রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্নকারী ঘাতক বাসের একটি স্বজন পরিবহন
রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্নকারী ঘাতক বাসের একটি স্বজন পরিবহন

ঢাকায় বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন চালক

আহমেদ ইফতেখার

রাজধানীর সড়কে যমদূতে পরিণত হয়েছেন যাত্রীবাহী বাসচালকেরা। তারা বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গাড়ি চালাতে গিয়ে কেড়ে নিচ্ছেন সাধারণ মানুষের প্রাণ। কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। নিয়মিত একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পরও বাসচালকদের হুঁশ ফিরছে না। ঢাকায় নিরাপদ নাগরিক জীবনের জন্য এসব চালককে নিয়ন্ত্রণ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লিখেছেন আহমেদ ইফতেখার

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন (২১)। বাস থেকে তার ডান হাতটি সামান্য বাইরে বেরিয়ে ছিল। হঠাৎই পেছন থেকে স্বজন পরিবহনের একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে ওভারটেক করতে চেষ্টা করে। এ সময় দুই বাসের ঘেঁষাঘেঁষির প্রবল চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারানো তিতুমীর কলেজের স্নাতকের ছাত্র রাজীব হোসেনকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে বেপরোয়া দুই বাসচালক।
বেলা তখন সোয়া ১টা। ভিড়ের কারণে রাজীব দাঁড়িয়েছিলেন বিআরটিসির দোতলা বাসের পেছনের ফটকে। হাতটি বেরিয়েছিল সামান্য বাইরে। হঠাৎই পেছন থেকে একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে পেরিয়ে যাওয়ার বা ওভারটেক করার জন্য বাঁ দিক গা ঘেঁষে পড়ে। দুই বাসের প্রবল চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দু-তিনজন পথচারী দ্রুত তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেও বিচ্ছিন্ন সে হাতটি রাজীবের শরীরে আর জুড়ে দিতে পারেননি।
ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন রাজীবের চিকিৎসার জন্য সাত সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের প্রধান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা: শামসুজ্জামান শাহীন বলেন, আমরা তার সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট দিয়েছিলাম। তাতে দেখা গেছে, তার মাথায় আঘাত রয়েছে। দুর্ঘটনার পর তার মাথার খুলিতে ফাটল ধরেছে। চোখের পেছনে মস্তিষ্কে পানি ও রক্ত জমেছে। এ জন্য ওষুধ দেয়া হয়েছে। যদি তাতে না সারে, তাহলে অপারেশন করতে হবে। আপাতত তার অবস্থা স্থিতিশীল। শুধু ড্রেসিংয়ের জন্য তাকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেয়া হচ্ছে। তাকে উন্নতমানের অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়েছে। রাজীবের চিকিৎসার সব ব্যয় বহন করছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এ ছাড়া বাড়তি যেসব খরচ হচ্ছে, তা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক তার নিজস্ব তহবিল থেকে দিচ্ছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী আরেকটি বাসের যাত্রী আলাউদ্দিন হাসান বলেন, বেলা সোয়া ১টার মতো হবে। সোনারগাঁও ক্রসিংয়ে সিগন্যাল পড়েছে মাত্র। এ সময় চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে বাস থেকে নেমে দেখি ডান হাত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এক যুবক গোঙাচ্ছেন ও চিৎকার করছেন। সারা শরীর রক্তমাখা। অনেকেই মুঠোফোনে ছবি তুলছেন। তখন আমিসহ দু-তিনজন ধরাধরি করে যুবকটিকে একটি রিকশায় করে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যাই। আমাদের অনুরোধে চিকিৎসকেরা যুবকটির প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঘণ্টাখানেক পর দুই বাসের মাঝখানে পড়ে থাকা হাতটি উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। রাজীবের স্বজনেরা হাসপাতালে পৌঁছার পর তার চিকিৎসা শুরু হয়।
রাজধানী ঢাকা শহরের অন্যতম ব্যস্ততম সড়কে সবার চোখের সামনে ঘটল এই ঘটনা। আইন না মানা, বেপরোয়া গতি, যাত্রী নিতে দুই বাসের পাল্লাপাল্লি, যখন-তখন দুর্ঘটনা, দেশজুড়ে এটি এখন হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ, অনেকে হয়ে পড়ছে রাজীবের মতো অসহায়। ডান হাত হারিয়ে রাজীব হোসেনের সামনে এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বাস মালিকেরা অর্থবিত্তে বলীয়ান, রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রতাপশালী; চাঁদার টাকায় গড়ে তোলা বেতনভুক্ত ক্যাডারবাহিনীও আছে তাদের। মোটা অঙ্কের মাসোহারায় আজ্ঞাবহ রাখেন থানা-পুলিশ, ট্রাফিক-প্রশাসন। প্রকাশ্য চাঁদাবাজি, মানুষ হত্যা থেকে শুরু করে মারাত্মক সব অপরাধ ঘটিয়েও তারা বরাবরই থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। দাপুটে মালিকদের ক্ষমতা, প্রতাপ আর তোয়াক্কাহীনতায় তাদের বাস-মিনিবাসগুলো আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মালিকদের মাসোহারার সুবাদে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা ও ইচ্ছাকৃত অপরাধ ঘটিয়ে বেমালুম রেহাই পেয়ে যান সংশ্লিষ্ট বাস-মিনিবাসের চালক-সহকারীরা। তারা গাড়ির ভেতরে যাত্রীদের নানাভাবে হেনস্থা করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, ইদানীং গাড়ির ভেতরে নারী যাত্রীদের আটক রেখে গণধর্ষণসহ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতেও দ্বিধা করছে না।
শাস্তি পেতে হয় না বলেই চালক-হেলপারদের মধ্যে দিন দিনই অসতর্ক, অবহেলা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বেড়েছে। ফলে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে দুর্ঘটনা আর হতাহতের সংখ্যা। আইনে মোটরযান শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দেয়া ও দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টার বেশি কাজ না করানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও ৩৪ বছর ধরে পরিবহন মালিকেরা তা মানছেন না। মাসিক বেতন না থাকায় প্রায় ৯৫ শতাংশ চালকই রোজগারের জন্য দিনে আট ঘণ্টার বদলে ১৪ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। দৈনিক ট্রিপনির্ভর বেতন হওয়ায় বাড়তি আয়ের জন্য স্থানে স্থানে যাত্রী তোলেন তারা। বিশ্রাম না নিয়ে, নির্ঘুম কাটিয়ে আয় করা বাড়তি টাকার পুরোটা অবশ্য তারা ঘরে নিতে পারেন না। মালিক ছাড়াও এর ভাগ দিতে হয় পুলিশ ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের।
রাজীবের ডান হাত হারানোর ঘটনায় আটক দুই গাড়িচালকের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গ্রেফতার হওয়া বাসচালকেরা হলেন বিআরটিসি বাসের চালক ওয়াহিদ (৩৫) ও স্বজন বাসের চালক খোরশেদ (৫০)। রাজীবের এই ঘটনার পর দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠে। বলা বাহুল্য, যাত্রী-পথচারীরা এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চান। এরপরও ‘হুঁশ’ ফেরেনি ঢাকার সড়কে চলা বাসের চালকদের।
কাওরানবাজার সিগন্যালে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক মাহবুব রহমানে সাথে। তিনি বলেন, রাস্তায় বের হয়ে নিরাপদে বাসায় ফেরাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি মুহূর্তেই এই ঝুঁঁকি নিয়ে আমাদের চলতে হচ্ছে। আমরা এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাই। পুলিশ তো চাইলে সব পারে। তাহলে বাসচালকদের কেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না?
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোসলেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। পুলিশ এখন দুই ধরনের কাজ করছে। একটা এনফোর্সমেন্ট, আরেকটা হলো সচেতনতা বৃদ্ধি করা। প্রতিদিন শুধু বাসের বিরুদ্ধেই চার শতাধিক মামলা হচ্ছে। লাখ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও তাদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দু-পাঁচশ টাকার একটা মামলা দিলে তারা কিছুই মনে করে না। এমনকি বাস ডাম্পিংয়ে পাঠালেও মালিকরা জরিমানা দিয়ে নিয়ে আসেন। ফলে বিষয়গুলো আর চালকদের গায়ে লাগছে না। জেল-জরিমানা করেও দেখেছি, কাজ হয় না। আসলে ওদের মধ্যে সচেতনতা দরকার। এই সচেতনতার লক্ষ্যে আমরা প্রতিটি স্কুলে ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছি। পাশাপাশি বাসস্ট্যান্ডসহ জনবহুল জায়গাগুলোয়ও বড় পর্দায় এসব ডকুমেন্টারি দেখানো হচ্ছে। এতে যে কিছু কাজ হচ্ছে না, তা নয়। তবে সবার সচেতনতা দরকার।
অনেক বাসযাত্রী জানান, রাজীবের মতো দৃশ্য তারা প্রতিদিনই দেখছেন। কে কার আগে যাবে, কিভাবে যাবে এই প্রবণতা চলছেই। পথচারীরা যেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন, তার মধ্যেই ঢুকে পড়ে বাসগুলো। ঢাকার রাস্তায় মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়-ঝক্কর বাসগুলোর চালকেরাই এই ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটাচ্ছে।
ইনসেট ছবি : মিজানুর রহমান খান

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.