ads

ঢাকা, শুক্রবার,২০ এপ্রিল ২০১৮

প্রথম পাতা

কোটা আন্দোলনের ৩ নেতা আটকের পর মুক্ত : ঢাবিতে বিক্ষোভ

মামলা প্রত্যাহার দাবিতে আলটিমেটাম আন্দোলনকারী ও পরিবারের নিরাপত্তা দাবি

নিজস্ব ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

১৭ এপ্রিল ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০১৮,মঙ্গলবার, ০১:৪০


প্রিন্ট
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের পুলিশি হয়রানির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ : নয়া দিগন্ত

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের পুলিশি হয়রানির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ : নয়া দিগন্ত

সরকারি চাকরিতে কোটা থাকবে নাÑ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন ঘোষণার পর দেশের শিক্ষাঙ্গন শান্ত হয়ে আসলেও কোটা আন্দোলনের নেতাদের আটক এবং নানামুখী হুমকি-ধামকিতে তা আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। রাজধানীর শাহবাগে পুলিশের সাথে কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় শাহবাগ থানায় একাধিক মামলার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন নেতাকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর মুক্ত হয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন তারা। একই সাথে ঝিনাইদহে আন্দোলনকারী এক নেতার বাবাকে আটক করে পরে ছেড়ে দেয় পুলিশ। 

এসব ঘটনার প্রতিবাদে আবারো বিক্ষোভ করেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তারা অবিলম্বে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা দুই দিনের মধ্যে প্রত্যাহারের আলটিমেটাম দেন। একই সাথে আন্দোলনকারী ছাত্রদের পরিবারেরও নিরাপত্তা দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। তবে আন্দোলনকারী তিন নেতাকে আলোচনার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে দাবি করেছে পুলিশ।
এ দিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’। গতকাল রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে বিআরটিএর মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সকাল ১০টায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নামে মামলা প্রত্যাহার ও তাদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা গুজব’ ছড়ানোর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরণ পরিষদের নেতারা। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহতদের দেখে বেরিয়ে আসার সময় কেন্দ্রীয় কমিটির তিন যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন, রাশেদ খান ও নূরুল হক নূরকে আটক করে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। সেখান থেকে তাদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে আটকের প্রায় দুই ঘণ্টা পর তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। সেখান থেকে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দ্বিতীয় দফায় সংবাদ সম্মেলন করেন তারা।
এ সময় কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর জানান, ‘আন্দোলন করতে গিয়ে যারা আহত হন তাদের দেখতে তারা তিনজন রিকশায় করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। বেলা দেড়টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে যাওয়ামাত্র সাদা পোশাকের ডিবি পুলিশের কয়েকজন সদস্য অস্ত্র দেখিয়ে তাদের তিনজনকে মাইক্রো বাসে ওঠায়। পরে একজনের চোখ বেঁধে ফেলে। এ অবস্থায় ডিবি পুলিশের সদস্যরা তাদের বলেন, তাদের কাছ থেকে কিছু তথ্য নেবেন এবং ভিডিও দেখাবেন। এরপর তাদের গুলিস্তানে নিয়ে যান। সেখানে ডিবি পুলিশের সদস্যরা কয়েকটি গামছা কেনেন। পরে গামছা দিয়ে তাদের বাকি দুইজনের চোখ-মুখ বেঁধে ফেলেন। রমনায় ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে তাদের চোখ-মুখ খোলা হয়। বেলা আড়াইটার দিকে তাদের ছেড়ে দেয় ডিবি পুলিশ। এরপর তারা ক্যাম্পাসে চলে আসেন।’
আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, ‘আমাদের ওপর নাকি বিপ গ্রুপ হামলা চালাবে। এ জন্য আমাদের নিরাপত্তার জন্য ধরে নিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করে ডিবি পুলিশ।’ রাশেদ খান অভিযোগ করেন, তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ পৌরসভায়। আজ সকালে ঝিনাইদহ থানার পুলিশ তাদের বাড়িতে হানা দেয়। দুপুরে তার বাবাকে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে বিভিন্ন ধরনের গালিগালাজ করা হয়েছে। তার বাবা ও তিনি জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তবু পুলিশ জোর করে তাদের পরিবারকে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ করতে চাইছে।
তিনজনের ভাষ্য, বেলা পৌনে ১টার দিকে তাদের একটি গাড়িতে তুলে গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। চোখ খুলে দেয়ার পর দেখেন, তারা একটি ক।ে সেখানে তাদের বলা হয়, তাদের কিছু ভিডিওফুটেজ দেখানো হবে। কিন্তু তাদের কিছুই দেখানো হয়নি। তিন নেতা আরো বলেন, পরে তাদের নাম-ঠিকানা নিয়ে বেলা পৌনে ৩টার দিকে ছেড়ে দেয়া হয়। তারা জানান, মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে তাদের নেয়া হয়েছিল। এ সময় তাদের কোনো নির্যাতন করা হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে নেতারা আরো জানান, বেলা ২টা ৫৫ মিনিটে তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। তাদের দেখে অন্যরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে স্বাগত জানান। এ সময় আন্দোলনকারী তিন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, তারা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা এ ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তাও দাবি করেন।
এর আগে ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নুরুল হক নূর অভিযোগ করে বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে আমাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভিত্তিহীনভাবে যে অজ্ঞাতনামা মামলা দিয়েছে, তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তা এখনো প্রত্যাহার করেনি। দুই দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিার্থীদের বিরুদ্ধে যে মামলা দিয়েছে, তা প্রত্যাহার করা না হলে ফের আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান ও ফারুক হাসান। তিনি বলেন, আমরা আন্দোলন শুরুর পর থেকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আমাদের সব কিছু তদন্ত করে দেখেছে। আমাদের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না। কিন্তু তারা নেগেটিভ কিছু না পাওয়ায় আমাদের হয়রানি করেনি। যখন প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবি মেনে নিয়েছেন, তখন একটা কুচক্রিমহল আমাদের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত বলে অপপ্রচারের চেষ্টা করছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমাদের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কিত করা মানে সরকারকে বিতর্কিত করা। দেশকে অস্থিতিশীল করা।
তিনি আরো বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির বাসায় হামলা হয়েছে, এর সাথে কোনো সাধারণ শিার্থী জড়িত নন। কিন্তু একটি জাতীয় দৈনিক রিপোর্ট করেছে কেন্দ্রীয় কমিটির একজনের নেতৃত্বে হামলা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ভিসির বাড়িতে হামলার সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হোক। আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হলে ছাত্রসমাজ মানবে না।
আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মহসীন হল ছাত্রলীগের সহসভাপতি। আমার পরিবার আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত। আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। একটা জাতীয় দৈনিকে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে আমি নাকি ২০১২ সালে সূর্যসেন হলে ছিলাম। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ভর্তি হই ২০১৩ সালে। হলে উঠি ২০১৩ সালে। সেখানে বলা হয়েছে আমি হলে থাকি না ২০১২ সাল থেকে। অথচ আমি এখনো সূর্যসেন হলে থাকি। আমার যে রুম নম্বর দেয়া হয়েছে তাও ভুল দেয়া হয়েছে। রিপোর্টে আমার বাবার নামও ভুল দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমরা ফেব্রুয়ারির ১৭ তারিখ থেকে শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলন করে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে আমরা আন্দোলন থেকে সরে এসেছি। কিন্তু বাংলাদেশের একটা কুচক্রিমহল এখন আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে। গতকাল বাংলাদেশের একটা জাতীয় দৈনিক রিপোর্ট করেছে আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি নাকি বিএনপি ও জামায়াতের সাথে জড়িত। অথচ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের ডিটেইলস গোয়েন্দা সংস্থারা নিয়ে গেছে। তারা তখন কিছু পায়নি। কিন্তু হঠাৎ করে আমাদের নেগেটিভলি উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সারা বাংলার ছাত্রসমাজকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবেন না। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী।’
কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন নেতাকে আটকের ব্যাপারে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কিছু তথ্য সহযোগিতার জন্য তাদের আনা হয়েছিল। তারা চলে গেছে। তাদের কিছু ভিডিওফুটেজ দেখানো হয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে তাদের কাছ থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে। তাদের আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি।’
এ দিকে দ্বিতীয় দফার সংবাদ সম্মেলন শেষে বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরণ পরিষদ। মিছিলটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। তবে সেখান থেকে নতুন কোনো কর্মসূচির ঘোষণা দেননি আন্দোলনকারীরা।
রাশেদের বাবা আটক, পরে মুক্ত : এ দিকে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার আন্দোলনের জন্য গঠিত সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানের বাবা নবাই বিশ্বাসকে আটকের পর গতকাল বিকেলে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এর আগে বেলা আড়াইটার দিকে ঝিনাইদহের চরমুরাড়ীদহ গ্রাম থেকে নবাই বিশ্বাসকে আটক করে সদর থানা পুলিশ। নবাই বিশ্বাস পেশায় রাজমিস্ত্রি।
ঝিনাইদহ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এমদাদুল হক বলেন, ‘একটি পত্রিকায় তারা জামায়াত-শিবির করে বলে লেখা হয়েছে। তাই পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা ও জামায়াত-শিবিরের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার জন্য আমরা তাকে এনেছিলাম। কথা বলে তার নাম-ঠিকানা সঠিক পেয়েছি। কিছুণ কথা বলার পর স্থানীয় কাউন্সিলর বশির আহমেদের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
ওসি আরো বলেন, ‘নবাই বিশ্বাসকে আটক বা গ্রেফতার কোনোটাই করা হয়নি, হয়রানিও করা হয়নি।’

 

ads

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫