ঢাকা, সোমবার,২৩ এপ্রিল ২০১৮

ধর্ম-দর্শন

মাইকেল জ্যাকসনের আইনজীবী যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেন

মোঃ শরিফুর রহমান

১৫ এপ্রিল ২০১৮,রবিবার, ১৬:১৩


প্রিন্ট
মাইকেল জ্যাকসনের আইনজীবী যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেন

মাইকেল জ্যাকসনের আইনজীবী যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেন

‘ফেথ ম্যাটার্স’ একটি ব্রিটিশ সংস্থা। এ সংস্থাটি ইসলাম ধর্ম নিয়ে কাজ করছে। তাদের একটি জরিপে দেখা যায়, গত ১০ বছরে ব্রিটেনে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ ধর্মান্তরিত হয়েছে এবং এদের প্রায় সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। জরিপে জানানো হয়, যারা ধর্মান্তরিত হয়েছে তাদের কারো বয়সই ২৭-এর বেশি নয়। এদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা প্রায় ৬২ শতাংশ।

বিশ্ব মিডিয়া যখন ইসলামের সুন্দর রূপটিকে কদর্য হিসেবে উপস্থাপনে মাঠে নেমেছে, তখন ইসলামের অনুসারিদের সংখ্যা বৃদ্ধির এমন জরিপ ইসলামের সত্যতাই প্রমাণ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,

“তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতাদানকারী। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আন-নূর : ০৮)

মার্কিন নাগরিক মার্ক শেফার পেশায় আইনজীবী । তিনি ২৪ অক্টোবর ২০০৯ ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। শেফার আমেরিকার লস এনজেলেসের এক খ্যাতনামা অর্পিতসম্পত্তি আইন বিশেষজ্ঞ। তিনি মৃত্যুর এক মাস আগে মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি লড়েছেন।

ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হলেন কীভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে মার্ক শেফার বলেন, 'ইসলাম সম্পর্কে খুব অল্পই জানাশোনা ছিল। আমি যখন সৌদি আরব ভ্রমণ করলাম, সেখানকার মুসলিমদের জীবন যাপন প্রণালী দেখলাম । তাদেরকে প্রশান্তচিত্তে সালাত আদায় করতে দেখে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ বোধ করলাম। ইসলাম সম্পর্কে জানতে শুরু করা মাত্রই আমার প্রবল বিশ্বাস জন্মাল যে, এটি সত্য ধর্ম।

জাবি বিন নাসির শরীফ এক সৌদি ট্রাভেল গাইড। মার্ক শেফার ম্পর্কে তিনি বলেন, সৌদি আরব পৌঁছার পর থেকেই সালাত সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করেন শেফার। রিয়াদে আমরা দু'দিন অবস্থান করি। সেখানেও তিনি ইসলামের খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস অব্যাহত রাখেন। তারপর আমরা গেলাম নাজরান। সেখান থেকে আবহা আবার সেখান থেকে উলায় । উলায় পৌঁছার পর ইসলামের ব্যাপারে তার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।

আমাদের সঙ্গে আসা তিনজন সৌদি যুবকের প্রশান্তচিত্তে মর“ভুমির ওপর নামায পড়ার দৃশ্য তার হৃদয়কে প্রবলভাবে নাড়া দেয়।দু'দিন উলায় কাটিয়ে আমরা যাই জাউফ নামক স্থানে। জাউফে গিয়ে মার্ক শেফার আমার কাছে ইসলাম-সম্পর্কিত যে কোনো বই চাইলেন। আমি তাকে ইসলাম ধর্মের ওপর লিখিত কয়েকটি বই দেই। তিনি মনোযোগসহ সেসব পড়া শুরু করলেন। ভোরবেলা তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, নামায কীভাবে আদায় করতে হয়? আমি তাকে কীভাবে নামাজ পড়তে হয়, অযু করতে হয় তা ব্যাখ্যা করলাম। তৎক্ষণাৎ তিনি আমার পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আমার সঙ্গে নামাজ আদায় করলেন। নামাজ পর আমাকে জানালেন, তিনি নামাজ পড়ে খুব প্রশান্তি লাভ করেছেন।

আমরা জেদ্দায় ফিরে এলাম। তিনি কিন্তু বইয়ের ওপর চোখ বুলানো অব্যাহত রেখেছেন। শুক্রবার সকালে আমরা পুরান জেদ্দায় গেলাম। জুমার নামাজের সময় ঘনিয়ে এলে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। সবাইকে জানালাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি জুমার নামাজ পড়তে যাব।

মার্ক বললেন, 'আমি তোমার সঙ্গে যেতে চাই। আমি নামাজ পড়া দেখব।' আমি তাকে স্বাগত জানালাম। মসজিদে গেলাম এবং সমবেত অনেক মুসল্লির সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করলাম। একটু দুর থেকে সবই লক্ষ্য করছিলেন মার্ক শেফার। নামায পর সব মুসল্লি একে অন্যকে সালাম-সম্ভাষণ জানাচ্ছেন। সবার মুখে এক অপার্থিব খুশির দীপ্তি। এসব দৃশ্য তাকে খুবই মুগ্ধ করল।

আমরা যখন হোটেলে ফিরে এলাম, তিনি বললেন, 'আমি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে চাই।' আমি তাকে গোসল করতে বললাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি গোসল করলেন। আমি তাকে কালেমায়ে শাহাদাত পড়তে বললাম। তিনি পড়লেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ'। তারপর তিনি দু'রাকাত নামাজ পড়লেন। নামাজ পড়ে তিনি আমাকে বললেন, আমি সৌদি ত্যাগ করার আগে পবিত্র মক্কার হারাম শরিফে যেতে চাই। শনিবার সন্ধ্যায় হারাম শরিফে গিয়ে তিনি সালাত আদায় করলেন। সেখানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাকে ইসলাম গ্রহণের সাময়িক সনদ দেয়া হল।

মার্ক শেফারের হারাম শরীফ যাওয়া সম্পর্কে প্রফেসর মুহাম্মদ আমিন তুরকিস্তানি বলেন, সাময়িক সনদ গ্রহণের পর মার্ক শেফার এবং আমি মক্কার হারাম শরিফে গেলাম। হারাম শরিফ দেখামাত্র তার চেহারায় ফুটে উঠল এক অনাবিল আনন্দ। তার চেহারায় উদ্ভাসিত হল সৌভাগ্যের এক বিরল বৈভব। আমরা যখন হারামে প্রবেশ করলাম, সরাসরি পবিত্র কাবা দেখতে পেলাম। তখন তার আপাদমস্তকে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। প্রাপ্তি ও তৃপ্তিতে ভরে উঠলো যেন তার মন। আল্লাহর শপথ! আমি সে দৃশ্যের বর্ণনা দিতে অক্ষম। মার্ক শেফার কাবা তাওয়াফ করলেন। আমরা নামায পড়লাম। যখন ফিরছিলাম তখন মনে হচ্ছিল, এ ঘর তার কত আপন! কত চেনা! কাবাকে ছেড়ে তার মন যেন কিছুতেই ফিরে আসতে চাইছিল না।

ইসলাম গ্রহণের পর রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্ক শেফার বলেন, 'আমার পক্ষে এ মুহূর্তের অনুভূতি ব্যক্ত করা আসলেই সম্ভব নয়। শুধু এতোটুকু বলতে পারি যে, আমি এক নব জীবন লাভ করেছি। আজ আমার নতুন জীবনের সূচনা ঘটল।'

তিনি আরো বলেন, আমি তো সৌভাগ্যের চূড়ায় উপনীত হয়েছি। যখন হারাম শরিফে প্রবেশ করলাম, পবিত্র খানায়ে কাবা দেখলাম- সে যে কী প্রাপ্তি ও তৃপ্তির পূর্ণতার মুহূর্ত ছিল, তা আমি আপনাদের সামনে ব্যক্ত করতে সক্ষম নই।

পরে তিনি কী করবেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে মার্ক শেফার বলেন, 'আমি ইসলাম সম্পর্কে আরও বেশি বেশি জানার চেষ্টা করব। আল্লাহর দীন সম্পর্কে গভীরতায় পৌঁছার প্রয়াস চালাব এবং পবিত্র হজ সম্পাদনের জন্য অচিরেই আবার সৌদি আরবে ফিরে আসব।'

রোববার সকালে মার্ক আমেরিকার উদ্দেশে জেদ্দাস্থ কিং আব্দুল আজিজ বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পর্ব অতিক্রম করার সময় ধর্ম ঘরে লিখেন 'ইসলাম'।
সূত্র : সৌদি গেজেট

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫