সম্ভাবনার নাম স্বর্ণদ্বীপ

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার স্বর্ণদ্বীপ যেন এক সম্ভাবনার নাম। বলা হচ্ছে, সিঙ্গাপুরের সমান আয়তনের এ দ্বীপটি বাংলাদেশের জন্য খুলে দিতে পারে অর্থনীতির নতুন দ্বার। পর্যটন ক্ষেত্রেও স্বর্ণদ্বীপের অপরূপ সৌন্দর্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে দেখা দিতে পারে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সম্প্রতি দ্বীপটি সফর করার পর তা আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৮ সাল থেকে মেঘনা নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পর্যায়ক্রমে জেগে উঠা দ্বীপটি ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১৪ কিলোমিটার প্রশস্ত। স্বর্ণদ্বীপটি সরকার ২০১২ সালে সেনাবাহিনীকে বরাদ্দ দিয়েছে স্থায়ীভাবে। ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্বর্ণদ্বীপে সেনাসদস্যদের নিবিড় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
এক সময় এ দ্বীপটি জলদস্যু ও ডাকাতসহ অপরাধীদের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিতি পেলেও সেনাবাহিনীর ক্রমাগত অপারেশনের কারণে এখন আর সেখানে কোনো অপশক্তির অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে সবুজ বনায়ন এবং সেনাবাহিনীর নানা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে তা নয়নাভিরাম এলাকায় পরিণত হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে নদীর ঘাট থেকে সেনাবাহিনীর ‘ময়নামতি ক্যাম্প’ পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার রাস্তা ও চারটি স্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনী ও জলবায়ু ট্রাস্টের আর্থিক সহায়তায় পরিকল্পিত পাঁচটি সাইক্লোন শেল্টারের মধ্যে দু’টির নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। অপর তিনটির কাজও এগিয়ে চলেছে। রেডিও লিঙ্কের মাধ্যমে এ বিরানভূমিতে টেলিফোন, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সুবিধা চালু করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ও জেনারেটর ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
২০১২ সালে সরকার স্বর্ণদ্বীপের প্রায় ১০ হাজার একর জমি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে। এরপর থেকে বনাঞ্চল সংরক্ষণের পাশাপাশি সেনাবাহিনী আরো প্রায় ৩০০ একর জমিতে নিজস্ব অর্থায়নে বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এ ছাড়া দ্বীপটির দুর্গম এলাকায় ‘সিড বোম্বিং’য়ের (হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বীজ ছড়ানো) মাধ্যমে কেওড়া বীজ ছড়ানো হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় উন্নত জাতের ১৫ হাজার নারিকেল গাছের বাগান করা হয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগে রোপণ করা হয়েছে ৬০ হাজার ঝাউগাছের চারা। বিশেষভাবে গড়ে তোলা হয়েছে মহিষ, গরু ও ভেড়া পালনের জন্য মিলিটারি ফার্ম। এ ফার্মের আওতায় রয়েছে অসামরিক ২০টি বাথানে প্রায় ১৩ হাজার মহিষ, ১৬ হাজার ভেড়া ও আট হাজার গরু।
এসব বাথান থেকে দুধ সংগ্রহ করে দুগ্ধজাত দ্রব্য তৈরির জন্য একটি কারখানাও স্থাপন করা হয়েছে। মিলিটারি ফার্মের আওতায় একটি হাঁসের খামার ও কবুতরের খামার তৈরি করা হয়েছে। প্রান্তিক চাষিদের সম্পৃক্ত করে স্বর্ণদ্বীপের ৬০ একর জমিতে ধান ও রবিশস্য উৎপাদন করা হচ্ছে। এরকম নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী।
এক সেনা কর্মকর্তা জানান, স্বর্ণদ্বীপ নিয়ে সেনাবাহিনীর উন্নয়নমুখী ভাবনা অনেক। তবে বর্তমানে প্রধানত সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এলাকা হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছে স্বর্ণদ্বীপটি। এখন পর্যন্ত এ দ্বীপে প্রায় ২৫ হাজার সেনা সদস্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। এখানে সেনাবাহিনীর ট্যাংক এবং এপিসিসহ নতুন প্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জামের বিশেষায়িত অনুশীলন পরিচালিত হয়ে থাকে, যা একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। এ ছাড়াও জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার আগে প্রাক-মোতায়েন প্রশিক্ষণেও স্বর্ণদ্বীপ ব্যবহৃত হচ্ছে।
সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ স্বর্ণদ্বীপে গিয়ে মুগ্ধতার কথা প্রকাশ করেন। তার মতে, স্বর্ণদ্বীপ হতে পারে আরেক সিঙ্গাপুর। এটা বাংলাদেশের মূল ভূমি থেকে আলাদা। সমুদ্রও কাছে। সবকিছু মিলে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা গেলে স্বর্ণদ্বীপ হবে বিরাট এক সম্ভাবনাময় স্থান।
বর্ষায় স্বর্ণদ্বীপের বড় একটি অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। পরিকল্পিতভাবে সমুদ্র থেকে ভূমি উদ্ধার করা গেলে বিরাট সম্ভাবনা নিয়ে আসবে এ দ্বীপ। নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ড থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, সন্দ্বীপ থেকে পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং হাতিয়া থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত স্বর্ণদ্বীপকে ঘিরে একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গত পাঁচ বছরে স্বর্ণদ্বীপে পরিকল্পিত বনায়ন, সাইক্লোন শেল্টার, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, নারিকেল বাগান, ঝাউ বাগান, গরু, মহিষ, ভেড়া, হাঁস, মুরগি ও কবুতরের খামার গড়ে তোলা হয়েছে। স্বর্ণদ্বীপ এবং সংলগ্ন এলাকাকে টেকসই দ্বীপে পরিণত করতে, বিশেষত সমুদ্র থেকে ভূমি উদ্ধারে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। স্বর্ণদ্বীপকে দেশের অর্থনীতির বিশেষায়িত অঞ্চলে পরিণত করা যায় এবং এ জন্যও দরকার ব্যাপক প্রস্তুতি। আমাদের বিশ্বাস, স্বর্ণদ্বীপকে দেশবাসীর স্বপ্ন পূরণের সোনালি ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব কিছুই করা হবে।
লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.