ব্যাংক কর্মকর্তারা দিশেহারা
ব্যাংক কর্মকর্তারা দিশেহারা

আমানতের সুদহার লাগামহীন : ব্যাংক কর্মকর্তারা দিশেহারা

আশরাফুল ইসলাম

সফিউল (ছদ্মনাম) চাকরি করেন নতুন প্রজন্মের একটি ব্যাংকে। পরপর দুই মাস আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেননি। ব্যাংক থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে চলতি মাসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে চাকরিই রক্ষা করা যাবে না। সুদহার বড় বিষয় নয়, যেকোনো উপায়ে আমানত সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। ১২ শতাংশ সুদে বড় অঙ্কের আমানতও পেয়েছিলেন। কিন্তু অন্য ব্যাংক বেশি সুদ দিয়ে ওই আমানতকারীকে বাগিয়ে নিয়েছেন। এখন তিনি আবার মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। শেষ মুহূর্তে তার চাকরি রক্ষা হবে কি?

গত বৃহস্পতিবার মতিঝিল ব্যাংকপাড়ায় নিজ ব্যাংকের নিচে দাঁড়িয়ে এ প্রতিবেদকের কাছে এসব বলছিলেন ব্যাংকে চাকরি নিয়ে ভাগ্য ফেরাতে আসা সফিউল। তিনি বলেন, ব্যাংকে চাকরিতে যোগদানের আগে অনেকেই বলতেন গাড়ি, ফ্ল্যাটের মালিক হতে হলে ব্যাংকে চাকরি করতে হবে। কিন্তু এখন চাকরিতে যোগদানের পর মনে হচ্ছে এমন দোযখের চাকরি দেশে আর নেই।

সফিউলের মতো আরো অনেকেরই একই বক্তব্য। সুদ হার কোনো বিষয় নয়, যেকোনো হারে এখন আমানত সংগ্রহে মরিয়া ব্যাংক কর্মকর্তারা। প্রধান কার্যালয় থেকে ব্যাংক শাখায় আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হচ্ছে। শাখা ব্যবস্থাপক আবার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের তা অর্জনের জন্য লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিচ্ছেন। প্রতিদিনই শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে জবাবদিহিতা করা হচ্ছে। সবমিলে দেশের ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।


জানা গেছে, প্রতি মাসেই ব্যাংক থেকে কী হারে আমানত সংগ্রহ করা হবে তার একটি তালিকা নির্ধারণ করা হয়। প্রতি মাসেই তা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তা সমন্বয় করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহের যে হার পাঠায় তা তাদের মধ্যবর্তী হার। এ হার থেকে দেড় শতাংশ কম বা বেশি হারে আমানত সংগ্রহ করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কোনো ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের হার ৮ শতাংশের ওপরে নেই। সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে পারে ব্যাংকগুলো। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমানতের সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। যে যেভাবে পারছে সেইভাবে আমানত সংগ্রহ করছে। যেমন- কোনো গ্রাহক একটি ব্যাংকে ১০ শতাংশ সুদে আমানত রেখেছেন। আরেক ব্যাংকের কর্মকর্তা বেশি মুনাফা দিয়ে নিজ ব্যাংকে নিয়ে আসছেন।
আমানত সংগ্রহে ব্যাংকিং খাতের এ অশুভ প্রতিযোগিতা এত দিন নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশি হারে পরিলক্ষিত হতো। কিন্তু এখন নতুন, পুরনো সব ব্যাংকেই একই অবস্থা বিরাজ করছে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সরকারি ব্যাংক বাদে বেসরকারি সব ব্যাংকেরই এখন টাকার সঙ্কট চলছে। এর অন্যতম কারণ হলো, বেশির ভাগ বড় ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিচ্ছেন না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেকেই ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছেন। কিন্তু সেই ঋণ আর পরিশোধ না করায় ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে। অপর দিকে হলমার্ক, বেসিক ব্যাংকের ঘটনার পর ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি ব্যাংকিং খাতকে আরো বেশি আস্থার সঙ্কটের মুখে ফেলে দিয়েছে। ফারমার্স ব্যাংক গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।

ফলে অনেকেই ব্যাংকগুলোতে আমানত রাখতে ভয় পাচ্ছেন। কেউ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। কেউবা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নানা ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করছেন। সবমিলেই ব্যাংকিং খাতে টাকার জন্য হাহাকার পরে গেছে। এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ব্যাংকারদের। দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা মোটেও সুখকর নয়। কারণ আমানত নিয়ে কাড়াকাড়িতে এক দিকে আমানতের সুদহার বাড়ছে। ১২ ও ১৩ শতাংশে আমানত নিলে কমপক্ষে ১৭ ও ১৮ শতাংশ হারে বিনিয়োগ করতে হবে। এতে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে যাচ্ছে।

এমনিতেই বিনিয়োগ হচ্ছে না, এর ওপর সুদহার বেড়ে গেলে ব্যবসা ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে সবধরনের দামও বেড়ে যাবে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অসহনীয় হয়ে উঠবে। এটা নিরসন হওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.