ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

দিগন্ত সাহিত্য

বৈশাখী আনন্দ ধামে

দিলারা সামস্ দিলু

১৩ এপ্রিল ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। অতি প্রাচীনকাল থেকে আজ অবধি বাঙালির বৃহত্তর উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’। ‘এসো এসো এসো হে নবীন এসো হে, বৈশাখ এসো আলো, এসো হে প্রাণ ডাক কালবৈশাখীর’। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের তারুণ্যের প্রতি এই আহ্বানই বৈশাখকে করে তোলে আরো বেশি তরুণ উজ্জ্বল, দীপ্ত উদ্দীপন। ‘মুছে যাক গ্লানি মুছে যাক জরা, অগ্নিস্নাত সূচি হোক ধরা’।
এসো হে বৈশাখ এসো এসো-জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুনের পথে এগিয়ে চলার গানটি বৈশাখের প্রথম দিনে তরুণদের মুখে মুখে ফেরে। বছরের সারাটা সময়ে তরুণরা এর আয়োজনে মেতে ওঠার অপোয় থাকে। সবাই এই বিশেষ দিনটিতে হই চই করে কাটিয়ে দেয়। নতুন বছরের মঙ্গল কামনায় সবার মুখে উচ্চারিত ‘শুভ নববর্ষ’।
সৃষ্টি আর আনন্দ উপভোগের আমেজে হৃদয় উৎসারিত উৎফুল্ল আর উচ্ছ্বাস বাংলার আকাশ, বাতাস, মাঠ-ঘাট, জনপদ। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে এক মনোলোভা পরিবেশ বাংলার আঙিনায়। ‘বৈশাখী মেলা’ গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। প্রতি বছর এই মেলা বসে বাংলা নববর্ষ বরণে, দেশে দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে।
বেত, বাঁশ, কাঠ, পোড়ামাটির তৈরী বৈচিত্রময় শিল্প-সামগ্রী মেলার অন্যতম আকর্ষণ। বাঁশের তৈরী কুলো, ডালা, ঝুড়ি, চালুন, মাছ ধরার চাই, খোলাই ইত্যাদি। হরেক রকমের খাবার মুড়ি-মুড়কি, মোয়া, জিলাপি, কদমা, বাতাসা, তরমুজ...। বিভিন্ন রকমের মাটির পুতুল, নকশি হাঁড়ি, ঘোড়া,
হাতি, মাছ, ফল, গহনা ও তৈজসপত্র। রকমারি ডিজাইনের মাটির তৈরী গহনা তরুণীদের বাড়তি আকর্ষণ। প্রকৃতির রূপসী কন্যা আমাদের সুজলা-সুফলা রূপের রানী ‘বাংলাদেশ’। উৎসবে রঙের মাধুরীতে পহেলা বৈশাখ বাংলাকে করে আরো মোহনীয়।
মাঠ-ঘাট প্রান্তর, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অতুলনীয়, মোহনীয়, মনোলোভা সে রূপের শেষ নেই। বাংলার সহজ-সরল মানুষগুলোÑ শিশু, ছেলে, বুড়ো সবাই বৈশাখীর এই আনন্দ ধামে মেতে ওঠে প্রাণের তাগিদে। এই আনন্দমুখর উৎসবে অঞ্চলভিত্তিক কিছু বৈচিত্রময় খেলা বেশ ভালোভাবেই জমে ওঠে।
যেমন : লাঠিখেলা, গরুর লড়াই, বলিখেলা, নৌকাবাইচ। এ যেন বাঙালির প্রাণের মেলা-কৃষ্টিকলায় বাঙালি অস্তিত্বের সন্ধান। শিশু-কিশোর চরে নাগর দোলায়। একতারা, ডুগডুগি, আর বাঁশির সুরে মুখরিত আকাশ-বাতাস। মেলার কিছু স্টলে পরিবেশন করা হয় পান্তা-ইলিশ মাটির থালায়।
হৃদয়ের টানে সবাই ছুটে আসে পরিবার-পরিজন এই মেলায়। সাংস্কৃতিক ও বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে সর্বত্রই। শহরে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নাট্যাভিনয়, সাহিত্যপাঠের আসর বসে। ছায়ানটের মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠানগুলো সুরের লহরী তোলে হৃদয় গভীরে।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অনুষ্ঠানগুলো হয়ে ওঠে মাটি ও মানুষের। ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি মনোলোভা অংশÑ শোভাযাত্রা, পহেলা বৈশাখের একটি অন্যতম আকর্ষণ। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন রাস্তা প্রদণি করে। এই শোভাযাত্রায় আবহমান গ্রামবাংলার ও জীবনের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর বৈশাখী নানা গানের আয়োজনে এই দিনটি আরো উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
ঢাকার রমনা বটমূল এই উৎসবের কেন্দ্রস্থল। এসব অনুষ্ঠানে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলা হয়। উৎসব মানেই তারুণ্যের জোয়ার। আর তাই সব বারের মতো এবারো বৈশাখের প্রথম দিনটি তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ভরে উঠবে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বসে ‘বৈশাখী বই মেলা’। টিএসসির সামনে গান, আবৃত্তি, পথ-নাটক দেখতে বৈশাখী পোশাকে রঙিন হয়ে তরুণ-তরুণীরা নববর্ষকে বরণ করে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতাকে মিলিয়ে এ এক স¤পূর্ণ নতুন সৃষ্টি, বাংলাদেশের সহজ-সরল বাঙালি জাতির মতোই নতুন আর হাজার বছরের পুরনোও বটে।
বৈশাখ মানেই লাল-সাদার মিশেল। বৈশাখ শুধু লালকেই ধারণ করে না, বরং সারা বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। আনন্দ-উৎসবে বাঙালি ফিরে পায় তার স্বাধীন ও মুক্ত চেতনা, সংস্কৃতি আর স্বকীয়তা। বৈশাখী রঙে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানগুলো মনকে তুষ্ট করে স্বপ্নীল আবেশে। আর মনের আঙিনায়-স্মৃতির দোলায় জলছবি হয়ে অপোয় থাকে না পাওয়ার বেদনা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫