ঘণ্টা

জোবায়ের রাজু

শৈশবে যে দু’টি জিনিসের সাথে আজো আমার ফেলে আসা অতীত এত সোনালি আর জীবন্ত হয়ে আছে, তা হলো ঘণ্টা। না না, গোয়ালঘরের গরুর গলায় ঝুলে থাকা শব্দের ছন্দ তোলা সেই ঘণ্টা নয়। এই ঘণ্টা স্কুলের ঘণ্টা... ছুটির ঘণ্টা। আজো কানে বাজে সেই ঢং ঢং লহর তোলা প্রাইমারিতে গোলাকৃতি পিতলের দামাল ঘণ্টার অবিনাশী সুররাগিণী।
ছুটির ঘণ্টা শুনতে কান খাড়া হয়ে থাকত। মাঠে ঘাটে রোদের ছায়ায় খেলা করা ডিগবাজি খাওয়া সেই দুরন্ত বালক আমি, যার কাছে বিদ্যার্জন মনে হতো কঠিন কাজ আর ক্লাসটাকে মনে হতো জেলহাজত। মন না চাইলেও আম্মা রোজ এই জেলহাজতে পাঠাতেন। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে জেলহাজতে যেতাম। কিন্তু মন পড়ে রইত বন বাঁদড়ে আর গাছ গাছালির মগ ডালে।
আপন যোগ্যতায় স্যার শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতেন আর আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম কখন লাইব্রেরি থেকে দফতরি ঘণ্টা হাতে বের হয়ে ছুটির ঘণ্টা বাজাবেন।
এক সময় ঠিকই বেজে উঠত কাক্সিক্ষত ছুটির ঘণ্টা। চিনাবেত, ডাস্টার আর চক হাতে স্যার শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করলে আমরা দুষ্ট বালকেরা উল্কার বেগে ক্লাস থেকে বের হয়ে চঞ্চল পায়ে ছুটে যেতাম আপন নিবাসে। আহা, কোথায় হারাল ছুটির ঘণ্টাময় সেই সব বর্ণিল দিন আমার!
আরো একটি ঘণ্টা আমাকে জাদুর মতো কাছে টানত। প্রতিদিন খাড়া দুপুরে নিয়ম করে বেজে উঠত সেই অপেক্ষমাণ ঘণ্টা। সেই ঘণ্টা বাজত আইসক্রিমওয়ালার হাতে। কাঁধে আইসক্রিমের পেটি ঝুলিয়ে তিনি আসতেন ভ্যাপসা গরম দুপুরে। হাতের সেই জাদুকরি ঘণ্টা বাজিয়ে তিনি বালক-বালিকাদের জানিয়ে দিতেন ‘আমি এসেছি’। ব্যস্, নাওয়া খাওয়া ভুলে আমরা দু-চার টাকা হাতে নিয়ে ভৌঁ দৌড় দিতাম তার সান্নিধ্যে। মালাই আর রঙ-বেরঙের আইসক্রিমে মিশে যেত আমাদের বা আমার উদাসী সব দুপুরগুলো।
রোজ দুপুরে আইসক্রিমওয়ালার সেই উদাস ঘণ্টা শ্রবণের লোভে কতদিন যে হয়েছি লোভাতুর। নির্দিষ্ট সময়ে সেই আকুল করা ঘণ্টা বাজলেই তার সামনে ছুটে যাওয়া আজো আমার শৈশবে সাক্ষী হয়ে আছে। তাইতো আজো ভুলিনি সেই প্রিয় নাম না জানা আইসক্রিমওয়ালাকে।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে যেন আজো কানে বাজে সেই ঘণ্টা। জানি না কোথায় আছে সেই গরম তপ্ত দুপুরের আইসক্রিম বিক্রেতা। সেকি এখনো অন্য কোনো অচিন পল্লীতে সেই আগের মতো ঘণ্টা বাজায় উতালা দুপুরে? জানি না যন্ত্র যুগের এই সময়ে আজকের কোনো বালক-বালিকাকে সেই সুমধুর ঘণ্টার ব্যাকুল শব্দ পাগল করে কি না!
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.