ঢাকা, সোমবার,২৩ এপ্রিল ২০১৮

পাঠক গ্যালারি

রিমান্ডে আর কত মৃত্যু!

মো: তোফাজ্জল বিন আমীন

০২ এপ্রিল ২০১৮,সোমবার, ১৭:০৭


প্রিন্ট
রিমান্ডে আর কত মৃত্যু!

রিমান্ডে আর কত মৃত্যু!

দুর্ঘটনার মৃত্যুকে যেখানে আমরা মেনে নিতে পারিনি, সেখানে রাষ্ট্রের টর্চার সেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যু হওয়ার ঘটনা কত যে কষ্টের তা ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারে না।

ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সহসভাপতি জাকির হোসেন মিলনকে গ্রেফতার করে শাহবাগ থানার মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ১১ মার্চ রোববার তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়ে ছাত্রদল নেতা মিলন। অতঃপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশ, ১৯৭১ সালের আগে পাকিস্তানি পুলিশ বাহিনী আমাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করেছে। সেসব নির্যাতনের কাহিনী মনে হলে আজো গা শিউরে ওঠে। বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যারা কাজ করছেন, তারা ব্রিটিশও নন; পাকিস্তানিও নন; তারা আমাদের কারো ভাই, কারো ছেলে, কারো না কারো আত্মীয়স্বজন। ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, কারা হেফাজতে প্রাণ হারানো জাকিরের পরিবারে কিংবা স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব কেউ না কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কাজ করেছেন। তাহলে জাকিরদের প্রাণ এভাবে দিতে হবে কেন?

পুলিশের দায়িত্ব জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করা, বিপন্ন করা নয়; কিন্তু পুলিশকে যেন প্রমাণ করতে হচ্ছে তারা সরকারের কত বড় হাতিয়ার। পুলিশ কাউকে হত্যা করে যদি বলে সে ডাকাত বা জঙ্গি, তবে তাতে তার অপরাধ প্রমাণিত হয় না। নিজেরা পুলিশের ছত্রছায়ায় থেকে গুণ্ডামি, মাস্তানি, চাঁদাবাজি করলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না। অথচ বিরোধী মতাবলম্বী নেতাকর্মীদের নিপীড়নের জন্য উৎসাহী ভূমিকা পালন করতে পুলিশ পিছপা হয় না। একটা ঘটনার কথা শুনেছিলাম।

একজন পুলিশ সুপার তার অফিসে বসে একজন দর্শনার্থীকে বলেছেন,‘ বলুন তো,অমুক তারিখে অমুক সময়ে একজন লোক, আপনি যে চেয়ারে বসে আছেন, সেই একই চেয়ারে বসে আমার সাথে কথা বলেছিলেন, এমন সময় এখান থেকে ৭০ মাইল দূরে একটি হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হলো। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য কী ওই লোক হত্যাকারী হিসেবে প্রধান আসামি হতে পারে। জবাবে দর্শনাথী না সূচক জবাব দিলেন; কিন্তু বেচারা পুলিশ সুপার উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন, হ্যাঁ, প্রধান আসামি হতে পারে, যদি মন্ত্রী বা সরকারদলীয় সংসদ সদস্য তাকে প্রধান আসামি করার জন্য নির্দেশ দেন। এ ঘটনাটি কারো কারো কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে! কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, পর্দার অন্তরালে এরকম ঘটনা সমাজ ও রাষ্ট্রে হরহামেশাই ঘটছে।

২০০২ সালের ১৮ এপ্রিলে প্রথম আলোর একটি শিরোনাম ছিল- দুই পুলিশ কর্মকর্তার বর্বরতা- রিমান্ড না পেয়ে টাকার জন্য স্কুলছাত্রকে থানায় বেদম প্রহার। উত্তরা থানার দুই সাব-ইনস্পেক্টরকে এক লাখ টাকা উৎকোচ না দেয়ায় আকরাম খান নামে গ্রেফতারকৃত এক স্কুলছাত্রকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড নামঞ্জুর সত্ত্বেও পুলিশ তাদের হেফাজতে এনে মারধর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছিল।

আওয়ামী সরকারের ’৯৬ সালের শাসনামলে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির মেধাবী ছাত্র রুবেলকে পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। রুবেল হত্যার পর দেশবাসীর বিবেক যেভাবে জাগ্রত হয়ে উঠেছিল, সেভাবে যদি জাকির হত্যার পর প্রতিবাদের ঝড় সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে উঠত তাহলে রিমান্ডের নিষ্ঠুরতা কমত। ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর খুলনার পাইকগাছার জিরবুনিয়া গ্রামে পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে একসাথে ১৩ জন নিহত হয়েছিল। ওই সময়ও পুলিশ দাবি করেছিল, নিহত ব্যক্তিরা সবাই সুন্দরবনের দস্যু; কিন্তু নিহতদের পরিবার দাবি করেছিল, পুলিশ তাদের পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে। গত ১৪ মার্চ বরিশাল মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে সাংবাদিক সুমন হাসান অমানুষিক নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আইন ও সালিস কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চার বছরে ২৬০ জন হেফাজতে মারা গেছেন, ২০১৬ সালে এক বছরেই মারা গেছেন ৭৮ জন। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের জীবন পুলিশি হেফাজতে এভাবে মৃত্যু হওয়া মোটেও সুখকর নয়।

পুলিশ যদি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত না হতো, তাহলে পুলিশ হেফাজতে বিরোধী মতাবলম্বীদের জীবন এভাবে সঙ্কটাপন্ন হতো না। নিকট অতীতে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের রিমান্ড সম্পর্কীয় হাইকোর্টের শুনানিকালে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যে মন্তব্য করেছিলেন, তা আইন আদালতের ইতিহাসে ঘৃণিত মন্তব্য হিসেবে যুগ যুগ ধরে বিবেচিত হয়ে থাকবে। তিনি বলেছিলেন- ‘রিমান্ডে বাবর মারা গেলে আপনারা মামলা কইরেন। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা যখন ক্ষমতার দাপটে মানবতা, শিষ্টাচার ও আইনের শাসনের কথা ভুলে যান, তখন পুলিশের রিমান্ডে শত শত জাকিরের মৃত্যু হলেও ক্ষমতাসীনদের কিছুই যায় আসে না।

১৯৯৩ সালের হাইকোর্টের রিমান্ড সম্পর্কীয় নির্দেশনা ২০০৩ সালে বিচারপতি হামিদুর রহমানের রায় কোনো কিছুই পুলিশ আমলে নেয়নি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) বিল ২০১৩ তে বলা হয়েছে- সরকারের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কারো ওপর নির্যাতন চালানোকে অপরাধ বলে বর্ণনা করে এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির বিধান করা হয়েছে। ২০১৩ সালের আইনে হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন বিষয়ে বলা হয়েছে- সরকারি কোনো কর্মকর্তার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু, অবৈধ আটকাদেশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গ্রেফতারের সময় কারো মৃত্যু, কোনো মামলায় সাক্ষী হোক বা না হোক জিজ্ঞাসাবাদের সময় মৃত্যু। আর নির্যাতন বলতে বোঝানো হয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর হাইকোর্ট সন্দেহবশত কাউকে গ্রেফতার ও তদন্তের নামে রিমান্ডে এনে আসামিকে শারীরিক নির্যাতন করা থেকে নিবৃত্ত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না মর্মে সরকারের ওপর রুল জারি করেছিল। তারপরও থামানো যায়নি রিমান্ডের নিষ্ঠুরতা।

আমেরিকার কয়েকটি রাজ্যে আইন করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, পুলিশ বাহিনী কর্তৃপক্ষ যেসব আসামি বা অভিযুক্তদের রিমান্ডে নেবে, সেখানে অবশ্যই ভিডিও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কারণ, ভিডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মানুষের জীবন বিপন্ন হবে না। রিমান্ডের নামে অত্যাচার কমানোর প্রয়াসে আমেরিকাতে আইন করা হচ্ছে। আমেরিকা পারলে আমরা কেন পারব না?

এই বিষয়টি রাষ্ট্রের ভেবে দেখা প্রয়োজন। আজকে যারা ক্ষমতায় আছেন, ভবিষ্যতে তারা যে বিরোধী দলে যাবে না তার-ই বা গ্যারান্টি কী? সরকারের উচিত রিমান্ডের বিষয়ে একটি স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা; যাতে নিরপরাধ মানুষের জীবন হেফাজতে থাকাকালীন মৃত্যুর কোলে ঢলে না পড়ে। দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা সরকার এ বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫