ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

দেশ মহাদেশ

যুদ্ধের ১৫ বছর পর ইরাক

আনিসুর রহমান এরশাদ

০৫ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ইরাক যুদ্ধের ১৫ বছর পর দেশটি কোথায় এসে দাঁড়াল তার পর্যালোচনা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা কমছে। ইরাকের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেমন ইরানের সাথে ভালো তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও। ২৫ বছর পরে ২০১৬ সালে বাগদাদে দূতাবাস খুলেছে রিয়াদ। রাশিয়া ও ইরাকের মধ্যে ১৩ বছর পর বাণিজ্যিক বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের ৯ বছর পর থেকেই সমরাস্ত্র প্রদর্শনীর আয়োজনও করছে ইরাক। ২৭ বছর পর ইরাকের রাজধানী বাগদাদে সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক বিমান অবতরণ করেছে। বাগদাদ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাজধানীর চেয়ে নিরাপদে আছে। ইরাকে রয়েছে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুদ, তেল উৎপাদনের পরিমাণেও রেকর্ড গড়েছে। কাতারে দুই হাজার বিদেশী বিনিয়োগকারী ইরাক পুনর্গঠনসংক্রান্ত সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। অনেক দেশই বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ও এগিয়ে এসেছে।
ধ্বংসের বিভীষিকা কাটিয়ে উঠতে দরকার অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ। মানবিক বিপর্যয় রোধ করে জনগণকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে দরকার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। ইরাক পুনর্গঠনের জন্য প্রাথমিকভাবে দুই হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন বলে ইরাক সরকার জানালেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তিন হাজার কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কুয়েতের আমির ২০০ কোটি ডলার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন; ১০০ কোটি ডলার ঋণ এবং ১০০ কোটি ডলার বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ হিসেবে। তুরস্ক ঋণ ও বিনিয়োগ হিসেবে ইরাকে খরচ করবে ৫০০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র একটি মার্কিন কোম্পানির মাধ্যমে ৩০০ কোটি ডলার খরচ করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি-রফতানি ব্যাংক বাগদাদের সঙ্গে সম্মতির ভিত্তিতে তিন হাজার কোটি ডলারের এক স্মারকলিপি সই করতে যাচ্ছে। ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ব্যয় করা হবে এই অর্থ। এর মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, পরিবহন ও পণ্যসামগ্রী।’
ইরাকের বিদ্যুৎ সংযোগলাইন সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও তিগ্রস্ত বিভিন্ন মাজার সংস্কারে ইরান অবদান রাখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। ইরাকের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘২০০৩ এর পর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে ইরাকের যে তি হয়েছে; সে ধ্বংসযজ্ঞ পুনর্গঠনের জন্য ১০ বছরের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় ব্যয় হবে ৮৮.২ বিলিয়ন ডলার, ২২ বিলিয়ন ডলার খুব দ্রুত প্রয়োজন।’ আইএসের সঙ্গে সংগ্রাম এবং কয়েক দশকের অবরোধ ও যুদ্ধের পর পুনর্গঠনের জন্য ইরাকের ১০ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদি।
১৯৭৯ সালে সাদ্দাম দায়িত্বভার গ্রহণের পর ইরাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়, সাধারণ মানুষের জীবনমানেরও উন্নতি হয়। আর এখন তো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি অনেক ক্ষেত্রে নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে আছে। মার্কিন আগ্রাসন ও আইএসর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ফলে তেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্কুল, হাসপাতাল, ম্যানুফ্যাকচারিং কাঠামোছাড়াও পানি-স্যানিটেশনের মতো মৌলিক পরিষেবাব্যবস্থা ব্যাপকভাবে তিগ্রস্ত হয়েছে, অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, সম্পদের ব্যাপক য়তি হয়েছে। ২৬ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত-বাস্তুহারা-গৃহহীন অবস্থায় রয়েছে এবং ২৬ হাজার বাড়িঘর গুরুতরভাবে ধ্বংস হয়েছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের হামলাতেই ইরাকের চার হাজার ৫০০ কোটি ডলারের অবকাঠামোর তি হয়েছে। অপূরণীয় তি হয়েছে বহু ঐতিহাসিক স্থাপনার। সহিংসতার কারণে আবাসিক ভবনসহ বহু বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে লাখ লাখ মানুষ বিপুল তির মুখে। যুদ্ধের সময় অনেক তেলত্রে ধ্বংস হয়ে যায়। তেলত্রেগুলোয় আগুন ধরে যাওয়ায় প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার তেল সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।
ইরাকযুদ্ধের ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও ধ্বংসস্তূপে পরিণত দেশটির স্বাস্থ্যসেবা একেবারেই নি¤œমানের। হাসপাতাল আর কিনিকগুলো বোমা হামলায় গুঁড়িয়ে গেছে, ওষুধ ও বিদ্যুতের সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে এবং পালিয়ে যাওয়া হাজার হাজার ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মী দেশে ফেরেনি। গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে ভুল তথ্যের বলি হয়েছে তিন লাখ ইরাকি, ঝরেছে রক্ত। ইরাকের ২০ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্য নিহত হয়েছে। চার হাজার ৪০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে আরো ৩২ হাজার সেনা। ব্রিটেনের প্রায় ১৭৯ সেনা নিহত হন, যাদের পরিবার থেকে ব্লেয়ারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তোলা হয়। আইএসের সাথে লড়াইয়ে মারা গেছে কমপক্ষে ৭ হাজার সাধারণ মানুষ, ২০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী ও ২৩ হাজার আইএস যোদ্ধা; মসুলেই ঘর হারায় ৬০ লাখ মানুষ। পরে অনেকেই ঘরে ফিরলেও পায়নি বিদ্যুৎ, পানি ও ক্ষতিপূরণ। ফলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পরিবেশ পাওয়ার ও জীবিকার নিশ্চয়তা লাভের অপেক্ষায় আছেন অনেকেই। যুদ্ধে সরাসরি মৃত্যুর কয়েক গুণ বেশি মানুষ মারা গেছে যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়। এসব কারণের মাঝে রয়েছে অপুষ্টি, পরিবেশের অবনতি এবং কাঠামোগত অবয়।
১৯৯০-৯১-এর উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরাক অনেক পিছিয়ে পড়েছে, লাখ লাখ নিরীহ মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভেছে, শান্তি ও গৌরব করার মতো সমৃদ্ধি হারিয়েছে। আসলে ইরাকযুদ্ধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের তেলকূপের দখল নেয়া ও সাদ্দাম সরকারকে উৎখাতের মাধ্যমে দেশটিতে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করতে চেয়েছিল বুশ ও ব্লেয়ার প্রশাসন। কিন্তু ইরাক যুদ্ধ আর্থিক, মানবিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কোনো লাভ বয়ে আনেনি। ওই আগ্রাসনের পর থেকে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই তি দাঁড়িয়েছে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাসহ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীরও তি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে স্বাধীনতার বাহক হিসেবে না দেখে শোষক ও নিপীড়ক হিসেবে দেখার কারণে গঠিত হচ্ছে নতুন নতুন বিদ্রোহীর দল, ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে নতুন করে। দেশটিতে ইরানের বহুমুখী প্রভাব বেড়েছে। এ প্রভাব রয়েছে সামরিক বাহিনীতে, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ে।
ইরাকে যুদ্ধ করা কয়েক লাখ মার্কিন অভিজ্ঞ যোদ্ধা এখন প্রতিবন্ধী হিসেবে নিবন্ধিত। প্রায় ১০ শতাংশ অভিজ্ঞ যোদ্ধা পিটিএসডিতে ভুগছে। এ যোদ্ধাদের বেশির ভাগই গৃহহীন ও মাদকাসক্তের তালিকাভুক্ত হয়েছেন অথবা তারা আত্মহত্যা করেছেন। প্রতি রাতে গড়ে ৪ হাজারের বেশি যোদ্ধা গৃহহীন হয়েছে। পিটিএসডি-আক্রান্ত যোদ্ধাদের মধ্যে প্রতিদিন ২২ জন আত্মহত্যা করে। ইরাকযুদ্ধে অংশ নেয়া দ সেনারা নানা বিকলাঙ্গতার কারণে প্রতি বছর যে হারে আত্মহত্যা করছে, তা লড়াইয়ে যুদ্ধের মাঠে মৃত্যুর চেয়েও বেশি। যুদ্ধে অংশ নেয়া সেনাদের চিকিৎসাসেবা ও বিকলাঙ্গ ভাতা পরিশোধ করার জন্য প্রচুর খরচ করতে হচ্ছে। তাই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন ইরাকযুদ্ধের ফল হচ্ছে চূর্ণবিচূর্ণ ইরাক, সাহসী ইরান, একটি দুর্বল-যুদ্ধ পরিশ্রান্ত-ভীত আমেরিকা এবং এমন একটি মধ্যপ্রাচ্য যেখানে বহু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি অনেক রক্তাক্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে আছে। ইরাক আগ্রাসনের ১৬ বছরে এসে শতকরা ৪৮ ভাগ মার্কিনি মনে করছে, সামরিক হস্তপে ভুল ছিল। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে উঠে এসেছে এই তথ্য।
২০০৩ সালের ২০ মার্চ বাগদাদে মিসাইল নিেেপর মধ্যে দিয়ে একনায়কতন্ত্র উচ্ছেদের নামে ‘অপারেশন ইনফিনিট জাস্টিস’ শুরু করেছিল বুশ নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী জোট। প্রথম দিনেই ১ হাজার রকেট হামলায় নিহতের পরিমাণ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ইরাক যুদ্ধের মূল আক্রমণ চলেছিল ১ মে পর্যন্ত। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে, সাদ্দামের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আনুষ্ঠানিকভাবে এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের পর শিয়া-সুন্নির সংঘর্ষ দেখেছে দেশটি। কুর্দি বাহিনীও সশস্ত্র লড়াই শুরু করেছিল। ২০১৪ সালে আইএস বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে তাণ্ডব শুরু করে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তিন বছরের যুদ্ধের পর দখলকৃত অঞ্চল থেকে আইএসকে উৎখাত করে জয় ঘোষণা করে ইরাক। দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল এই গোষ্ঠীর দখলে ছিল। এবার শুধুই ঘুরে দাঁড়ানোর ও এগিয়ে যাওয়ার পালা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫