নিহত ফারুকের স্ত্রী ও তিন সন্তান
নিহত ফারুকের স্ত্রী ও তিন সন্তান

আব্বারে রক্ত মাহাইছে কেলা?

মো: আব্দুল আউয়াল, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)

‘আয় ভাই আব্বারে দেহিগা। আব্বা-না হেইনে হুত্তেয়া রইছে। আব্বা কতা কয়না কেয়া? আব্বারে রক্ত মাহাইছে কেলা? আয় আব্বারে কইগা আমারে চিপস কিননা দিবো!’ কান্নারত তার বড় ভাই ফাহিমকে একের পর এক এসব কথা বলে যাচ্ছিল নিহত ইজিবাই চালক ফারুকের তিন বছরের শিশু ফারজানা আক্তার। প্রশ্নগুলো শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত সাংবাদিকসহ কর্তব্যরত পুলিশরাও। শিশু মেয়ের এমন সব প্রশ্নে পাশে থাকা মায়ের গগণবিধারী চিৎকার তখন সবার হৃদয় স্পর্শ করছিলো। ঘটনাটি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের। থানা চত্বরে এ দৃশ্যের অবতারণা হয়। 

আজ বুধবার সকালে উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর ব্রিজের কাছে ধানখেতে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেয় এলাকাবাসী। সকাল ৮টায় ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।

নিহতের নাম ফারুক মিয়া (৩৫)। তিনি উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের বিচড়াকোনা গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে।

নিহত ফারুক ইজিবাইক চালক ছিলেন। মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাতে তাকে দুর্বৃত্তরা শ্বাসরুদ্ধ করে মাথায় ইটের আঘাতে হত্যা করে।

স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তানের লেখাপড়াসহ ভরণ-পোষণের একমাত্র অবলম্বন ছিল ফারুকের চালিত ইজিবাইকের আয়। সারাদিন ইজিবাইকটি চালিয়ে যত আয় হতো তা দিয়েই চলতো সংসারের যাবতীয় খরচ। বড় ছেলে ফাহিম মিয়া উচাখিলা ইউনিয়নের হরিপুর দ্বিতীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। ছোট ছেলে নাঈম একই স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। একমাত্র মেয়ে ফারজানার বয়স মাত্র তিন বছর।

প্রতিদিন ইজিবাই চালিয়ে ফারুক বাড়িফেরার পথে মেয়ের জন্যে একটি চিপসের প্যাকেট নিয়ে যেতো বাড়িতে। গত রাত বাবা বাড়ি যায়নি বলে সে প্রতিদিনের মতো চিপসও পায়নি। মায়ের সাথে থানায় এসে যখন বাবার রক্তমাখা লাশ তার চোখে পড়লো তখন বারবার বাবার লাশের পাশে দৌড়ে যাচ্ছিল ফরজানা। সে ভাবছিল বাবা তাকে চিপস কিনে দেবে। বাবা যে আর কথা বলতে পারবে না তা বোঝার বয়স এখনো হয়নি ফারজানার।

দুই ভাই ফাহিম ও নাঈম মায়ের কান্না দেখে বুঝতে পারছিল বাবা আর কথা বলবেন না। ভাইদের কান্না দেখেও ছোট্ট ফারজানার মনে বোঝ আসেনি যে বাবা আর চিপস কিনে দিতে পারবে না।

ফারজানাকে জড়িয়ে ধরে সালমা আক্তার বলছিলেন, ‘এহন থাইক্যায়া তোমারে কেউ আর আদর করবো না। বাবা আর ফিরত আসবো না। কথা বলবো না।’ ফাহিম ও নাঈমের মুখে হাত বুলিয়ে বলছিল, ‘এহন তোমরা কিভাবে পড়বা, কে তুমাদের খরচ দিবো? কে তুমাদের ভাত দিবো? আমার যে কেয়ামত শুরু হইছে! ইজিবাইকটা নিয়া আমার স্বামীরে প্রাণে ভিক্ষা দিতো। দেশ ছাইড়্যা বিদেশ গিয়ে কাজ কইরা খাইতাম। এর যেন উপযুক্ত বিচার অয়।’

বিষয়টি নিয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ বদরুল আলম খান বলেন, ছোট ছোট তিনটি শিশু রেখে সংসারের কর্তাব্যক্তির নিহত হওয়ার ঘটনা খুবই মর্মান্তিক। হত্যাকা-ে জড়িতরা কোনোভাবেই বাঁচতে পারবে না। পুলিশ তাদের আটক করতে এলাকায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করি খুব দ্রুত তাদের গ্রেফতার করতে পারবো। ছিনতাইকৃত গাড়িটিও উদ্ধার করা যাবে।

তিনি জানান, নিহত ফারুকের মাথায় ইটের আঘাত ও গলায় নকের আচড়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তাকে কেউ পরিকল্পনা করে হত্যা করেছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে নিহতের স্ত্রী সামলা আক্তার বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.