কেটে যাওয়া ও রক্তপাত হওয়া
কেটে যাওয়া ও রক্তপাত হওয়া

কেটে যাওয়া ও রক্তপাত হওয়া

ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

রক্তনালীগুলো (শিরা ও ধমনী) শরীরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে রক্ত বহন করে। রক্তনালী কেটে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তপাত হয়ে থাকে। শরীর থেকে রক্তপাত হতে থাকা একটি মারাত্মক অবস্থা। দ্রুত রক্তপাত বন্ধ না করলে তা বিপজ্জনক হতে পারে।

কী করবেন
ঘরে বসেই কাটা জায়গার যত্ন নিতে পারেন, যদি-
ষ ত্বকের কেবল ওপরের স্তরটা ছিঁড়ে যায়।
ষ কাটা জায়গা দুই প্রান্ত লেগে থাকে।
ষ ১৫ মিনিটের মধ্যে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়।
তবে সাধারণভাবে বেশ কিছু ব্যবস্থা নিতে পারেন, যেমন-
ষ কেটে গিয়ে রক্ত ক্ষরণ হলে সাথে সাথে ক্ষত স্থানে হাত দিয়ে সামান্য চেপে ধরবেন, তাতে রক্তের প্রবাহ রোধ হবে।
ষ হাত কেটে গেলে সে স্থানটি উঁচু করে ধরে রাখবেন। এ সময় রোগীকে শুইয়ে দেবেন।
ষ তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
ষ ক্ষত স্থান একটি পরিষ্কার কাপড় বা প্যাড দিয়ে বেঁধে দেবেন।

কী করবেন না
ষ রক্তপাত বন্ধ করার জন্য টুরনিকেট বাঁধবেন না। চাপ দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করবেন।
ষ জীবাণুমুক্ত কাপড় বা ড্রেসিং খোঁজার জন্য সময় নষ্ট করবেন না।
ষ কাচ বা অন্য কোনো রক্ত ত্বকে ঢুকে থাকলে তা টেনে বের করার চেষ্টা করবেন না।

কখন ডাক্তার দেখবেন
কেটে গেলে ডাক্তারকে দেখানো প্রয়োজন, যদি-
ষ প্রান্তসীমাগুলো না মেশে।
ষ কাটা স্থানটি ফাঁক থাকে।
ষ একটানা চাপ দেয়ার ১৫ মিনিট পরেও রক্তপাত বন্ধ না হয়।
ষ কাটা স্থানটিতে ময়লা দ্রব্য লেগে থাকলে।
ষ এসব কাটা স্থানে সেলাই দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

আপনি শুধু হাসপাতালে নেয়ার পথে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ক্ষত স্থানটা হালকা করে চেপে ধরে রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে রাখবেন।
আর যদি আপনার সন্তানের মুখ কিংবা মাথা কেটে যায় এবং মাথার ওই স্থানটা ভেতরের দিকে ডেবে গেছে মনে হয়, তাহলে চাপ দেবেন না। স্থানটি একটা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাবেন।

প্রতিরোধ
ষ ধারালো বস্তু, পাত্র, গৃহসরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি জিনিসপত্র শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।
ষ বাইরে খেলাধুলার সময় শিশুর পায়ে জুতা পরিয়ে দিন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২, ইংলিশ রোড, ঢাকা। ফোন : ০১৬৭৩৬৪৯০৮৩ (রোমান)


পাইলস থেকে কি ক্যান্সার হতে পারে?
অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক

পাইলস রোগটি আমাদের দেশের সাধারণ রোগীদের কাছে পরিচিত একটি রোগ। সর্বসাধারণের ধারণা পায়ুপথের বিভিন্ন সমস্যা যেমন রক্ত যাওয়া, ব্যথা হওয়া, ফুলে যাওয়াÑ এ সবই হয় পাইলস রোগের কারণে। কিন্তু আসলে এ ধারণা সঠিক নয়। উপরিউক্ত প্রতিটি উপসর্গই পায়ুপথে ক্যান্সার হলে হতে পারে। আবার ফিস্টুলা বা ভগন্দর রোগেও উপরিউক্ত উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে।

আবার এমন হতে পারে যে, প্রথমত পায়ুপথে ক্যান্সার হয়েছে সেটিও ফিস্টুলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, যেমন ইতোমধ্যেই লেখক একজন রোগীর (৬৫) অপারেশন করেছেন ফিস্টুলা হিসেবে কিন্তু মাংস পরীক্ষা (বায়োপসি) রিপোর্টে দেখা গেল ক্যান্সার। এই ফিস্টুলা রোগীর যে ক্যান্সারের কারণেই ফিস্টুলা হয়েছে তা অপারেশনের আগে কোনো পরীক্ষায় ধরা পড়েনি। ধরা পড়েছে শুধু অপারেশনের পর নিয়মিত মাংস পরীক্ষার রিপোর্টে। যদি ভুলক্রমে বা কোনোভাবে এ রোগীর বায়োপসি না করা হতো তাহলে তার ক্যান্সার ধরা পড়ত অনেক দেরিতে যখন চিকিৎসার অযোগ্য হতো। আশার কথা এই যে, লেখক মোটামুটি সব ফিস্টুলা রোগীর নিয়মিত মাংস পরীক্ষা করে থাকেন। এ রোগীর ইতিহাস নিয়ে দেখা যায় তিনি নিজে একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক।
চার বছর ধরে তার এই সমস্যা চলছে এবং তিনি নিজে চিকিৎসক বলে হোমিও ওষুধ খেয়ে যাচ্ছেন। তার মলদ্বার থেকে দূরে একটি মুখ থেকে পুঁজ ও রক্ত পড়ত। এটিকে সাধারণ ফিস্টুলা মনে করে তিনি নিজে দীর্ঘ দিন ধরে ওষুধ খাচ্ছিলেন। বেশির ভাগ ফিস্টুলা রোগীর ক্যান্সার থাকে না। পায়ুপথের ক্যান্সার যখন দীর্ঘ দিন চিকিৎসাবিহীন থাকে তখন এটি মলদ্বারের পাশে ছিদ্র হয়ে বের হয়ে আসে এবং সেখান থেকে পুঁজ যায় আবার কখনো কখনো রক্ত যায়।

লেখকের দেখা অন্য একজন মহিলা রোগী (৫৫) যিনি রাজধানীর একটি কলেজের অধ্যাপক দেড় বছর ধরে মলদ্বারে রক্ত যাচ্ছে। পায়খানা কিয়ার হয় না। নিজে নিজে ল্যাক্সেনা ট্যাবলেট খাচ্ছেন পেট পরিষ্কার করার জন্য। পায়খানার বেগ এলে কিছু তরল জিনিস বের হয়ে আসে কিন্তু পায়খানা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে এরূপ ভাব। মাঝে মধ্যে টয়লেটে রক্ত যায়। ইদানীং মলদ্বার ও কোমরের নিচের দিকে ব্যথা মলদ্বার থেকে পেছন দিকে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা। উল্লেখ্য, ভেতরের ব্যথা কোমরে অনুভূত হতে পারে আবার উরুর দিকেও সম্প্রসারিত হতে পারে।

এই রোগীর প্রাথমিক ইতিহাস শোনার পর লেখকের স্বাভাবিকভাবেই একটু সন্দেহ হয়েছে। অতঃপর তার সিগময়ডস্কপি ও প্রকটস্কপি পরীক্ষায় ধরা পড়ে যে তার রেকটামের ভেতর ক্যান্সার আছে। কিন্তু রোগীর বিশ্বাস তিনি পাইলসে ভুগছেন। বিস্তারিত ইতিহাস না নিলে ভুল হতো। কারণ রোগীর সাদামাটা বক্তব্য হচ্ছে যে তার রক্ত যায় এবং পায়খানা ক্লিয়ার হয় না। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে রোগীরা মলদ্বারের ভেতর যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করাতে চান না। ব্যথা হতে পারে এই ভেবে খুব ভয় পেয়ে যান। জিজ্ঞাসা করেন যে, এই পরীক্ষা করলে আমি আগামীকাল অফিসে যেতে পারব কি না। এটি নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এ পরীক্ষায় সামান্য অস্বস্তি ছাড়া কোনোরূপ ব্যথা হয় না।
বেশির ভাগ রোগীই এ পরীক্ষায় কোনোরূপ ব্যথা পান না। এ পরীক্ষার জন্য খুবই সামান্য সময়ের প্রয়োজন। সারা দিন না খেয়ে থাকার প্রয়োজন হয় না। মলদ্বারে তীব্র ব্যথা আছে এমন রোগীদেরও এ পরীক্ষা করা যায়।

সম্মানিত রোগীদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই যে, উপরিউক্ত সমস্যা দেখা দিলে সবারই ক্যান্সার হয়েছে। তবে এ কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যেসব রোগে পায়খানার সাথে রক্ত যায় তার মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রক্ত যায় যেসব রোগে সেগুলো হচ্ছে : ১. অ্যানালফিশার, ২. পাইলস, ৩. রেকটাল পলিপ (শিশুদের বেশি হয়), ৪. ক্যান্সার, ৫. আলসারেটিভ কেলোইটিস, ৬. ফিস্টুলা ও অন্যান্য।

আমরা মফস্বল থেকে আসা অনেক রোগী দেখি যাদের ক্যান্সার আছে অথচ হাতুড়ে চিকিৎসকরা তাদের ইনজেকশন দিচ্ছেন। কোনো কোনো হাতুড়ে চিকিৎসক আবার এক ধাপ এগিয়ে সেখানের অপারেশনেরও মহড়া দিচ্ছেন। আবার কখনো কখনো একই রোগীর পাইলস ও ক্যান্সার থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা যদি পাইলসের চিকিৎসা করি তাহলেও দেখা যায় যে রোগীর সমস্যা যাচ্ছে না, তখন মলদ্বারের ভেতর লম্বা যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা (সিগময়ডস্কপি বা কোলনস্কপি) করলে ক্যান্সার ধরা পড়ে। এ জাতীয় সমস্যাও মাঝে মধ্যে দেখা যায়।

মোট কথা, মলদ্বারের মুখ থেকেও রক্ত যেতে পারে আবার অনেক ভেতর অর্থাৎ রেকটাম বা বৃহদান্ত্রের (Colon or large intestine) ভেতর থেকেও রক্ত যেতে পারে। কী কারণে যাচ্ছে তা বিশেষ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে একজন উপযুক্ত চিকিৎসক বলে দিতে পারেন। কিছু কিছু রোগী বলেন, আমার পাইলস হয়েছে আমাকে কিছু ওষুধ দেন খেয়ে দেখি পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার নেই। কিন্তু লেখক বিশেষ ধরনের পরীক্ষা না করে অনুমাননির্ভর পাইলস চিকিৎসার বিপক্ষে। কারণ এতে যে রোগীদের ক্যান্সার আছে তা শনাক্তকরণে বিলম্ব হবে। বিলম্বিত চিকিৎসায় ক্যান্সারে ভালো ফলাফল আশা করা যায় না।

লেখক : এমবিবিএস, এফসিপিএস, এফআইসিএস, বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ বিশেষজ্ঞ, ফেলো, কলোরেকটাল সার্জারি (সিঙ্গাপুর), ইন্টারন্যাশনাল স্কলার, কলোরেকটাল সার্জারি (যুক্তরাষ্ট্র), প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, (অব) কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
চেম্বার : ইডেন মাল্টি-কেয়ার হসপিটাল, ৭৫৩, সাতমসজিদ রোড, (স্টার কাবাব সংলগ্ন) ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭৫৫৬৯৭১৭৩-৬, ৫৮১৫০৫০৭-১০।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.