ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

আলোচনা

হঠাৎ করেই আমন্ত্রণ

আসমা আব্বাসী

০৫ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৬:০৪


প্রিন্ট

আজি দখিন-দুয়ার খোলা-
এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো।
দিব হৃদয়দোলায় দোলা,
এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো ॥
এসো বনমল্লিকাকুঞ্জে এসো হে, এসো হে, এসো হে।
মৃদু মধুর মদির হেসে এসো পাগল হাওয়ার দেশে,
তোমার উতলা উত্তরীয় তুমি আকাশে উড়ায়ে দিয়ো-
এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো।
বসন্তের আবাহনে মুখরিত জয়গানে উত্তাল প্রহরে এসে পৌঁছলাম শান্তিনিকেতনে, সেই আম্রকুঞ্জ, সেই ছাতিমতলা, সেই বেণুবন, যেখানে রচিত হয়েছে বাংলার সেরা গান, সেরা কবিতা, সেরা প্রবন্ধ, আমাদের সবার হৃদয়ে সদা জাগ্রত কবি, কবি রবীন্দ্রনাথ।
হঠাৎ করেই আমন্ত্রণ এলো শান্তিনিকেতন থেকে, রোটারি ক্লাব অব শান্তিনিকেতন আয়োজন করেছে একটি সুন্দর কনফারেন্সের, সেখানে আমন্ত্রিত বিভিন্ন রোটারি জেলার গভর্নররা, তারই একজন আমার স্বামী মুস্তাফা জামান আব্বাসী। তিন দিনের সফর, তাতে কি, সেই তিন দিন তো সহ¯্র দিনের রূপান্তরিত হয়ে গেল সেখানকার কর্মকর্তাদের আন্তরিক আপ্যায়নে।
যে তিনটি দিনে কনফারেন্সের বিভিন্ন সেশন হলো তার সবই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চরিত্র, সবকিছুই পল্লবিত হলো তাঁদের বিভিন্ন সেশনে। আমার ইনার হুইলের বোনেরা একটি সন্ধ্যায় গানের আয়োজন করলেন। নানা কবির, নানা সঙ্গীত এবং চমৎকার ধারাবর্ণনা, তাঁদের পরনে বাসন্তী রঙ শাড়ি, খোঁপায় পলাশের মালা এবং গাওয়ার ভঙ্গিটি অনবদ্য। এখনো যেন শুনতে পাই তার ধ্বনি। অংশুমান দাদা ও বৌদি তাঁদের কন্যাকে নিয়ে আকর্ষণ বাড়িয়েছেন অনুষ্ঠানের। অন্য সবাই অসাধারণ, তাঁদের নাম মনে গাঁথা। কিন্তু এই মুহূর্তে কণ্ঠে আসছে না বলে বড্ড দুঃখ হলো। গোলাপকে যে নামেই ডাকুন না কেনো, সে চিরসুন্দর, এ কথা ভেবে সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করলাম।
যে বাড়িটিতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা তাকে বাড়ি না বলে ভবন বলা চলে অথবা রাজভবন। ‘বিণয় ভবন’ নামক ভবনটি রাজকীয়ভাবে সাজানো। ভেতরে অত্যন্ত সুন্দর সোফা, চেয়ার, কেদারা, টেবিল এবং দেয়ালে তৈলচিত্র। সুন্দর কারুকাজ করা দু’টি সিঁড়ি বাঁকানোভাবে উঠে গেছে দ্বিতলে, সেখানে শোয়ার ঘর, বসার ঘর, গোসলের ঘর এবং আড্ডা দেয়ার জন্য ফরাস পাতা।
নিচের তলায় বৃহৎ ডাইনিং রুম, অত্যন্ত সুন্দর টেবিলম্যাট দিয়ে সাজানো বড় বড় থালায় খাবার পরিবেশন, লুচি, বেগুন ভাজা থেকে শুরু করে শুক্ত চাটনি, মাছ ও সবজির অনেক রকম তরকারি। গোবিন্দভোগ চালের গরম ভাত উপরে অত্যন্ত সুগন্ধী গাওয়া ঘি। শেষ পাতে দই, রাবড়ি ও রাজভোগ। আমাদের বিরল সৌভাগ্য একদা রোটারি জগতের সর্বোচ্চ পদে আসীন ইন্টারন্যাশনাল রোটারির প্রেসিডেন্ট কল্যাণ ব্যানার্জি ছিলেন আমাদের পাশের রুমে। আমি বারে বারেই মিস করছি তাঁর লাবণ্যময়ী স্ত্রী বিনতাকে। এবারে তিনি আসেননি, তবু মনে হলো তাঁর সান্নিধ্য পাচ্ছি কল্যাণদার মধ্যে।
শান্তিনিকেতনের পথে পথে অজস্র আমগাছ, মুকুলে মুকুলে মুকুলিত, তার মিষ্টি সুগন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, ডালে ডালে নানা রকম পাখির কিচিরমিচির, দূরে দেখা যায় পলাশের লাল আভা। ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে’। বলতে হয় না, অনুভব করতে হয় হৃদয়ে।
আমার ছোট মামা সৈয়দ মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া করেছেন। বিদ্যা ভবন, শিক্ষা ভবন, এসব গল্প শুনতাম তাঁর কাছে। কী সৌভাগ্য মামুর, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পড়িয়েছেন ক্লাসে, তাঁর স্নেহধন্য ছিলেন তিনি। তাই তো একদিন রবীন্দ্রনাথ ক্লাসে পড়াতে পড়াতে বললেন, ‘আলীর সবই তো ভালো, শুধু কথার মধ্যে একটু কমলালেবুর গন্ধ।’
মনে মনে ভাবি আহারে আমি যদি থাকতাম রবীন্দ্রনাথের কালে, হয়তোবা বিরল সৌভাগ্য হয়ে যেত কবিগুরুর একটি ক্লাসে যোগ দেয়ার।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫