ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

দেশ মহাদেশ

ভারতীয় সেনাবাহিনী কাগুজে বাঘ

প্রতিরক্ষা

আসিফ হাসান

১২ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

গত ফেব্রুয়ারিতে নীরবেই একটি মাইলফলক অতিক্রম করল ভারত। দেশটির বার্ষিক বাজেটের তথ্যে দেখা যায়, তার প্রতিরক্ষা ব্যয় ৬২ বিলিয়ন ডলার। এর মাধ্যমে তারা তাদের সাবেক উপনিবেশ প্রভু ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে গেল। এখন কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব ও রাশিয়া তাদের সৈন্যদের জন্য ভারতের চেয়ে বেশি ব্যয় করে। প্রায় এক দশক ধরে ভারত হলো বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক। আর সক্রিয় জনশক্তি, জাহাজ ও বিমানের সংখ্যার দিক থেকে ভারতের সশস্ত্র বাহিনী ইতোমধ্যেই বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের একটিতে পরিণত হয়েছে।
উচ্চাভিলাষ পরিমাপের দিক থেকে ভারত হয়তো এখনো অনেক ওপরে রয়ে গেছে। এর সামরিক মতবাদ একইসাথে দুই দেশ পাকিস্তান ও ভারতের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধ এবং সেইসাথে ভারত মহাসাগরে প্রাধান্য ধরে রাখার কথা বলে। কয়েকটি পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৮ সালে পরমাণু অস্ত্রের কথা প্রকাশ করে ভারত তার নিজস্ব স্থলাভিত্তিক ক্রুইজ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করছে, সাবমেরিন-নিক্ষিপ্ত আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রও নিখুঁতভাবে ছোড়ার অন্তত একটি চেষ্টা করেছে। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশটি আরো বেশি পেশিশক্তি প্রদর্শন করছে। গত গ্রীষ্মে সে হিমালয়ের চূড়ায় চীনের মুখোমুখি হয়। কয়েক দশকের মধ্যে এটিই দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় উত্তেজনা ছিল। পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে সে দমনমূলক বা কূটনৈতিক নীতি অবলম্বনে সংযত থাকার ধার না ধেরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড গোলন্দাজ হামলা চালায়।
কিন্তু তারপরও ভারতীয় অফিসার, বেসামরিক কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা একসুরে তাদের দৃশ্যমান কঠোরতায় তেমন সন্তুষ্ট নয় বলেই জানান। মধ্য মার্চে দীর্ঘ দিনের চুপ থাকা সমালোচনা প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়। প্রতিরক্ষাবিষয়ক পার্লামেন্টারি কমিটির সামনে উপস্থিত হয়ে ভারতের বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানেরা কেবল সরঞ্জাম ও বিনিয়োগের বিপুল ঘাটতির কথাই বলেননি, সেইসাথে খুঁটিনাটি নিয়ে মহাব্যস্ত বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও সরকারের কৃচ্ছ্র সাধনার পদ্ধতির ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এর পরপরই সাধারণ মানুষের মধ্যে আরো বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। তারা কেবল দুর্বল সম্পদ বরাদ্দ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন না, সেইসাথে সংস্কার, পুনঃকাঠামো বা সংশোধিত মতবাদ তৈরিতে তাদের নিজস্ব ব্যর্থতা নিয়েও কথা বলছেন।
তিন বাহিনীর নিজস্ব সাক্ষ্যের আলোকে বলা যায়, এ ধরনের হতাশা প্রকাশ আরো আগেই হওয়া উচিত ছিল। এমপিদের বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর ৬৮ ভাগ সরঞ্জাম ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশই প্রথম সরবরাহ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এসবের মধ্যে রয়েছে বিএমপি-২ পারসোনাল ক্যারিয়ার, শিল্কা বিমানবিধ্বংসী বন্দুকের কথা বলা যায়। এগুলো এখন অচল পণ্য। সেনাবাহিনীর হাতে থাকা অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে মাত্র ৮ ভাগ চমৎকার অবস্থায় আছে। সেনাবাহিনীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দুই ফ্রন্টে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির ব্যাপারে বলা যায়, অস্ত্রশস্ত্রের বিপুল ঘাটতি ও সেকেলে হয়ে পড়া, অস্ত্রের মজুদ ও গোলাবারুদ ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয় না।’
কমিটি তার নিজস্ব ভাষ্যে জানায়, এক দশক ধরে বিষয়টি বারবার বলা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী এখনো সৈন্যদের যুদ্ধসাজ দিতে পারেনি। অন্যান্য বিভাগের অবস্থাও ভালো নয়। জরাজীর্ণ মিগ-২১ এখনো আকাশে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে, নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণ কর্মসূচি এক দশক পেছনে পড়ে রয়েছে।
মোদির বুক চাপড়ানো সত্ত্বেও জিডিপির আনুপাতিক হারে প্রতিরক্ষা বাজেট প্রকৃত অর্থে কমেছে। আর ডলারের হিসেবে তাদের অবস্থান চীনের নিচে। আরো ভয়াবহ কথা হলো, মূলধন ব্যয়ের দিক থেকে এটি হ্রাস পেয়েছে নাটকীয়ভাবে। ২০১৪ সালে এর পরিমাণ যেখানে ছিল ১৩ ভাগ, সেখান থেকে তা কমে গত বছর দাঁড়িয়েছে ৮ ভাগের নিচে। বিমান বাহিনীর ব্যয় ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে ১২ ভাগের নিচে, অথচ এক দশক আগে তা ছিল প্রায় ১৮ ভাগ। বেতনভাতা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ার মানে হলো, ব্যক্তি খাতেই সেনাবাহিনীর চলতি বছরের মোট ব্যয়ের ৬৩ ভাগ চলে যাবে।
আর পেনশন অন্তর্ভুক্ত করা হলে সার্বিক প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই চলে যাবে বেতন ও বেনিফিট বাবদ। ফলে কেনাকাটার জন্য তহবিল বলতে গেলে থাকেই না। ফলে গবেষণা আর উন্নয়নের চিন্তাই তো করা যায় না। সরকারের ‘মেক ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির মূলকেন্দ্রে রয়েছে দেশেই সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করা। তা ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ২০০,০০০ ডলার হ্রাস পেয়েছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে থাকা নারী ও পুরুষ সদস্যদের যথাযথভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ দেয়া সত্ত্বেও সীমান্ত অতিক্রম করে হামলার সংখ্যা বেড়ে গেছে। ২০১৫ সালে এ ধরনের সহিংসতা যেখানে ছিল ১৫২টি, ২০১৬ সালে ২৭৩টি, গত বছর তা দাঁড়িয়েছে ৪২৬টি। গত বছর ভুটানি ভূখণ্ডে চীনের রাস্তা তৈরির অনুমতি দিতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি ভারতের শক্ত অবস্থানের কথা বলে। কিন্তু এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে, দোকলাম ঘটনা চীনকে ওই এলাকায় শক্তি বৃদ্ধি থেকে থামাতে পারেনি।
তীক্ষèধী ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি তীব্র ভাষায় বলেছেন, দোকলাম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ভারত হয়তো কৌশলগত জয়ের দাবি করতে পারে, কিন্তু আসলে চীনই কৌশলগতপর্যায়ে জয়ী হওয়ার মতো অধ্যবসায় ও দক্ষতা রাখে।
আর যেসব এলাকায় ভারতের প্রভাব খুব কমই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত, যেমন নেপাল ও মালদ্বীপ, সেখানেও চীনা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাপট দেখা যাচ্ছে। এসব স্থানে ভারতীয় প্রভাব বিস্তার কঠিন মনে হচ্ছে।
কিছু কিছু দুর্বলতা হয়তো ভারতীয় বাহিনীর আকারের কারণে নয়, বরং তাদের অবয়বের কারণে হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক কমান্ডগুলোকে সমন্বিত করার জন্য বিপুলসংখ্যক বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন, অভ্যন্তরীণ সামরিক সুপারিশ ও কমিটির তদন্ত সত্ত্বেও দেশটির সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী কঠোরভাবে আলাদা সত্তা বজায় রেখে চলেছে। চীন যেখানে সম্প্রতি তার অপারেশনাল বাহিনীকে পাঁচটি বৃহৎ আঞ্চলিক কমান্ডের আওতায় এনেছে, সেখানে ভারত ১৭টি পৃথক একক বাহিনী স্থানীয় কমান্ড বজায় রেখেছে।
এ দিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কেনাকাটা ও পদোন্নতির কর্তৃত্ব বজায় রাখলেও এখানকার স্টাফরা ক্যারিয়ার আমলা ও রাজনৈতিক নিয়োগী। ফলে তারা কেবল যে কারিগরি জ্ঞানের অভাবেই রয়েছেন তা নয়, সেইসাথে অবসরপ্রাপ্তদের প্রতি খারাপ আচরণ করে থাকে। মাও সেতুং আমেরিকাকে ঠাট্টা করে বলতেন ‘কাগুজে বাঘ’। তার দেশের এখনকার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রতিপক্ষ দেশটিকে নিয়েও তিনি একই কথা বলতেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫