২০০ বছর পর নাম পেল সেই ‘অচিন বৃক্ষ’
২০০ বছর পর নাম পেল সেই ‘অচিন বৃক্ষ’

২০০ বছর পর নাম পেল সেই ‘অচিন বৃক্ষ’

আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ)

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লাউতা গ্রামের প্রায় ২ শ' বছর বয়সী এ বৃক্ষটির নাম জানত না এলাকার মানুষ। নাম না জানার কারণে গাছটি ‘অচিন বৃক্ষ’ নামেই পরিচিত এলাকার মানুষের কাছে। গাছটি ঘিরে স্থানীয়দের মাঝেও রয়েছে নানা কৌতূহল, রয়েছে নানা কথা-উপকথা।

অবশেষে সেই বিরল প্রজাতির অচিন বৃক্ষটি অবশেষে নাম পেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়াম ও বাংলাদেশ প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনোমিস্ট সমিতির যৌথ গবেষণায় ২০০ বছর বয়সী বৃক্ষটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনার পর ‘কুটি কদম’ নাম দিয়েছে।

নাম না জানা এই অচিন বৃক্ষ নিয়ে সম্প্রতি দৈনিক নয়া দিগন্তে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংবাদটি দৃষ্টিগোচড় হয় বাংলাদেশ প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনোমিস্ট সমিতির কর্মকর্তাদের।

শনিবার দিনভর একটি গবেষণা দল গাছটির পর্যবেক্ষণ করেন। পর্যবেক্ষণ দলে ছিলেন, বাংলাদেশ প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনোমিস্ট সমিতির সভাপতি ড. এম মতিয়ুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মোঃ আবুল হাসান, ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. মমতাজ বেগম, ড. মোঃ খায়রুল আলম, অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামাল পাশা, ড. মাহবুবা সুলতানা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ ছায়েদুর রহমান, ফিল্ডম্যান ওয়াজেদ আলী।

সার্বিক সহযোগিতা করেন হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আরেফিন রেজওয়ান। এসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবুল বাশার সবুজ, দৈনিক নয়া দিগন্ত প্রতিনিধি মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, সাংবাদিক শফি আলম প্রমুখ।

যারা বৃক্ষটির নাম দিলেন

বাংলাদেশ প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনোমিস্ট সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, এই উদ্ভিদটি Rubiaceae পরিবারের Mitragyna Diversifolia প্রজাতির একটি বনজ উদ্ভিদ। সচরাচর এ বৃক্ষ বাংলাদেশে চোখে পরে না। ভাওয়াল, গজনী ফরেস্ট, গড় মধুপুর, চট্টগ্রাম ও সিলেট পাহাড়ি এলাকায় এ বৃক্ষ রয়েছে। তবে সংখ্যায় তা খুবই নগণ্য।

পদ্মা নদীর তীরে ঐতিহ্যবাহী হরিরামপুর উপজেলার একটি জনবহুল ইউনিয়ন চালা। এ ইউনিয়নের লাউতা নামক স্থানে রাস্তায় পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা অচিন বৃক্ষটি এখন কালের সাক্ষী। ২০০ বছরের পুরনো গাছটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছে দর্শনার্থীরা। অন্য যেকোনো গাছের সাথে কোনো ধরনের মিল না থাকায় মানিকগঞ্জসহ সারা দেশে মানুষের কাছে বৃক্ষটি অচিন গাছ নামে পরিচিতি লাভ করে। গাছটির নামকরণের ব্যাপারে স্থানীয়দের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এ নামেই এখন প্রসিদ্ধ।

গাছটির জন্য দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে মানিকগঞ্জের জনপদ। প্রাচীনতম এ গাছটি একনজর দেখার জন্য কৌতূহল নিয়ে উৎসুক দর্শনার্থীরা ছুটে আসছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে।

জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুরের চালা ইউনিয়নের লাউতা গ্রামের এখলাছ উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি তৎকালীন ভারতের কোচার অঞ্চল থেকে একটি গাছ এনে জমিতে রোপণ করেছিলেন। গাছটি ধীরে ধীরে বড় হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে আজ বিশালাকার ধারণ করেছে। ভিনদেশী গাছ হওয়ায় এবং দেশীয় প্রজাতির কোনো গাছের সাথে মিল না থাকায় স্থানীয়রা গাছটির নাম দেন অচিন বৃক্ষ। পরে এ নামেই পরিচিতি লাভ করে।

লাউতা গ্রামের ধিরাজ খান নামের ৮০ বছর বয়সের এক ব্যক্তি জানান, ছোটবেলা থেকে এ গাছটি এমনই দেখছেন তিনি। এমনকি তার বাবা তোফাউদ্দিন বেপারির কাছে এ গাছের বয়স সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছেন।

হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবুল বাশার সবুজ জানান, গাছটির পাতা অনেকটা তুলসীপাতার মতো। এ গাছে ফুল হয় এবং ফুল থেকে ছোট একধরনের বীজ হয়। বীজ পড়ে গাছটির চারপাশে আরো কয়েকটি গাছের চারা হয়েছে। বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলে এ গাছের মতো কোনো গাছ তাদের নজরে পড়েনি। গাছের অত্যধিক বয়স হওয়ায় উপরিভাগে ডালপালা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তবে গাছের নিচের অংশে এখনো রয়েছে সতেজ ও ডালপালায় ভরপুর।

গবেষকরা বলেন, বৃক্ষটি ঘিরে ওই এলাকায় পর্যটনশিল্প গড়ে উঠতে পারে। গাছটি যেন বেঁচে থাকে আরো বহু দিন, তার সঠিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা জরুরি। এ বিষয়ে আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব। আর সেই সাথে গাছটির পাশে যে রাস্তা রয়েছে তা প্রশস্ত করে ও বৃক্ষস্থলের আশপাশে মাটি ভরাট করে পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা যায় এখানে। এ দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসীও।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.