ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

গল্প

নিখোঁজ ছেলেটি

জীম হামযাহ

১২ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৫:৩৫


প্রিন্ট
নিখোঁজ ছেলেটি

নিখোঁজ ছেলেটি

এর আগে সে তার ক্রোধকে বহুবার গিলেছে। নিজেকে নিবারণ করে ফিরিয়ে এনেছে প্রচণ্ড রাগের মুখে। না হয় এমনটা আগেই ঘটত। মূলত এটা তাকে অনেক জ্বালাতন করছিল। যা পৌঁছে দেয় বিরক্তির চরমে। যান্ত্রিক আচরণ তাকে তার বন্ধুমহলেও হাসির পাত্র বানিয়েছে। তা সে গায়ে মাখেনি। হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার একাকিত্বে যখন সমস্যা করত, সে ভীষণ বিরক্ত হতো। ক্ষোভ-উত্তেজনায় অনেকবার চেয়েছে এটাকে ধ্বংস করে দিতে। কিনারে গিয়েও সে ফিরে এসেছে। কেননা তার তো এ একটাই মাত্র। এমন না যে এটাকে ধ্বংস করে তাৎক্ষণিক আরেকটা নিতে পারবে।

একবার সে ভেবেছিল বিক্রি করে আরো কিছু টাকা যোগ করে নতুন একটা কিনে নেবে। কিন্তু এটা বিক্রি করেও বা কত টাকা পাবে? আরেকটা জুটানো কি তার পক্ষে খুব সহজ হবে? খালি হাতে তো টাকা রাখা যায় না। বিশেষ করে তার নৈতিকতাও একটা বাধা ছিল। এমনটা নিশ্চয় ধোঁকা দেয়ার শামিল। বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে কিনল, তারপর যখন বুঝবে সে প্রতারিত হয়েছে, তাকে খুব নীচ মনে করবে। অশ্রাব্য গালিও দিতে পারে। না, এটা তার সাথে কোনোভাবে যায় না। তার চেয়ে নিজের জঞ্জাল নিজের কাছেই থাক। সুযোগ পেলে টাকা জমিয়ে একটা কিনে নেবে।

দেশে তখন থ্রি-জি এসেছে। প্রায় সব তরুণ-যবকদের হাতে হাতে স্মার্ট ফোন। ভাইবার, স্কাইপি, ইমো, ইউটিউবের দ্বার খুলেছে। একজন অন্যজনকে দেখে দেখে কথা বলছে। টাচে আঙ্গুল ঠেলে ঠেলে ফেসবুক পড়ছে। এই সময়ে সবার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে নিজের কাছে একটা স্মার্টফোন না থাকলে থ্রি-জি দুনিয়ায় নিজেকে বড্ড আনস্মার্ট লাগে।

তার হাতে তখনো নকিয়ার একটি সাধারণ ক্যামেরা ফোন। এককালে এটার মূল্য থাকলেও এখন আর আগের মতো কদর নেই। তরুণরা ফিরেও তাকায় না। সে একটি স্মার্ট ফোনের তীব্র প্রয়োজন বোধ করলেও নিজ থেকে কেনার সাধ্য ছিল না। পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে- দাম কমছে কি-না। চায়না কোনো ব্রান্ড কম মূল্যে আনলেও তা তার নাগালে ছিল না। কারো কাছ থেকে চেয়ে নেয়ার অভ্যাসও তার নেই। নয়তো নিজের বড় ভাই সৌদি আরব আছেন, চাইতে পারত। পরিবারের টানাটানি হিসাব করে এটা নিজের জন্য এক্সট্রা বিলাসিতা মনে করে। সে নিজেও খুব হিসাবি।

সেবার যখন তার বড় ভাই প্রবাস থেকে ফিরলেন- দু’টি স্মার্ট ফোন নিয়ে আসেন। ব্যবহৃত পুরনোটি তাকে দিয়ে, নতুনটি নিজের হাতে রেখে দেন। যা পরে তার ভাবির মালিকানায় চলে যায়।
পুরনোটি পেয়েও সে ছিল মহা খুশি। সেটটি ব্যবহৃত হলেও দেখে তা মনে হতো না। যখন কাভার পাল্টে গ্লাসটেম্পার লাগাল- বোঝার সাধ্য নেই এটি ব্যবহৃত। সে নেট দুনিয়ায় ঢুকে পড়ল থ্রিÑজি স্পিডে। এখন থেকে সেও গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দা। নেট দুনিয়ার সবকিছু প্রায় হাতের মুটোয়, আঙ্গুলের ডগায়।

প্রথম দু’বছর এটা ভালো সার্ভিস দিয়েছিল। তারপর একটু একটু সমস্যা দেখা দিলে তা ছিল মানানসই। ধীরে ধীরে রোগ বাড়তে থাকল। সময় সময় এসব রোগের পেছনে অল্প অল্প করেও অনেক টাকা ব্যয় করেছে। যা ব্যয় হয়েছে এক করে হিসাব করলে আরেকটি নেয়া সম্ভব ছিল। জোড়াতালি দিয়ে যাও চলছিল, কিন্তু ইদানীং সমস্যা আরো প্রকট হয়। পরিশ্রম আর বয়সের ভারে তা যেন একেবারে ক্লান্ত, গতিহীন। কখনো টাচ একেবারে কাজ করে না। সে রি-স্টার্ট দিয়ে সম্বিত ফেরায়। তখন অ্যাপগুলো কাজ করে না বা টাচ হেলছে না। নাম্বার তুলতে, কল দিতে, রিসিভ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। ফেসবুকে ঢুকতে গেলে স্থবির হয়ে যায়। পেজ শো করে না। তা ছাড়া চলার মধ্যখানে অফ হয়ে যাওয়া আরো বিরক্তিকর। সে ব্যাটারি খোলে লাগিয়ে পরে অন করে। তখন তা গরম হয়ে চার্জ নেমে যায় দ্রুত। এমন অনেক সমস্যায় এটার ওপর সে ক্ষোভ মেটাতে চাইলেও মেটায়নি। এটার ক্ষতি হলে সে বিশ^জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ফেসবুকে যেখানে তার হাজার হাজার ফ্রেন্ড। দীর্ঘদিনের পরিচয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে একটা দিনও কাটবে না। সে মনে করে- সমস্যা করছে ঠিক, তারপরও তো ঠেকা কুলাচ্ছে।

অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি ঘটে সেদিন ভোরে। খুব ভোর- বিহানে তার ঘুম ভাঙলেও বিছানা চেড়ে উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আবার ঘুমও আসছে না। সে তার অভ্যাসমতো বালিশের তল হাতড়ে মোবাইল বের করে নেটের দুয়ার খোলে। কয়েকবার চেষ্টার পর যখন ফেসবুকে ঢুকল, পেজটা আটকে থাকল অনড়। টাচ ঠেলতে ঠেলতে নাড়াতে পারছে না। সে ফোন রি-স্টার্ট দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে সচল হলেও মুহূর্তে ডিংডিং করে চার্জ তলানীতে নেমে গেল। শুধু তা নয়, এবার চলে গেল নেটও। সে বারবার চেষ্টা করে কোনোভাবে নেট আনতে পারল না। মোবাইলটা আবার ডিংডিং করে ওঠল এবং অকস্মাৎ অফ হয়ে অন্ধকারে ঢেকে যায়। এবার সে ক্ষিপ্ত হয়। সমস্ত ক্ষোভ এক করে মোবাইলটা ছুড়ে মারে।
হয়তো বিছানায় পড়লে ক্ষতির আশঙ্কা ছিল না। তা প্রচণ্ডভাবে দেয়ালে আঘাত লেগে নিচে পড়ে ব্যাটারি, সিম সব ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে ছিটকে গেল। কিছুক্ষণ এভাবে পড়ে রইল, সে ফিরেও তাকাল না। পরে যখন উত্তাপের পারদ নিম্নগামী হলো সে ফোনের পরিণতি দেখতে ধীরে ধীরে উঠে বসে।

পরিণতি করুণই বটে। সবকিছু আলাদা হয়ে বিচ্ছিন্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে খাট থেকে নামে। এক এক করে সব জমা করে। ফুঁ দিয়ে, লুঙিতে ঘঁষে ধুলা-বালু পরিষ্কার করে এবং আগের মতো তা ফিট করে সুইচ বাটনে টিপ দেয়। স্ইুচ বাটন বারবার টিপে অন না হওয়ায় সে নিয়ে চার্জে লাগায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও অবস্থা অপরিবর্তিত। চার্জও নিচ্ছে না। সে বারবার চেষ্টা করতে থাকে। ক্রমাগত চেষ্টা করতে করতে আবারো তার মাথায় রাগ চাপল। এবার মাথার ওপরে তোলে আগের চেয়ে সজোরে আছাড় মারে। আছাড় মেরেও ক্ষান্ত হলো না, সব একজায়গায় দলা করে জুতা দিয়ে আচ্ছামতো মোচড়ায়।
তার ভাবি আড়াল থেকে ব্যাপারটি লক্ষ করলেও কিছু বললেন না। মোচড়ানো শেষে আবার লাথি দিয়ে একেকটা একেক দিকে ছড়িয়ে সে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

সারাদিন আর বাড়ি ফিরল না সে। দিনমান সে নদীর তীরে, শৈশবের খেলার মাঠে, গ্রামের মেটোপথে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ায়। যেখানে যায়, সেখানে নিজেকে খুব একটা পরিচিত মনে হয় না। সেই কত বছর আগে গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়েছিল। মাঝে মধ্যে দু-একদিনের জন্য এলেও খুব একটা ভেড়া হয়নি। এতদিনে গ্রামে একটা পরিবর্তন এসেছে। যে পরিবর্তনের সাথে সে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি। তার সহপাঠীদের কেউ কেউ জীবন-জীবিকার তাকিদে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারা তার মতো এতদূর লেখাপড়া না করে আগেই নেমেছিল রুটি-রুজির সন্ধানে। যে যার মতো এখানে-ওখানে ব্যস্ত আছে। যারা আছে তাদের অনেকের সাথে সে মিশতে পারে না। দোকানপাটে আড্ডাবাজির অভ্যাসও তার নেই। গ্রামের পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে গা বাঁচিয়ে থাকে। এখানকার কূটিলতা তার মোটেও পছন্দ হয় না। এখানে যেন প্রাইভেসি বলতে কিছু নেই। একজন অন্যজনের দোষচর্চায় লিপ্ত। এমন হয় রাস্তাঘাটে দেখলে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে- ‘কী শহর ছেড়ে গ্রামে, চাকরি-বাকরি কিছু হয়নি? কেন যে এতদূর লেখাপড়া করেছ এত টাকা খরচ করে।’
আগে লেখাপড়া ভালোমতো শেষ হোক।

‘এত লেখাপড়া করে লাভ নেই। এ দেশে বেশি শিক্ষিতের ভাত নেই।’
সে বিরক্ত হয়। মাঝে মধ্যে তার মনে হয়, সে এতদূর লেখাপড়া করে বিপদে পড়েছে। না হলে সে যেকোনো পেশা নিতে পারত। এখন যদি গ্রামে ছোটখাটো ব্যবসা বা একটি মোরগের ফার্মও খোলে, মানুষ তাকে নিয়ে টিটকারি করবে। তার বাবা মাথা তুলে বড় গলায় বলেছেন- ছেলে আমার এই হবে, সেই হবে। তার মুখটাও থাকবে না। বাবাও এমন- তার কাছে লেখাপড়া মানেই সরকারি চাকরি। কতবার বলেছে, একটি ভিসা দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে। তার সে এক কথা- ‘এতটুকু লেখাপড়া করে এখন বিদেশ গিয়ে উট রাখবা, বকরির লেদা সাফ করবা? একজন গিয়ে উল্টাচ্ছে আর তুমি রয়েছ বাকি!’
কখনো গ্রামের মুছাব্বিরের ছেলে মুকাব্বিরের উদাহরণ দিয়ে বলেন- ‘হের এসএসসি পাস করে পুলিশে চাকরি হয় আর তোর এত লেখাপড়া করেও হয় না।’

চাকরি তো তারও হয়েছিল। চুপিসারে ঘুষ চেয়েছিল। চার লাখ টাকা মাত্র। কিন্তু বাবার মেজাজি কথা- লেখাপড়া করাইছি কি ঘুষ দিয়ে চাকরি নেয়ার জন্য? এক পয়সাও ঘুষ দেবো না। তখন চার লাখ টাকা দিলে সেও এখন সরকারি চাকরিজীবী থাকত। বাবাকে কে বোঝাবে? মুকাব্বিরের চাকরি হয়েছে, তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। সরকারি দলের নেতা। তার বাবা তো এসবের ধারধারেও না। বললে আরো চেতে যান। মুছাব্বির কবে মুক্তিযোদ্ধা ছিল? চুরি করে সার্টিফিকেট একটা জোগাড় করলেই মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেল, এত সহজ? যুদ্ধের সময় কী করছিল দেখিনি? নিজের কথা বলতে গিয়ে তার সেই লম্বা ফিরিস্তি। তখন কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিলেন, খাওয়ালেন, সাহায্য করলেন, এই সেই। এখন এসব গল্প শুনে কী লাভ! স্বেচ্ছাসেবকী এসব গল্প তার দাদাও শুনিয়েছেন।

বছরের প্রায় শেষ দিকে স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে বাড়িতে এসে তার দিনকাল মোটেও ভালো যাচ্ছিল না। পরিবারে এখন নিজেকে একটা বোঝা মনে হচ্ছে। শহরে প্রাইভেট স্কুলে পড়িয়ে যা পেতো কোনোরকম নিজে চলতে পারত। আত্মমর্যাদা নিয়ে থাকতে পারল না। বেনিয়ারা সারা মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা দেয়, আবার একটু আধটু দেরি হলে যা তা বকাবকি!
নতুন বছর শুরু হলে শহরে যেকোনো প্রাইভেট স্কুল-কলেজে ঢুকতে পারত। কিন্তু এই সময়টা তার জন্য কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে যে চেষ্টা করছে না এমন নয়, মানানসই কিছু সুবিধে করতে পারছে না।

সে বুঝতে পারেনি তুচ্ছ বিষয় এতটা জট পাকাবে। কাঁটা আরো বড় এবং ধারালো হবে। এখন সে মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে, রাগ ক্ষোভ এটা সবার জন্য নয়। এটা বহিঃপ্রকাশেরও একটা অধিকার থাকতে হয়। অর্থ-উপার্জনহীন বেকারকে যেখানে এ দেশের রাস্তার ধুলা-বালুও উপহাস করে, এমন মানুষের ক্ষোভ অনেক সময় অনধিকার চর্চার সমান। যা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ানোরও আশঙ্কা থাকে। না হয় ধর্তব্যের মধ্যে পড়ত না। মোবাইল, লেপটপ এসব আজকাল বড় লোকদের পোলাপানের হাতের খেলনা। নষ্ট করছে আবার আনছে। কিন্তু সে এমন একটা জিনিসের ওপর ক্ষোভ মিটিয়েছে, যা সে নিজে জুটাতে পারেনি, নিজ থেকে জুটানোর সাধ্যও তার নেই। যার কারণে সে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি। এখন শুধু এটা নয়, তার সাথে আরো অপরাধ যোগ হয়েছে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বদনাতে পা লেগে চোট পাওয়ায় বদনায় লাথি মেরেছিল। ঘরের আলনায় গাদা গাদা কাপড়ের মধ্যে নিজের টি-শার্ট খুঁজতে খুঁজতে বিরক্ত হয়ে আলনার কাপড় খাটের ওপর, মেঝের ওপর ছুড়ে ফেলেছিল। এসব টুকিটাকি ঘটনা একদিনে ঘটেনি। মোবাইল ভাঙার যোগসূত্রে দিনে দিনে ঘটা ছোটখাটো সব এক করে হিসাব দাঁড়িয়েছে, সে পরিবারে একের পর এক বিশৃঙ্খলা করে যাচ্ছে।

আশপাশের অনেকের কানে এসব রটে গেছে। বিশেষ করে মহিলাদের কানে। কারো ধারণা, হয়তো প্রেম করে ছ্যাঁকা খেয়ে মাথা ঠিক নেই। কেউ বললেন, বিয়ে করার জন্যও হতে পারে। কারো মন্তব্য, ঘর থেকে টাকা নিতে এসব করছে। তার ভাবি বলেন, আরে তোমরা বুঝবা না, সে আমার ওপর ঝাল মেটাচ্ছে। আমি কি বুঝি না? গায়ে হাত তোলার নাম শুধু মারা নয়, অনেক ভাবে মারা যায়।
ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে এতটা তালগোল! দেশ পেরিয়ে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে গেছে। অপমানকর কৈফিয়তের মুখোমুখি সে। তিলকে তাল করে দেশ-বিদেশ হওয়ায় ফুঁসে ওঠে। সে যে কিছুই বোঝে না এমন নয়।

বড় ভাই বিদেশ থেকে ফোনে মায়ের সাথে কথা বলেছেন। তারপর থেকে মায়ের মুখটাও মলিন হয়ে আছে। চোখ মুছতে মুছতে লাল হয়ে গেছে। অনেক কিছু সহ্য করে দিনরাত খাটুনি খেটে সংসারটা এক রাখতে চেয়েছিলেন। এবার বুঝি আর হলো না। ঘরে একটা মেয়ে এখনো বিয়ের বাকি। লেখাপড়ায় আছে। মেয়েকে নিয়েও তাদের টেনশন। মা তাকে তিরস্কার করলেন। ‘কী দরকার ছিল রে, এ বেটির সাথে তর্ক করার। এমনিতেই ছুতা খোঁজে। মোবাইলে কতকিছু যে লাগিয়ে বলেছে। তার বউ আর এখানে রাখবে না। সোজা বলে দিয়েছে, এখন থেকে সে কারো ধারধারে না।’
সে তাকে কোনো গালিও দেয়নি। রাগের মাথায় হয়তো একটু রূঢ় স্বরে কথা বলেছিল। এখন সে এমন অভিযোগের মুখোমুখি, যার কালি কোনোদিনও তার গায়ে পড়েনি। পুরো ব্যাপারটি তাকেও পাথর বানিয়ে দিয়েছে।

বড় বউ দুপুরে যে রুমে ঢুকেছিল আর বের হয়নি। কান্নাকাটি করে চোখ-মুখ লাল করে ফেলেছে। রাত পর্যন্ত অনেক অনুরোধ করেও তাকে কিছু খাওয়ানো গেল না। একটু পরপর শুধু মোবাইলে একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে। কখনো কাঁদছে। ব্যাগপত্রও গুছিয়ে নিয়েছে। বাপের বাড়ি চলে যেতে চায়। তার বাবা আসার পর সোজা জানিয়ে দিলো- এখানে রেখে গেলে গলায় দড়ি দেবে!
বিচলিত পরিস্থিতি তার বাবা-মাকে আরো বিপন্ন করে দিলো।

বাবা আগে তার প্রতি ঘুৎঘাৎ করলেও মুখ বরাবর কিছু বলেননি। এবার প্রকাশ্য বউমার পক্ষ নিয়ে তার দিকে গর্জে উঠলেন। সবকিছুর জন্য দোষারোপ করেন তাকে। অকর্মা হতচ্ছাড়ার জন্য সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর এমনভাবে ক্ষুব্ধ হলেন, যেন সে আজন্ম অপরাধী। বউমার মন রাখার চেষ্টায় হয়তো শেষে জোরালো আল্টিমেটাম দেন, আজ সন্ধ্যার আগে আগে তার বাড়ি ছাড়তে। এ বাড়িতে আর জায়গা নেই...।

কাউকে কিছু না বলে সেই যে ঘরবাড়ি, গ্রাম ছেড়ে নিখোঁজ হয়েছিল, তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। গত হওয়া দু’বছরে তার মা অনেক কেঁদেছেন। আনোয়ার আলী ছেলের বহু খোঁজ করেছেন। এখনো করেন। কোনো খোঁজ নেই। সবাই বলে- রাগ করে গেছে, একদিন ফিরবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫