জন্মগতভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব’। স্বীকার করতেই হবে, মানুষের কোনো কাজ সমাজ বহির্ভূত নয়, এবং রাজনীতিহীনও নয়। স্বাভাবিক সব সৃজন কর্মই সমাজলগ্ন এবং সমাজই হচ্ছে শিল্পীর চিন্তার আগার। ভাবচিন্তাও সমাজে বর্তমান এবং তাও কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে যায়। বা চলতি পন্থাকেই দীর্ঘায়ু করে। একটি কবিতা রূপ লাভ করার আগে একজন শিল্পী যে প্রেরণা পান তা সেই প্রেরণা দায়ির থেকে নয়, আর যদি সে তা বিশ^াসও করে হোমার, ভার্জিল, শেকসপিয়ারের মতো, তাহলেও তা সামাজিক। কারণ, সমাজ ওই অবস্থাটা প্রবল আকারেই ধরে রেখেছে। আমাদের এখানেও যাত্রাগানের আরম্ভে এ জাতীয় বন্দনা দেখেছি আমরা ছোটবেলায়।

কেবল আবেগ কেবল কল্পনাই একজন কবির জন্য যথেষ্ট নয়; তার প্রকাশের রূপ নির্মাণে, এ জন্য দরকার প্রতিভার। প্রতিভা সবারই কম বেশি আছে, তার বৃদ্ধি ঘটে সুযোগ ও প্রয়োগচেষ্টায়। একজন খেলোয়াড় একজন পড়–য়া একজন চিকিৎসাবিদ, প্রমুখ বা একজন কবি বা শিল্পীর প্রতিভার বিকাশ ঘটে কোনো একটি বিষয়ে স্থিরমস্তিষ্ক ও চিত্তনিবদ্ধতায়, রাজনৈতিক চেতনা, প্রশিক্ষণ, এবং অদম্য আকাক্সক্ষায়। তবুও যেনো নির্জনতা এবং একাকিত্ব ভাবুকমনকে বেশি দোলায়িত করতে পারে, এবং বিষয়ের গভীর তলদেশে প্রবেশের মধ্য দিয়ে তার অনুসন্ধানকে বিস্তৃত করতে পারে। যেমন বাল্মিকী। চিত্ত নিবদ্ধতায় আসক্তি থেকে মুক্ত হয় ব্যক্তির কল্পনাশক্তি; রচিত হয় রামায়ন। প্রতিভা নির্মাণদক্ষতাকে বাড়ায়। সে কারণে সৃষ্টিশীল মানুষের নির্জনতাও প্রয়োজন। আবার সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থাও একজন শিল্পীকে প্রেরণা দেয়, নানা ঘটনাবলী থেকে সে লাভ করে প্রেরণা।

যেমন মার্কেজের এক শ’ বছরের নিঃসঙ্গতার প্রেরণা ছিল তার সমাজ যা চার শ’ বছর উপনিবেশিক শাসনে আটকে ছিল। বা কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখেনি এই প্রেরণা তার আকাশলব্ধ জ্ঞান নয়, লাগাতার যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্যে এমনটিই ঘটেছিল। কেবল প্রতিভা তাকে সংগঠিত রূপ দিতে পেরেছে এবং বলাতে পেরেছে ‘গু খাব’। নজরুল যে বিদ্রোহী লিখলেন তাও কিন্তু কলোনিয়াল শাসনের বিরুদ্ধে সমাজে জাগ্রত ছিল। নজরুল তার সঠিক রূপকার। কবি ফররুখ আহমদের জাগরণী কবিতাকে ইসলামি বলে চালিয়ে দেয়ার অর্থ সঙ্কুচিত করা, বরং সমাজগঠন, দেশ ও সময়কেই উপজীব্য করেছেন তিনি। তাও রাজনীতি।

ক্রোচের মতে একমাত্র দুর্বল শিল্পীরাই রূপনির্মাণে মগ্ন, আর তলস্তয় প্রায় সমকণ্ঠে রূপসচেতন শিল্পীকে ধিক্কার দিয়েছিলেন। ক্রোচে মনে করতেন মনই শিল্পের আদি ও অকৃত্রিম। সুতরাং, শিল্পের রূপবৈচিত্র্য বা চমক নিয়ে বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। অন্য দিকে তলেস্টয়ের মতে রূপ সচেতন শিল্পী কেবল শিল্পকে রূপসর্বস্ব করে তোলে, ফলে সাধারণ পাঠকের তা নাগালের বাইরে চলে যায়। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ লেখকদের তিরস্কার করেছিলেন এমনকি নিজেকেও। বিনোদন বিষয়টিই মানুষের, গরু-ছাগলের বিনোদনের প্রয়োজন পড়ে না। আর সেই মানুষ সামান্যই। এমনো লক্ষণ দেখা যায়, যে কোনো কবিতা যারা প্রসংশা করছে তাদের অনেকেই হয়তো তা হৃদয়াঙ্গম করতে পারেনি সঠিকভাবে কিন্তু প্রশংসা করেই চলেছে। একেই বলে গড্ডালিকাপ্রবাহ। [জীবনানন্দের গোধূলির নৃত্য কবিতা নিয়ে সমকালের কতকের আলোচনা এবং এখানেও ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে আছে। কারণ, শিল্পে বহু কিছু অব্যক্ত থাকে] যদিও কাব্য কখনও কখনও নির্মাণে নানা চিন্তাকে ধারণ করে প্রকাশে রূপ পায় তার সাথে পাঠকের মনের সঙ্গতি ঘটা খুব একটা সহজ নয়। কারণ, ব্যক্তির মনঃগতির ভিন্নতা আছে। ভাবনারও স্ফূর্ততায় ব্যতিক্রম ঘটে।

ভাববাদী দর্শনের গুরু প্লেটো। তার মত থেকে লাফিয়ে বলা যায় স্রষ্টাই সুন্দর, যার কোনো ত্রুটি নেই। আর তাই সুন্দর যখন কাউকে বিস্ময়কররূপে অভিভূত করে তখন তা অবশ্যই স্বর্গীয় কারণ, প্রকৃতি সুন্দর নয়। ‘প্লোটোর কাছে সৌন্দর্যের বিশিষ্টরূপ পরম সত্তার [বিয়িং] আকারে প্রকাশিত যা বিশেষ ও পৃথক সব রূপকে অতিক্রম করে যায়।’ সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব, হাসানাত আবদুল হাই] জগতে জরা শোক তাপ অনুশোচনা রয়েছে, রয়েছে হিংসা খুন হানাহানি লুট ও আমির বিবৃতি। রয়েছে অসমতা অন্যায় এবং পাশবিকতা। প্লেটো ভাবতেন স্বর্গে তা নেই। স্বর্গ সুন্দর কলুষমুক্ত। তিনি আরও মত দিয়েছিলেন, ভাবনা থেকে বস্তুর উদ্ভব তাই বস্তু ভাবে। কারণ, ভাবনা থেকেই বস্তুপ রূপ ও প্রকাশ। কবিরা যা লেখেন তার প্রেরণা তারা অলৌকিক থেকে পেয়ে যান। কিন্তু তিনি যখন কবিদের নির্বাসন চাইলেন এবং তার কল্যাণরাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক বিবেচনা করলেন, তখন যে যুক্তি তিনি হাজির করলেন তা আজকের যুক্তির ধোপে টেকে না। তিনি নিজেও কবিতা লিখেছেন, এবং ১১টি কবিতা অধ্যাপক বদিউর রহমান অনুবাদ করেছেন ইংরেজি থেকে। [ প্লেটো কাব্যভাবনা] তার একটা কবিতা এ রকম- ‘ভোরে ছিলো শুকতারা/আলো দিতে জীবনের বুকে/এখন সন্ধ্যায় তারা/আলোকিত করো মৃত্যুকে।’ ‘সাঁঝতারা’। তার অভিযোগ হলো- কবিরা মিথ্যে না বললেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। এবং এর দ্বারা মানুষ বিভ্রান্ত হয়। তার ছাত্র এরিস্টেটলই প্রথম জানালেন ভাবনা বস্তুলগ্ন। প্রেরণা বস্তুময় বিশ^ থেকে প্রাপ্ত সামাজিক এবং রাজনৈতিক। কিন্তু কেউ কেউ এটা বলতেও ভালোবাসেন ‘কবিতা লেখা যায় না, কবিতা আসে, আসে ওপর থেকে আর তারপর কবি লেখেন’ সেই সূত্র থেকে স্বার্থবাদীদের এই হলো কবিতা প্রসঙ্গে বিবৃতি, যা তারা প্রায়সই দিয়ে থাকেন। রবীন্দ্রনাথও বলেছেন ‘সত্যই সুন্দর’ তার হিসেবেও সুন্দর তুলনামূলক নয়, কারণ সত্য তুলনাযোগ্য নয়। আংশিকও নয়। আবার কোনো কারণেই সত্যকেই অ্যাবসলিউট ভাবা যায় না, আর সামগ্রিক না হলে তা অখণ্ড নয় সত্যও নয়। স্বাভাবিক যে খণ্ডিত সত্য খণ্ডিত সুন্দরের জন্ম দেবে। স্থান-কালের ব্যবধানে সত্যও পরিবর্তিত হয়।

তাই সেকালের সুন্দর আর একালের সুন্দর ভাবনা ঠিক সমপর্যায়ের নাও হতে পারে, এবং এ ক্ষেত্রে বিশ^জনীন সুন্দর রূপের ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে। সুন্দর গ্রহণ ব্যক্তির আবেগ রুচি ও অনুধাবনের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়। তা কখনও ভাবে কখনও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতায়। যেমন আমরা বলি চিনির মতো মিষ্টি। তা আমরা জিহ্বা দ্বারা আস্বাদন করেই বলি। আবার বলি অপূর্ব জলপ্রপাত, স্বর্গীয় তা আমরা চোখদ্বারা দেখে বলি। ‘সৌন্দর্য একটি বিশেষ সামঞ্জস্য বোধ, লাল কী, নীল কী, সবুজ কী, মধুর কী, তিক্ত কী, এর স্বরূপ লক্ষণ দেয়া যায় না’ [ সৌন্দর্য তত্ত্ব, সুরেন্দ্র নাথ দাশগুপ্ত] কেউ কেউ বলেন তারা কাব্যের রসজ্ঞ। তার তার সমগ্রতা ভোগ করেন, এর অফল বিচার নিষ্প্রয়োজন। যেমন চিনি খাওয়ায় আনন্দ আছে, চিনির উপাদান বিচার নিরর্থক। থিওরি অব অ্যাসথেটিকসে উল্লেখ আছে, কোনো বহির্বস্তু সুন্দর নয়। আমাদের অন্তরের ভিক্ষাবৃত্তির প্রসারকেই সুন্দর বলা যায়। ‘কোনো কবি বা শিল্পী তার কল্পনার দ্বারা প্রকৃতিকে বিশোধন না করলে সেই প্রকৃতিকে সুন্দর বলা যায় না। মানুষই প্রকৃতিকে নিজের করে শোধন করে নেয় তার অনুভব সুন্দর বলে মহিমা দেয়। এ প্রসঙ্গে মার্কেসের একটা কথা আছে, হিউম্যানাইজড ন্যাচার। অর্থাৎ মানুষ প্রকৃতিকে জয় করছে তাকে বদলেছে, তাকে ব্যবহার উপযোগী করেছে, তার রূপে পরিবর্তন এনেছে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং তার স্বভাবরুচি অনুযায়ী।

সঙ্গত বিষয় যেমন কবির নিজস্ব চৈতন্যজাত তেমনি রূপেও তার স্বকীয়তা বর্তমান থাকে দক্ষতা ও প্রতিভার সঠিক প্রয়োগে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.