ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৬ এপ্রিল ২০১৮

আমেরিকা

বুদ্বুদের মধ্যে কাটলো যে ছেলের জীবন

বিবিসি বাংলা

১৩ এপ্রিল ২০১৮,শুক্রবার, ১৯:৫৫


প্রিন্ট
বুদ্বুদের মধ্যে কাটলো যে ছেলের জীবন

বুদ্বুদের মধ্যে কাটলো যে ছেলের জীবন

১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকায় এক ছেলের মৃত্যু হয় যে বিশাল একটি প্লাস্টিকের গোলাকার ঘরের মধ্যে সারাটা জীবন কাটিয়েছে। বিরল এক ধরনের জেনেটিক ত্রুটির শিকার এই ছেলেটিকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে রাখতে হতো, কারণ তার দেহে কোনো ধরনের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা ছিল না। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে এই ছেলেটিকে ডাকা হতো 'বয় ইন দ্যা বাবল' নামে।

ডেভিড ভেটারের মা ক্যারল অ্যান ডেমারেট বলছেন, তার ছেলে ডেভিড যে জিনগত রোগ নিয়ে জন্মেছিল তার নাম 'সিভিয়ার কম্বাইন্ড ইমিউনোডেভেশিয়েন্সি ডিজিজ'। মানুষ প্রতিদিন যে জীবাণুর সাগরের মধ্য দিয়ে চলাফেরা করে, ডেভিড কিংবা এই রোগে আক্রান্ত অন্য যে কোন বাচ্চার দেহে তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের প্রতিরোধক ক্ষমতা থাকে না।

ক্যারল অ্যান ডেমারেট যে রোগের কথা বলছেন, সংক্ষেপে তার নাম 'স্কিড'। এই 'স্কিড' যাদের হয় তাদের মুখে কোনো টনসিল থাকে না, তাদের দেহে কোনো লিম্ফনোড থাকে না, থাকে না কোন থাইমাস। বলা যায় জীবাণুর সংক্রমণের মুখে তাদের দেহ থাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত।

এক বছর আগে ক্যারল ডেমারেটের প্রথম সন্তানও একই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তখনই তাকে জানানো হয়েছিল যে তার পরের সন্তানের স্কিড হওয়ার সম্ভাবনা ৫০%। এর পর তিনি আবার যখন সন্তান ধারণ করলেন তখন এই রোগের কথা বিবেচনা করে তাকে গর্ভপাতের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্যারল ডেমারেটের পরিবার রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান, এবং তারা গর্ভপাত-বিরোধী। সেজন্য এমন প্রস্তুতি নেয়া হলো যাতে সন্তানের জন্ম হয় বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, জীবাণুমুক্ত এক পরিবেশে। জন্ম হওয়ার পর জানা গেল ডেভিডও স্কিড রোগ নিয়েই জন্ম নিয়েছে।

 

ডেভিডের জন্মের প্রস্তুতি কীভাবে নেয়া হয়েছিল তা বলছিলেন ক্যারল অ্যান ডেমারেট, হাসপাতালের ডেলিভারি রুমটিকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করা হয়। অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ঐ ঘর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। সার্জনের যে দলটি জন্মদানে সাহায্য করেন তদের সংখ্যাও ইচ্ছে করেই নূন্যতম পর্যায়ে রাখা হয়।

ডেভিডের জন্মের ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে হাসপাতালের ভেতরে আমাকে অন্যান্যদের থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে ফেলা হয়। ঘরে উপস্থিত সবার মুখে ছিল মাস্ক। তারা কোন কথা বলছিল না। দু'সপ্তাহ পর জানা গেল যে ডেভিডেরও স্কিড রয়েছে।

ক্যারল ডেমারেট যখন জানতে পারলেন যে তার এই ছেলেও স্কিড আক্রান্ত তখন তিনি দু:খিত হলেও মনোবল ধরে রেখেছিলেন। তিনি বলছিলেন, খবরটা শুনে আমার হৃদয় একেবারে ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা জানতাম এই শিশুটির প্রতি আমাদের একটা দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য আমরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম।

সিভিয়ার কম্বাইন্ড ইমিউনোডেভেশিয়েন্সি ডিজিজ'-এ আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়ার পর ডেভিডকে হাসপাতাল থেকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় বিশেষভাবে ডিজাইন করা জীবাণুমুক্ত একটি গোলাকার ঘরে যেটি তৈরি করা হয়েছিল স্বচ্ছ পিভিসি প্লাস্টিক দিয়ে। সেই ঘরের সাথে একটি কালো গ্লাভস লাগানো হয়েছিল যাতে হাসপাতালের কর্মীরা কিংবা ডেভিডের পরিবার তাকে নিরাপদে নাড়াচাড়া করতে পারে।

সে দিনগুলোর কথা ক্যারল অ্যান স্মরণ করছিলেন এভাবে: ডেভিডকে যখন আমি দুধ খাওয়াতাম তখন ঐ গ্লাসের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তার বিছানা থেকে তাকে তুলে আনতাম এবং বুকের কাছাকাছি এনে দুধের বোতল তুলে দিতাম তার মুখে। যখন তাকে অনেকক্ষণ ধরে রাখতাম, তার দেহের উষ্ণতা গ্লাসের ভেতর দিয়ে আমার হাতে পৌঁছুতো। আমার মনে হয় আমার শরীরের ওমও সে নিশ্চয়ই টের পেত।

আমি যে তাকে স্পর্শ করতে পারতাম না, প্রতিটা মুহূর্তে সেটা আমার মনে পড়তো। মনে হতো প্লাস্টিকের দেয়ালটা যদি কোনভাবে অদৃশ্য হয়ে যেত। কিন্তু আমি সচেতনভাবেই সেই ধরনের ভাবনাকে দূরে সরিয়ে রাখতাম।

সে সময়টাতে স্কিডের একমাত্র নিরাময় ছিল বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট। আশা করা হচ্ছিল, বড় বোন ক্যাথরিনের সাথে ডেভিডের হাড়ের মজ্জার মিল পাওয়া যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি। সেটা ছিল একটা বড় আঘাত। জীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ডেভিডের জন্য তৈরি করা হয় বেশ কয়েকটি গোলাকার প্লাস্টিকের ঘর। একটি ঘর তার ঘুমানোর জন্য, একটিতে তার জিনিসপত্র রাখার জন্য এবং অন্য একটি ঘর তার খেলাধুলার জন্য। প্রতিটি ঘর অন্যটির সাথে সংযুক্ত ছিল। এই ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছিল ডেভিডের বাড়ির মধ্যে। এই ঘরগুলো তৈরি হলে জন্ম নেয়ার দু'মাস পর ডেভিডকে হাসপাতাল থেকে প্রথমবারের মতো তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

ক্যারল অ্যান ডেমারেট বলছিলেন তাকে মূলত সবসময়ের জন্য বাড়ির ভেতরেই থাকতে হতো। তাতে যে খুশিই ছিল। ডেভিড প্রথমবারের মতো কথা বলে বাড়ির ভেতরে। হাঁটার জন্য প্রথম পা ফেলে বাড়ির ভেতরে।

ডেভিড যখন বড়ো হচ্ছিল সে সময়ে সংবাদমাধ্যমে তাকে ডাকা হতো 'বয় ইন দ্যা বাবল' নামে। ক্যারল ডেমারেটকে শুধু ডেভিডকে দেখাশোনার দায়িত্বই পালন করতো হতো না, ডেভিডের অদ্ভুত জীবনধারার জন্য তাকে মানসিকভাবেও তৈরি করা হচ্ছিল।

ক্যারল অ্যান ডেমারেট বলছিলেন, প্রথম যে বিষয়টা তারা ডেভিডকে শেখাতে চেয়েছিলেন, সেটা হলো যে সে একজন বিশেষ মানুষ, অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তার পরিস্থিতি যতই আলাদা হোক না কেন তাকে শেখানো হয়েছিল যে সে কোন একজনের ছেলে, কোন একজনের নাতি, কোন একজনের ভাই।

ছেলেবেলার স্বাভাবিক জীবন কেমন হতে পারে, সেই ধারণাটা ডেভিড পেয়েছিল তার বোন ক্যাথরিনের কাছ থেকে। ক্যাথরিন স্কুলের নানা অনুষ্ঠানে অংশ নিতো। তার জন্য আমি যেসব পোশাক তৈরি করতাম, সেটা আমি বানাতাম আমার সেলাইয়ে মেশিন দিয়ে। সেলাই মেশিনটি নিয়ে আমি ডেভিডের ঘরের দেয়ালের পাশে বসে যেতাম এবং কাপড় সেলাই করতাম। ডেভিড তা দেখতে পেতো। ক্যথরিন তার স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে বাড়ির উঠোনে রিহার্সাল করতো। ডেভিড তার ঘরের জানালা দিয়ে তা দেখতো এবং লম্ফঝম্ফ করে তাদের উৎসাহ যোগাতো।

সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে ডেভিডের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। এক টিভি চ্যানেল তার ওপর একটি অনুষ্ঠান প্রচার করার পর, মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা ডেভিডের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে। তারা প্রস্তাব দেয় যে তারা ডেভিডের জন্য একটি স্পেস সুট অর্থাৎ মহাকাশচারীদের পোশাক তৈরি করে দেবে। এটি পরে ডেভিড তার গোলাকার ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং নিরাপদে ঘোরাফেরা করতে পারবে।

ডেভিডের বয়স যখন ১২ বছর, তখন তার বাবা-মাকে একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডেভিডের ঘরের আয়তন ছোট হয়ে আসছিল। ডাক্তাররা তার জন্য আরো বড় ঘর তৈরি করতে পারছিলেন না। সে সময় তার পরিবারকে ডাক্তাররা জানিয়েছিলেন যে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রে নতুন গবেষণার ফলাফলে জানা যাচ্ছে যে সম্পূর্ণভাবে মিলে না গেলেও একজনের হাড়ের মজ্জা অন্যজনের দেহে বসানো যায়।

ক্যারল অ্যান ডেমারেট বলছিলেন, সে সময় মনে হয়েছিল এটা করা যেতেই পারে। পুরো বিষয়টা ডেভিডকে ব্যাখ্যা করে বোঝানো হয়েছিল। সেও রাজি হয়েছিল। আমাদের তিনজনের বোন ম্যারো পরীক্ষা করা হয়েছিল। তার মধ্যে ক্যাথরিনের বোন ম্যারোর নমুনা ছিল সবচেয়ে উপযোগী। তাই ক্যাথরিনকেই ডোনার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

তারপর বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়ে গেল। গোঁড়ার দিকে বিষয়টা ভালই ছিল। ডেভিডকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হলো। ১৯৮৩ সালের নববর্ষের রাত। ডেভিডের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। আমি তার ডাক্তারকে ফোন করে জানালাম যে ডেভিডের তাপমাত্রা এক-দুই ডিগ্রি বেড়েছে। ডাক্তাররা সাথে সাথে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। তারপর থেকেই তার অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে হতে শুরু করে।

১৯৮৪ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি ডেভিড ভেটার মারা যায়। পরে পরীক্ষা করে জানা যায় যে তার বোন ম্যারোর মধ্যে এপস্টিন বার নামে একটি ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় ছিল, যেটি পরে লিম্ফোমায় রূপ নেয়। ভাইরাস থেকেও যে কারও ক্যান্সার হতে পারে তার ঐ পরীক্ষা থেকেই প্রথমবারের মতো জানা গিয়েছিল।

ক্যারল অ্যান ডেমারেট এখন ইমিউন ডেফেশিয়েন্সি ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য। তিনি এখনও টেক্সাস চিলড্রেন্স হসপিটালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। ডেভিড তার ছোট্ট জীবনের একটি অংশ কাটিয়েছিল এই হাসপাতালেই।

(ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বটি পরিবেশন করেছেন মাসুদ হাসান খান।)

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫