ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

প্রশাসন

বাসাবোতে ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ এলাকা ছাড়ছেন ভাড়াটেরা

অন্তহীন উন্নয়নের কবলে ঢাকা-২

খালিদ সাইফুল্লাহ

০৯ এপ্রিল ২০১৮,সোমবার, ২৩:৪৪


প্রিন্ট
রাজধানীর বাসাবো বাজারে স্যুয়ারেজ লাইন নির্মাণের জন্য কয়েক মাস আগে এ গর্ত খোঁড়া হয়। এর পর থেকে কাজ বন্ধ। ফেলে রাখা পাইপগুলোও ভেঙে যাচ্ছে। যান চলাচল বন্ধ থাকায় এলাকার দোকানপাটও বন্ধ

রাজধানীর বাসাবো বাজারে স্যুয়ারেজ লাইন নির্মাণের জন্য কয়েক মাস আগে এ গর্ত খোঁড়া হয়। এর পর থেকে কাজ বন্ধ। ফেলে রাখা পাইপগুলোও ভেঙে যাচ্ছে। যান চলাচল বন্ধ থাকায় এলাকার দোকানপাটও বন্ধ

ঢাকা শহরের সর্বত্রই খোঁড়াখুঁড়ি। সংস্থা ভিন্ন। কিন্তু কাজ একই রকম। অর্থাৎ অপরিকল্পিত। ক’মাস আগেই এক সংস্থা যে রাস্তা কেটে গেছে, এখন আরেক সংস্থা এসে একই কাজ করছে। সব মিলিয়ে এলাকাবাসীর আর নিস্তার নেই। উন্নয়নের নামে ভোগান্তির নাভিশ্বাস। কোথাও কোনো শৃঙ্খলা নেই।

যে সংস্থা রাস্তা কেটে যাচ্ছে তারা উপড়ানো মাটি, আবর্জনা রাস্তার ওপরই ফেলে চলে যাচ্ছে। রাস্তা ভরাট এবং কার্পেটিংয়ের দায়িত্ব আবার অন্য সংস্থার ওপর। কবে তারা বাজেট পাবে, কবে মেরামত হবে সেদিকে চেয়ে থাকা ছাড়া নগরবাসীর আর কিছু করার থাকে না।


উন্নয়নের নামে এ ধরনের জনভোগান্তির চিত্র তুলে ধরতে আমরা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধান চালাই। এরই ক্রমধারায় আমাদের সামনে আসে বাসাবো এলাকা। বাসাবো বাজার রাজধানীর একটি ঐতিহ্যবাহী বড় বাজার। এ বাজারে মালামাল আনা-নেয়ার প্রধান সড়ক পূর্ব বাসাবো সড়ক। কিন্তু পাঁচ মাস ধরে এ সড়কটি অচল হয়ে রয়েছে। এতে ব্যবসাবাণিজ্য, চলাচলসহ বিভিন্ন কাজে চরম বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীসহ এলাকার বাসিন্দারা। এ কাজ কবে শেষ হবে তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তারা। আসন্ন বর্ষায় চরম বিপদে পড়ার ভীতি কাজ করছে তাদের মধ্যে। শুধু এ সড়কই নয়, ওই সড়কসংলগ্ন ওহাব কলোনি, খিলগাঁও ফ্লাইওভারের বাসাবো লুপ থেকে নন্দীপাড়া পর্যন্ত মধ্য বাসাবো সড়ক, পাটোয়ারি গলি, ওয়াসা রোডসহ বেশকিছু সড়কে কয়েক মাস ধরে ড্রেন নির্মাণকাজ চলছে। ড্রেনে পাইপ বসানোর জন্য পুরো রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বাসাবো এলাকার জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে। খুঁড়ে রাখা রাস্তা দিয়ে কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করতে না পারায় পাশের অন্য সড়কগুলোতে রাত-দিন তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এলাকার রাস্তার পাশের অনেক দোকানপাট ও ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ভাড়াটে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।


বাসাবো বাজারসংলগ্ন রাস্তায় দেখা যায়, মধ্য বাসাবো টেম্পোস্ট্যান্ড থেকে পূর্ব বাসাবো কবরস্থান পর্যন্ত সড়কে ড্রেন নির্মাণের কাজ চলছে। এ জন্য রাস্তার মাঝখানে খুঁড়ে সম্প্রতি বড় বড় পাইপ বসানো হয়েছে। বর্তমানে পাইপগুলোর সংযোগস্থলে স্লাব বসানোর কাজ চলছে। তবে এখনো সড়কের মাঝখানে স্তূপ আকারে রাখা মাটি রয়েছে। সড়কের দুই পাশে সরু পথ দিয়ে পথচারীরা কোনো রকমে চলাচল করতে পারলেও কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। ওই সড়কের পাশের ওহাব কলোনিতেও সম্প্রতি ড্রেন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এ জন্য সরু এ গলির মাঝখানে বড় নালা তৈরির পর মাটি রাখা হয়েছে দু’পাশে। এতে ওই গলি দিয়ে কোনো রিকশা এমনকি হেঁটেও যেতে পারছেন না এলাকাবাসী। এ ছাড়া বাসাবো কবরস্থানের পাশে মাটি ও পাইপ ফেলে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে।


ইমন নামে ওই সড়কের এক ব্যবসায়ী বলেন, প্রায় পাঁচ মাস ধরে রাস্তা বন্ধ রয়েছে। প্রথমে রাস্তার ওপর সিমেন্টের বড় বড় পাইপ এনে ফেলা হয়। এতে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় কেটে যায় প্রায় আড়াই মাস। এরপর গত মাস দেড়েক আগে রাস্তা কেটে পাইপ বসানো হয়েছে। এ জন্য রাস্তার মাঝখানে মাটি স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ইট-কাঠ ও পাথর যেখানে সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে।

এতে পথচারীদের চলাচলেও সমস্যা হয়। রিকশা বা গাড়ি কোনো কিছুই এ সড়কে আসতে পারে না।

এতে বাইর থেকে মালামাল আনতে সমস্যা হয় ব্যবসায়ীদের। ট্রাকে পাশের রাস্তায় মাল এনে রাখার পর অতিরিক্ত শ্রমিক ব্যবহার করে দোকানে মালামাল আনতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আবার ক্রেতারা আসা কমিয়ে দেয়ায় ব্যবসায়ও মন্দা যাচ্ছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্রোকারিজ ব্যবসায়ী বলেন, প্রথমে যখন রাস্তার মাটি কেটে দোকানের সামনে রাখে তখন দুই দিন দোকানই খুলতে পারিনি। মাটি কিছু সরানোর পর এখন খুলতে পারছি, কিন্তু বিক্রি অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। আগে প্রতিদিন সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকার মালামাল বিক্রি করলেও এখন এক হাজার বা এক হাজার ২০০ এর বেশি বিক্রি করতে পারি না। ধুলাবালুতে দোকানে টেকা যায় না। সামনে বর্ষা মওসুম আসছে। আমরা আতঙ্কে আছি। বৃষ্টির আগে কাজ শেষ না হলে কাদাপানিতে বিপর্যস্ত অবস্থা হবে। তখন কষ্টের শেষ থাকবে না।


আরেক চাল ব্যবসায়ী বলেন, অনেক ক্রেতা আগে এক বস্তা চাল নিয়ে যেত। কিন্তু এখন রিকশা যাতায়াত করতে না পারায় পাঁচ-সাত কেজি করে কিনে নিয়ে যায়। এতে আমাদের ব্যবসার ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।


মধ্য বাসাবো সড়ক : বিশ্বরোড থেকে নন্দীপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্য বাসাবো সড়ক। এ সড়কটি দীর্ঘ দিন থেকে ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে। বর্ষাকালে সড়কের কয়েক স্থানে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া পুরো সড়কই কাদাপানিতে একাকার হয়ে যায়। ছয় মাস আগে থেকে সড়কটি মেরামতের কাজ চলছে। বিশ্বরোড থেকে কিছু অংশ সম্প্রতি পাকা করা হয়েছে। টেম্পোস্ট্যান্ড থেকে নন্দীপাড়া পর্যন্ত সড়কে ড্রেন নির্মাণসহ সড়ক সংস্কার করা হচ্ছে। কিন্তু এ নির্মাণকাজ এতটাই ধীরগতিতে চলছে যে মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। সড়কের মাঝখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে দীর্ঘ দিন ফেলে রাখা হয়। বর্তমানে পাইপ বসানোর পর কিছু অংশের সংযোগস্থলে স্লাব বসানো হয়েছে। কিন্তু এ স্লাবগুলো উঁচু করে রাখার কারণে যানবাহন চলাচলে চরম ভোগান্তি হচ্ছে। অনেক সময় সরু পথ দিয়ে দু’দিকের যানবাহন চলতে গিয়ে যানজট ও দুর্ঘটনা ঘটছে। আবার কিছু অংশে কেবল খুঁড়ে রাস্তার পুরোটা জুড়ে মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। এতে ওই রাস্তা দিয়ে গাড়িতো দূরের কথা, রিকশা-ভ্যানও চলাচল করতে পারছে না। ছাপড়া মসজিদের গলির হেলাল উদ্দিন জানান, এলাকার রাস্তার দুরবস্থার কারণে তিনি বাসা ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এভাবে আরো অনেকেই বাসা ছেড়ে যাচ্ছেন বলে এলাকার বাড়িওয়ালারা জানান। আদি বিক্রমপুর সুইট অ্যান্ড বেকারির কর্মচারীরা জানান, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে দোকানের বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাশেই জয় টেলিকমের জয় বলেন, সাত মাস আগে এখানে দোকান দিয়েছি। এর মধ্যে চয় মাসই রাস্তা কাটা।

ব্যবসায় চরম ক্ষতি হচ্ছে। আরিফ হোসেন নামে এক পথচারী বলেন, এলাকায় কেউ হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে জরুরিভাবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। বিষয়টিতে সিটি করপোরেশনের কোনো নজর নেই বলে তিনি অভিযোগ করেন।


পাটোয়ারি গলি : মধ্য বাসাবো সড়কসংলগ্ন পাটোয়ারি গলির অবস্থা দীর্ঘ দিন থেকে শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সম্প্রতি পাইপ বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। দীর্ঘ দিন থেকে রাস্তা খুঁড়ে রাখায় মানুষের চলাচল ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়। এলাকাবাসী খালের পাশ দিয়ে বিকল্প একটি পথ তৈরি করে নিতে বাধ্য হয়েছেন।


দক্ষিণ গোড়ান : দক্ষিণ গোড়ানের গলিতে সম্প্রতি মাটি খুঁড়ে পাইপ বসানোর কাজ শুরু হয়েছে।

ড্রেনের জন্য খুঁড়ে রাখা মাটির পুরোটাই গলির মধ্যেই রাখার কারণে মানুষ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারছে না।


ওয়াসা রোড : কদমতলা ওয়াসা রোড থেকে মুগদা বাসার টাওয়ার পর্যন্ত সড়কে গত ১৫ জানুয়ারি থেকে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। এর আরো ১৫ দিন আগে সড়কে এনে রাখা হয় মোটা মোটা সিমেন্টের পাইপ। ওই সময় থেকেই সড়কে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে ড্রেনের জন্য মাটি খুঁড়ে রাস্তার ওপর পাহাড়সদৃশ করে জমা করে রাখা হয়েছে। এতে কোনো কোনো স্থানে হেঁটেও যাওয়া কষ্টকর হয়ে গেছে। রাতে সড়কে কোনো কোনো স্থানে সড়কবাতি না থাকার কারণে মানুষ অহরহ দুর্ঘটনায় পড়ছে। আলহাজ আব্দুল করিম নামে এক এলাকাবাসী বলেন, রাস্তায় মাটি এমনভাবে রাখা হয়েছে একজন মানুষ হেঁটেও যেতে পারছে না। তিনি বলেন, তিন মাস ধরে কাজ চলছে, যেভাবে ধীরে কাজ চলছে তাতে কবে কাজ শেষ হবে তা-ও বোঝাও যাচ্ছে না। সামনে বর্ষাকাল আসছে ভোগান্তির শেষ থাকবে না।


দোকান আগুনে পুড়লেও ক্ষতিপূরণ পাননি : গত ৫ ডিসেম্বর মধ্য বাসাবো সড়কের মাদারটেক এলাকায় আফজাল হোসেনের বাড়ির সামনের রাস্তায় স্কেভেটর দিয়ে ড্রেন খোঁড়ার সময় গ্যাসলাইন বিস্ফোরণে পার্শ্ববর্তী সুমন হার্ডওয়ারে আগুন লেগে যায়। এতে ওই দোকানের প্রায় ৬০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায় বলে দোকান মালিক শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেন। এ ব্যাপারে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি বলে তিনি জানান।


যানজট : মধ্য বাসাবো রোড, বাজার রোড এবং ওয়াসা রোডে মাসের পর মাস খুঁড়ে রাখার কারণে বাসাবো বৌদ্ধমন্দিরসংলগ্ন সড়কে রাত-দিন যানজট লেগেই থাকছে। মাঝে মধ্যে এ সড়কে অসহনীয় যানজট সৃষ্টি হয় বলে এলাকাবাসী জানান। মিজানুর রহমান নামে এক এলাকাবাসী বলেন, সকাল থেকেই যানজট সৃষ্টি হয়। রাত ১২টার সময়ও দেখা যায় দু’লাইনে গাড়ির দীর্ঘ সারি। রাতে ট্রাক চলাচল শুরু হলে তখন অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া এ সড়কে অবৈধ সিএনজি স্ট্যান্ড থাকায় যানজটের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সিএনজি চালকদের বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।


এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো: আসাদুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে কিছু সময় লাগা স্বাভাবিক। তবে মানুষের চলাচলের যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সে বিষয়টি দেখতে আমরা ঠিকাদারকে বলেছি। তিনি বলেন, আগামী জুন মাসের মধ্যে আমরা সব উন্নয়নকাজ শেষ করব।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫