ads

ঢাকা, শনিবার,২১ এপ্রিল ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

সিরিয়া রোডম্যাপ : রাশিয়া-ইরান-তুরস্ক একমত হবে কি?

লিওনিড ইসায়েভ

১৪ এপ্রিল ২০১৮,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গেল ৪ এপ্রিল এক ত্রিপীয় সম্মেলনে যোগ দেন ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। বৈঠকের এজেন্ডা ছিল সিরিয়া সঙ্কট। এই সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের শেষ দিক থেকেই চেষ্টা করছেন এই তিন নেতা। তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এর দুই সপ্তাহ আগে কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন, আঙ্কারার এই বৈঠকেও সেসব বিষয় নিয়েই আলাপ চলতে থাকে। মূলত, তারা আস্তানা আলোচনার একটি সারসংেেপ পৌঁছেছেন এবং বর্তমান সিরিয়ার সামরিক ও মানবিক পরিস্থিতি এবং সেই সাথে এই যুদ্ধের একটি রাজনৈতিক সমাধানের পদপে নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সিরিয়ার যুদ্ধত্রে কমিয়ে আনার ভবিষ্যৎ : তিন নেতার প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল যুদ্ধত্রে সীমাবদ্ধ করে আনা। গেল কয়েক মাসে পূর্ব ঘৌটায় যে পদপে নেয়া হয়েছে তার পরিপ্রেেিত এ ইস্যু বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনোরকম যুদ্ধ হবে না, প্রাথমিকভাবে সিরিয়ায় আগামী ছয় মাসের জন্য এমন চারটি অঞ্চল গঠনের ব্যাপারে গেল বছরের সেপ্টেম্বরে আস্তানায় অনুষ্ঠিত ছয় দফা বৈঠকে একমত হয়েছে রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরান। এই চারটি অঞ্চলের মধ্যে আছে পূর্ব ঘৌটাসহ ইদলিব, হোমস, লাতানিয়া, আলেপ্পো ও হামা প্রদেশ।
যেহেতু চলতি বছরের মার্চ মাসেই এই প্রক্রিয়ার মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাই গেল বুধবারের ওই বৈঠকে ‘যুদ্ধবিহীন অঞ্চল’ গঠনের যৌক্তিকতার বিষয়ে তিন নেতাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
ব্যর্থতা বা সফলতা যাই হোক, এক বছর আগে আস্তানা প্রক্রিয়ার শুরুর পর ইরান, তুরস্ক ও রাশিয়ার সম্ভবত একমাত্র সফলতা সিরিয়ায় এই ‘যুদ্ধবিহীন অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এরই মধ্যে এই প্রক্রিয়ার প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অকার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
হোমস প্রদেশসহ সিরিয়ার পুরো দণিাঞ্চলে এই পদেেপর অকার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। তবে ‘যুদ্ধবিহীন অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার এই সমঝোতা চুক্তি স্বারের বহু আগেই এই অঞ্চলে সহিংসতা বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আর যাই হোক, যুদ্ধবিহীন অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পদপে নিয়ে ইদলিব ও পূর্ব ঘৌটায় সহিংসতা কমানো যায়নি।
যাই হোক, এই প্রোপটে ইরান, তুরস্ক ও রাশিয়ার তিন নেতা গেল বুধবারের বৈঠকের পর একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, তারা প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের জন্য গঠিত যুদ্ধবিহীন অঞ্চলের মেয়াদ আরো বাড়াতে যাচ্ছেন। এ সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, এ তিন নেতার সবাই এই ‘অঞ্চল’ গঠনের কার্যকারিতা প্রাথমিকভাবে মূল্যায়ন করেছেন নিতান্তই নিজেদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে, সিরীয় জনগণের কল্যাণের কথা ভেবে নয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিরিয়ায় নিজেদের উপস্থিতি ও সঙ্ঘাত বন্ধে নিজেদের ভূমিকা বৈধ করার আগাগোড়া মোম উপায় এই ‘যুদ্ধবিহীন অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা।
আস্তানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যুদ্ধবিহীন অঞ্চল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এই প্রক্রিয়া শুরু থেকেই বাস্তবায়ন হয়েছে সিরিয়ায় নিজেদের য়তি কমানোর ল্য সামনে রেখে তিন দেশের নিজস্ব প্রত্যাশা অনুযায়ী। তিনটি দেশই একটি মৌলিক প্রোপট তৈরির জন্য এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করেছে, যাতে করে সিরিয়ায় তারা যেভাবে চায় সেভাবে কার্যক্রম চালাতে পারে এবং তা একে অপরের জন্য সহায়ক হয়।
ইদলিবে আঙ্কারার যতটুকু অর্জন এবং দেশের উত্তরাঞ্চলে সেনা উপস্থিতির যতটা বৈধতা দিতে পেরেছে তার সবই রাজনৈতিক কারণে। কাজেই, রাশিয়া ও তুরস্কের চলমান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কেবল ইদলিবে পরিবর্তন সম্ভব। আস্তানা প্রক্রিয়া তেহরানের জন্যও বিশেষ লাভজনক হয়েছে। দামেস্কের সাথে যৌথ কার্যক্রম পরিচালনা করে, ইরান দৃশ্যত সিরিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে, আত্মরামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে গেছে এবং ক্রমেই বড় অঞ্চলগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। সিরিয়া শান্তিপ্রক্রিয়ায় রাশিয়া যেহেতু নিজেদের নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে সম হয়েছে, তাই আস্তানা প্রক্রিয়া নিয়ে মস্কোও সন্তুষ্ট।
‘যুদ্ধবিহীন অঞ্চল’-এর পরিসমাপ্তি হবে তিন নেতার উদ্যোগে চালু হওয়া আস্তানা পদেেপর ব্যর্থতার শুরু এবং এটাই সম্ভবত সিরিয়ায় তাদের উপস্থিতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। শুধু তাই নয়, এই তিন দেশের উদ্যোগে গেল বছর নতুন করে শুরু হওয়া শান্তিপ্রক্রিয়ার ভিত্তিও তিগ্রস্ত হবে।
রাজনৈতিক সমঝোতার ক্রান্তিকাল
যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক সমঝোতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও বুধবারের ওই বৈঠকে কথা বলেন এই তিন নেতা। বিশেষভাবে, সিরিয়ার সংবিধান নতুন করে লেখার বিষয়ে একটি সাংবিধানিক কমিটি গঠনের ব্যাপারে কথা বলেন তারা। গেল দুই মাস আগে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এমন একটি কমিটি গঠনের বিষয়ে তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়া তিন দেশই রাজি হয়েছে।
এই সমস্যা সমাধান করা এতটা সহজ নয়। সফল হতে হলে, সংবিধান প্রণয়ন কমিটিকে শুধু জাতিসঙ্ঘ বিশেষ প্রতিনিধি স্টিফেন ডি মিসতুরার সমর্থনই পেলে হবে না বরং সিরীয় সরকার ও বিরোধী দলগুলোর সমর্থনও পেতে হবে। দেখা যাচ্ছে, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানেও সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে দামেস্ক রাজি হবে না বা হওয়ার সম্ভাবনা খুব সামান্যই।
এই যুদ্ধবিহীন অঞ্চল কতটা কার্যকর হয় তার সাথে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সফলতা অনেকটা সরাসরি জড়িত। তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়া এই যুদ্ধবিহীন অঞ্চল গঠনে ব্যর্থ হলে এবং পূর্ব ঘৌটায় যুদ্ধ বন্ধ না হলে, আস্তানা প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোর পুনরায় অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং একই সাথে বিরোধী পরে সমর্থন ছাড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি কাজ করতে পারবে না।
সিরিয়ায় অন্যতম একটি বিরোধী বাহিনী জয়েশ আল ইসলামের প্রধান মুহাম্মদ আলুস শুরু থেকেই আস্তানা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত এবং এই কার্যক্রমকে বৈধতা দিয়ে আসছেন। যাই হোক, পূর্ব ঘৌটায় নিরবচ্ছিন্ন সামরিক অভিযানে অংশ নেয়া এই বাহিনীর সদস্যরাও চলতি বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য আস্তানা আলোচনার পরবর্তী বৈঠকে অংশগ্রহণের উৎসাহ পেতে পারে। বাস্তবতার সীমানায় ‘আস্তানা কাঠামো’
সামরিক বিষয়ে গঠিত ফোরাম এর নাম ‘আস্তানা’প্রক্রিয়া। গেল বছরের শেষের দিক থেকেই এর শক্তি য় শুরু যখন সামরিক সমস্যা ক্রমাগত পর্দার অন্তরালে যেতে শুরু করল। এমন অবস্থায় নতুন করে সামনে আসে রাজনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা। এখন এটাই সত্যি যে, দীর্ঘমেয়াদি সফলতা পেতে চাইলে, আস্তানা প্রক্রিয়াকে সামরিক ফোরাম হিসেবে না রেখে রাজনৈতিক ফোরামে রূপান্তর করার উপায় খুঁজতে হবে তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়াকে।
যাই হোক, এই রূপান্তর এতটা সহজ নয়, যেহেতু যুদ্ধপরবর্তী সিরিয়া কেমন হবে তার ব্যাপারে এই তিন দেশই সমঝোতায় আসতে পারেনি। সমস্যা শুধু বাশার আল আসাদের ব্যাপারে তাদের ভিন্ন ভিন্ন মতামতে নয় বরং আস্তানা প্রক্রিয়ার শর্তের বাইরে তারা কেমন ভূমিকা পালন করতে পারবে সে ব্যাপারেও।
পুতিন, এরদোগান ও রুহানি আঙ্কারার বৈঠকে এসব মৌলিক সমস্যার সমাধানে যথাযথ সমাধান খুঁজতে ব্যর্থ হয়েছেন। বুধবারের ওই বৈঠক এটাও প্রমাণ করেছে যে, সঙ্ঘাত বন্ধে কোনো পই সমাধানের কাছাকাছিও আসতে পারেনি। এমনকি পরিস্থিতি বর্তমানে যেমন আছে এর বাইরে কোনো পদপে নিতে তারা সমও নয়।
তাদের এই সাম্প্রতিক বৈঠক বা পুরো আস্তানা প্রক্রিয়ার ফলাফলের আলোকে বলা যায়, সিরিয়ায় নতুন ভৌগোলিক জোট হিসেবে তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে যে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকা দরকার ছিল তা নেই। এই তিন দেশের মধ্যে সত্যিকারের কোনো জোট নেই। আমরা যা দেখছি তাতে এটাকে পরিস্থিতির কারণে ‘এক হওয়া’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না এবং এর মাধ্যমে এই তিন দেশ শুধু কিছু রাজনৈতিক সুবিধাই আদায় করে নিচ্ছে।
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম।
লিওনিড ইসায়েভ : হায়ার স্কুল অব ইকোনমিক্সের প্রভাষক।

 

ads

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫