ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

দেশ মহাদেশ

কিমের গোপন চীন সফর

আহমেদ বায়েজীদ

০৫ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

গত ২৮ মার্চ চীনা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় যে, উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন বেইজিং সফর করে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এই খবরটি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়টিকে আরো জটিল করে তোলে যা নিয়ে এত দিন কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনাকল্পনা চলে আসছে।
কিমের সফরটি শুরু থেকেই ছিল রহস্যাবৃত ও গোপন। সফরের যে দু’টি দিন তিনি চীনে অবস্থান করেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সফরটি নিয়ে উভয় পক্ষ চুপ ছিল। কিম বেইজিং ত্যাগ করার পর বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলে চীন ও উত্তর কোরিয়া। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আরোহণের পর এটিই কিমের প্রথম কোনো বিদেশী রাষ্ট্রনেতার সাথে সাক্ষাৎ। এই সফর যদি উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নতুন ধাঁধার সৃষ্টি করে থাকে, সেই সাথে বলতে হবে এটি অনেক বিষয় স্পষ্টও করে দিয়েছে।
এই সফরের মধ্য দিয়েই মূলত উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে চীনের ভূমিকা কতখানি তা স্পষ্ট হলো। এত দিন এই বিষয়টিতে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হলেও চীন এবার ঘটনার কেন্দ্রস্থলে চলে এসেছে। চীন প্রায়ই উত্তর কোরিয়াকে ‘ছোট ভাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করত। যদিও দেশ দু’টির মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়েছিল কিম জং উনের সরকারের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে। গত বছর শি জিনপিং উত্তর কোরিয়াকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন কোনো দেশই স্বেচ্ছাবিচ্ছিন্নতার পথে হাঁটতে পারে না। যেটি ছিল কিম জং উনের জন্য একটি বড় ধাক্কা। এরপর চীনা প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়ায় বিশেষ দূত পাঠালেও তার সাথে সাক্ষাৎ করেননি কিম। তবে এই সাময়িক অচলাবস্থা দুই দেশের সম্পর্কে কোনো ভাঙন সৃষ্টি করেনি। এবার কিমকে স্বাগত জানিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে ছিল আগের ভেদাভেদ ভুলে কাছে টানার সুর। তিনি বলেছেন, এই সফরে আমরা ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনা করেছি। কোরীয় উপদ্বীপের সঙ্কট নিরসনে উত্তর কোরিয়া যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিস্টদের কূটনীতিতে একটি কথা আছে যে, পুরনো অভ্যাস দূর করা কঠিন। এ যেন তারই প্রমাণ।
কিমের এই সফরটি যেন শি জিনপিংয়ের জন্যও ছিল স্বস্তির। কিছু দিন আগে কিম জং উন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ট্রাম্প তা গ্রহণও করেছেন। বিষয়টি উদ্বিগ্ন করেছিল চীনা নেতাকে। চীনারা আশঙ্কা করেছিল তাদের বাদ দিয়েই হয়তো আলোচনা হতে যাচ্ছে এবং কোরিয়া ইস্যুতে কোনো প্রস্তাব না দিয়ে তাদের সামনে ছুড়ে দেয়া হবে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকি। এই সফরের পর বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকেরা এখন আশাবাদী হতে পারছেন যে, ট্রাম্প-কিম বৈঠক নিয়ে তাদের জন্য সৃষ্ট হুমকির কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এখন আশার কথা হচ্ছে যে, এই বৈঠক যদি হয়, সেখানে হয়তো চীনের সহযোগিতাও চাওয়া হবে। কিমের সফরের পরই চীন ঘোষণা দিয়েছে তাদের পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ইয়াং জাইচেই শিগগিরই দক্ষিণ কোরিয়া সফর করবেন। এ ঘোষণাকেই দেখা হচ্ছে কোরিয়া ইস্যুতে চীনের জড়িত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে।
উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে দেখলে এই সফর প্রমাণ করে দেশটির সবচেয়ে বড় মিত্র ও প্রধান অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক (চীন) আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপের সময়ে তাদের পাশে থাকবে। এপ্রিলের শেষ দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের সাথে বৈঠক হতে পারে কিমের। আর এরপরই মে মাসে বৈঠক হওয়ার কথা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে। দু’টি বৈঠকের বিষয়ে কিম বেইজিংকে নিশ্চিত করেছেন। আর দুই কোরিয়ার নেতাদের বৈঠকের বিষয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরুর আগ মুহূর্তেই বেইজিং সফর করলেন তিনি। বোঝা যাচ্ছে অন্তত এই মুহূর্তে চীনের সাথে ঝগড়া করার ইচ্ছা নেই উত্তর কোরিয়ার।
বেইজিংয়ে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কিম জং উন যে বক্তৃতা দিয়েছেন তাতে আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে তার মানসিকতা বদলের বিষয়ে। তিনি বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র যদি সরল বিশ্বাসে তার প্রচেষ্টায় সহযোগিতা এবং একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে তাহলেই কেবল পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি সমাধান হতে পারে। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি এখনো অঙ্গীকারবদ্ধ বলে শি জিনপিংকে জানিয়েছেন।
তবে ইতঃপূর্বে উত্তর কোরিয়া যেসব বক্তব্য দিয়েছে তার সাথে খুব বেশি পার্থক্য নেই তার এবারের বাচনভঙ্গির। কারণ উত্তর কোরিয়ার কাছে একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অর্থ হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সাথে সামরিক জোট বাতিল করা। তথাপি কিমের বেইজিং সফরকে যুক্তরাষ্ট্র উপস্থাপন করছে উত্তর কোরিয়ার ওপর সংলাপের যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টিতে চাপ প্রয়োগের প্রমাণ হিসেবে। কিমের এই আকস্মিক সফর হয়তো সেই পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। 

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫