ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

স্বাস্থ্য

অলস চোখ ও শিশুর অন্ধত্ব

ডা. শীতেস চন্দ্র ব্যানার্জী

১০ এপ্রিল ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৪:১৪ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৫:০০


প্রিন্ট
অলস চোখ ও শিশুর অন্ধত্ব

অলস চোখ ও শিশুর অন্ধত্ব

মানুষের পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের অন্যতম হচ্ছে চোখ। যার কাজ হচ্ছে দেখতে সহায়তা করা। চোখের কাজ হচ্ছে অনেকটা ক্যামেরার মতো। চোখ কোনো জিনিসের ছবি তুলে নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়। মানুষের ব্রেইন তখন বলে দেয় এটা কিসের বা কার ছবি বা এটির রঙ, আকৃতি কেমন? যদি এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কোনো জায়গায় ব্যত্যয় ঘটে তবে দেখতে সমস্যা হবে। অলস চোখ বা এমব্লায়োওপিয়া চোখের একটি মারাত্মক রোগ, যা প্রধানত একটি শিশুর চোখের ছবি তোলার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। ফলে শিশুটি ওই চোখ দিয়ে কিছুই দেখতে পায় না। আরো ভয়ের বিষয় যদি নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করা হয়, তবে শিশুটির দৃষ্টিশক্তি আর কখনোই ফিরে আসে না। লিখেছেন ডা. শীতেস চন্দ্র ব্যানার্জী


চোখের সবচেয়ে ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ আবরণটির নাম হচ্ছে রেটিনা। এটি আলোক সংবেদনশীল কিছু কোষ দিয়ে গঠিত। চোখের রেটিনার কাজ ক্যামরার ফিল্মের মতো। আমরা যা কিছুই দেখি না কেন, তার একটি ছবি রেটিনায় তৈরি হয়। রেটিনার আলোক সংবেদনশীল কোষগুলো শিশু জন্মের পর যখন চোখে আলো ঢুকে সেই আলোর উপস্থিতিতে পরিপূর্ণতা লাভ করতে থাকে। শিশু জন্মের পর যদি চোখে ঠিকমতো আলো না ঢোকে, তবে রেটিনার আলোক সংবেদনশীল কোষগুলোর বৃদ্ধি পরিপূর্ণভাবে হয় না। ফলে ওই চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং কাজ না করার কারণে চোখটি অলস চোখে পরিণত হয়ে যায়।

অলস চোখের প্রধান কারণ
প্রধান ও একমাত্র কারণ হচ্ছে শিশুর চোখে ঠিকমতো আলো প্রবেশ করতে না পারা। আলো প্রবেশ না করার কারণ হলো-
ষ জন্ম থেকে বা জন্মর পর শিশুর চোখে ছানি তৈরি হলে। ছানির কারণে চোখের লেন্স ঘোলা হয়ে যায়, ফলে চোখে আলো পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রবেশ করে না। চোখে পর্যাপ্ত পরিমাণ আলো প্রবেশ না করার কারণে রেটিনার আলোক-সংবেদনশীল কোষগুলোর বৃদ্ধি হয় না। ফলে শিশু যে চোখে ছানি আসে তাকে কাজে লাগায় না, ফলে চোখটি অলস হয়ে যায়। দুই চোখে ছানি হলে দুটিই অলস হয়ে যায়।

ষ জন্ম থেকে অথবা জন্মের পর চোখের আকৃতিগত পরিবর্তনের কারণে দৃষ্টিশক্তি কম থাকে। ফলে আলো ঢুকতে বাধা পায়। যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে ধীরে ধীরে চোখ অলস হতে থাকে।

ষ টেরা চোখ-মানুষ সব সময় দু’টি চোখ দিয়ে একটি জিনিস দেখে, কিন্তু চোখ টেরা থাকলে শিশু ভালো চোখটি দিয়ে সব সময় দেখার চেষ্টা করে কিন্তু টেরা চোখটি কাজে লাগায় না। ফলে টেরা চোখটি অলস চোখে পরিণত হয়।
ষ জন্মগতভাবে চোখের পাতা নিচের দিকে পড়ে গেলে চোখের যে স্বচ্ছ অংশ (কর্নিয়া) দিয়ে আলো প্রবেশ করে, তা যদি ঢেকে যায়, তাহলে পর্যাপ্ত আলো চোখে প্রবেশ করতে পারে না, ফলে চোখের রেটিনার আলোক সংবেদনশীল কোষগুলোর বৃদ্ধি ঘটে না, চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। যে চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, শিশুরা সেটিকে ব্যবহার না করে সব সময় ভালো চোখটি ব্যবহার করে। ফলে চোখটি অলস চোখে পরিণত হয়।

অলস চোখের কারণে সৃষ্ট সমস্যা
অলস ব্যক্তিদের যেমন কোনো কাজ থাকে না, তেমনি অলস চোখেরও কাজ থাকে না। অলস চোখের কারণে সৃষ্ট প্রধান সমস্যা হচ্ছে টেরা চোখ।
টেরা চোখ- চোখ টেরা হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে অলস চোখ। একটি শিশুর দৃষ্টিশক্তি যদি কমে যায় তাহলে যে চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, সে চোখটি ব্যবহার করে না। ফলে সে চোখটি যেকোনো এক দিকে বেঁকে যায়। নির্দিষ্ট একটি বয়সসীমার মধ্যে চিকিৎসা করে অলস চোখটি সচল করে তুলে টেরা চোখ ভালো হয়ে যায়।

অলস চোখের চিকিৎসা
* যে কারণগুলোর জন্য চোখ অলস হয়, সে কারণগুলোর চিকিৎসা করলে অলস চোখ ভালো করা সম্ভব হয়। তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো রোগীর বয়স। রোগীর বয়স যদি সাত বছরের নিচে থাকে তবেই উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে পরিপূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়। শিশুর বয়স যদি সাত বছরের বেশি হয় তবে চিকিৎসা করেও চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা যায় না।
ষ জন্মগতভাবে যদি শিশুর চোখে ছানি থাকে, তাহলে দ্রুত ছানির অপারেশন করাতে হবে। বয়স সাত বছর পেরিয়ে গেলে অপারেশন করেও তেমন ফল পাওয়া যায় না। ধরা যাক, পাঁচ বছর বয়সের একটি শিশুর জন্মগত ছানি অপারেশন করে চোখে নতুন লেন্স লাগিয়ে দেয়া হলো, তার পরও সে ভালো দেখছে না। এর কারণ হলো- তার চোখটি অলস হয়ে গেছে। তখন তার ভালো চোখটি কাপড় দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়। অলস চোখটিকে দিয়ে বেশি বেশি করে কাজ করানো হয়। বেশি বেশি কাজ করানোর জন্য চোখের রেটিনার আলোক সংবেদনশীল কোষগুলো আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

ষ জন্মগতভাবে শিশুর দৃষ্টিশক্তি কম থাকলে খুব দ্রুত চোখের ডাক্তার দেখিয়ে চশমা ব্যবহার করতে হবে। যদি চশমা দিয়েও কাজ না হয়, তাহলে বিশেষ ধরনের চোখের ব্যায়াম ( যাকে বলে অ্যাকুলেশন থেরাপি) করে চোখের দৃষ্টিশক্তি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। অর্থাৎ যে চোখটি ভালো আছে, তাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখে অলস চোখটিকে দিয়ে কাজ করানো হয়। ফলে অলস চোখটি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

অলস চোখের হাত থেকে রক্ষার উপায়
সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, শিশুটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই অলস চোখ তার দৃষ্টিশক্তিকে চিরতরে নষ্ট করে দেয়। কারণ, অলস চোখের চিকিৎসা একমাত্র সাত বছরের নিচে বয়স থাকলে করা সম্ভব। কারণ এ বয়সসীমার মধ্যে রেটিনার আলোক সংবেদনশীল কোষগুলোর বৃদ্ধি ঘটে। এ জন্য প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত, শিশুকে স্কুলে পাঠানোর আগে একবারের জন্য হলেও চোখের ডাক্তার দেখানো; বিশেষ করে যেসব হাসপাতালে শিশুদের চোখ দেখার আলাদা ব্যবস্থা আছে।

লেখক : সহকারী সার্জন, পেডিয়েট্রিক, অফথালমোলজি বিভাগ, খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫