ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

দেশ মহাদেশ

বিশ্বপরাশক্তির বাণিজ্য ও কূটনৈতিক যুদ্ধ

রাশিদুল ইসলাম

২৯ মার্চ ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০০:০০ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০৬:১৭


প্রিন্ট
যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের ওপর কর আরোপের ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের ওপর কর আরোপের ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প

চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ আর রাশিয়ার সাথে কূটনৈতিক যুদ্ধে নেমেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়াকে কোণঠাসা করতে অবশ্য ইউরোপীয় দেশগুলোও যোগ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের ওপর ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কর আরোপের পর চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান ইয়াই গ্যাং বলেছেন, ওয়াশিংটন তার দেশের অর্থনীতিতে যে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা জাগিয়ে তুলে বাণিজ্যযুদ্ধের চেষ্টা করছে, তাতে তেমন কোনো আর্থিক ঝুঁকি নেই। ইয়াই বলেছেন, তার দেশের ইন্স্যুরেন্স, আর্থিক ও পুঁজিবাজার খাত এ ধরনের যুদ্ধে যে বাজারের ঊর্ধ্বগতি সৃষ্টি হয়, তা সামাল দিতে পুরোপুরি সক্ষম। বেইজিংয়ের বাজারে মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে ট্রাম্পের ওই ঘোষণার পর হংকং, সাংহাই ও শেনঝেনের শেয়ারবাজারে ধাক্কা লাগে এবং সূচকের পতন ঘটে। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলায় নিজেদের যথেষ্ট পারদর্শী হিসেবে অভিহিত করে ইয়াই বলেন, চীনা বাণিজ্যের পাটাতন বেশ মজবুত এবং তা বাইরে থেকে যেকোনো ধাক্কা সামাল দেয়ার ক্ষমতা রাখে।
চীনের বিরুদ্ধে এ ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদৌ কোনো স্বার্থ রয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে খোদ মার্কিন বিশ্লেষকদের। চীনে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আমদানি ও রফতানি শুল্ক বাড়ালে বরং তা আরো বড় ধরনের ধকল বয়ে আনবে মার্কিন অর্থনীতির জন্য। চীনে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানিকৃত ১২৮টি পণ্যের ওপর যেমনÑ সয়াবিন, মদ, ফল, স্টিল পাইপ ও ইথানলসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের ওপর পাল্টা বাড়তি শুল্ক আরোপ হলে তা নেতিবাচক হয়ে দেখা দেবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। এ ছাড়া বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার প্রতি মার্কিন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের চীনা পণ্যে বাড়তি কর আরোপে। মার্কিন বিশ্লেষক টরি হুইটিং প্রশ্ন তুলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তার লাভ-লোকসান নিয়ে সঠিক বিশ্লেষণ হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আদৌ ভাবেননি। মার্কিন ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ফোরাম ইতোমধ্যে এ সিদ্ধান্তে ক্ষতির আশঙ্কা করেছে। চীনে মার্কিন রফতানি কমলে ইলেকট্রনিক, অ্যাপারেল ও কনজ্যুমার পণ্যে ধকল আসতে বাধ্য। বাণিজ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেরিটেজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. ডেভিড ক্রিউটজার বলেন, ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও অর্থনীতির জন্য তা দুর্বল বার্তা এনে দেবে। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনীতিতে যে স্বাধীনতা বজায় আছে, তাকেও ক্ষুণœ করবে এ সিদ্ধান্ত। চীনা পণ্যে অধিক কর আরোপের মতো রক্ষণশীল নীতি মার্কিন বাজারে নতুন ধ্যানধারণা ও পণ্যের সৃষ্টিতে যে উন্মাদনা রয়েছে, তা প্রবর্তনের ধারণার গতিকে শ্লথ করে দেবে। ফলে উচ্চমাত্রার সামাজিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। এর বিপরীতে চীনা অর্থনীতিতে সরকারের অনধিকার চর্চার অনুপস্থিতি এর গতিকে আরো ত্বরান্বিত করবে। বিশ্ববাণিজ্য সূচকে ১৮০টি দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র ১৮তম হলেও চীনের অবস্থান ১১০তম স্থানে। কিন্তু ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অন্য দিকে রাশিয়ার শতাধিক কূটনীতিককে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরেক যুদ্ধ শুরু করলেন। ব্রিটেনে সাবেক রুশ ‘গুপ্তচর’ সের্গেই স্ক্রিপালকে বিষ প্রয়োগে হত্যাচেষ্টার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সাথে এ যুদ্ধে যোগ দিয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ব্রিটেন একাই ২৩ রুশ কূটনীতিককে দেশছাড়া করেছে। এ যুদ্ধে শামিল হয়েছে ন্যাটোভুক্ত জার্মানি, ফ্রান্স, এস্তোনিয়া ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ। সিয়াটলে রুশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিগত তিন দশকের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় বহিষ্কার। এর আগে রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন অবরোধ আরোপ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এসব উদ্যোগকে মার্কিন কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত হিসেবে বিবেচনা করছেন এবং রাশিয়ার বক্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু সাংবাদিকেরা ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বারবার জিজ্ঞেস করেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে এ ধরনের উদ্যোগ ‘অ্যাক্ট অব ওয়্যার’ কি না এবং এর জবাবে হোয়াইট হাউজ বলছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এ বিষয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করছেন। ব্রিটেনকে নিকটতম সহযোগী বলেও মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ দিকে রাশিয়ায় নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার টনি ব্রেনটন ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেছেন, কয়েক মাসের মধ্যে রাশিয়ার সাথে তার দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে আসবে এবং পশ্চিমের সাথে রাশিয়ার দ্বন্দ্ব দূর হবে। এ জন্য প্রয়োজন শীর্ষপর্যায়ের আলোচনা। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণেই রাশিয়ার সাহায্য ব্রিটেনের জন্য প্রয়োজন। রাশিয়ার ওপর ব্রিটিশ অবরোধের পরও এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ে এখনি কোনো যোগাযোগ করা হচ্ছে না। ইরানি জলসীমায় ঢুকে পড়ার পর আটক ১৫ জন ব্রিটিশ নৌ-সেনাকে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে তেহরানের ওপর রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারকেও তিনি এ প্রসঙ্গে এক উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করেন। এ ছাড়া রাশিয়ার সাথে ক্রিমিয়া পুনর্গঠনের পর তার দেশকে পশ্চিমা দেশগুলো যে একঘরে করার চেষ্টা করছে সাম্প্রতিক রুশ কূটনৈতিক বহিষ্কারের বিষয়টি তারও একটি অংশ। তবে বিশ্বকে তার আপন গতিতেই চলতে হবে এবং সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে বলে প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করে এ ব্রিটিশ কূটনীতিক বলেন, বাণিজ্যের জন্য গড়ে ওঠা সেতুবন্ধন কোনো দেশের জন্যই বিনষ্ট করা ঠিক হবে না। তিনি এও বলেন, রুশরা জানে যেকোনো যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে তাদের হারতে হবে, কিন্তু তাদের চূড়ান্ত টেক্কা দেয়ার ক্ষমতা হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার। তার মানে এই নয় যে, রুশরা তা ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে, তবে তা যাতে না করে সে জন্য বিশ্বকে সজাগ থাকা জরুরি।
মস্কো ইতোমধ্যে ব্রিটেনের সালিসবারিতে সাবেক রুশ গুপ্তচরকে রাসায়নিক বিষ প্রয়োগে হত্যা প্রচেষ্টার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ জোর দিয়ে অস্বীকার করেছে এবং বারবার ওই বিষের নমুনা সরবরাহ করার কথা বলছে; যাতে খতিয়ে দেখা সম্ভব হয় আসলে এ ধরনের হত্যাচেষ্টার সাথে কারা জড়িত। কয়েক দিন আগেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সমালোচনা শুনতে হয়েছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে অভিনন্দন জানানোর জন্য। উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন থেকে বিরত থাকতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়ার কথা বলে আসছিল আন্তর্জাতিক বিশ্ব। তাহলে চীনের সাথে বাণিজ্য এবং রাশিয়ার সাথে কূটনৈতিক যুদ্ধে কেন হুমড়ি খেয়ে পড়তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বপরাশক্তির সাথে বাইরে যতই বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়ন হোক, এর আড়ালে এক ধরনের বিষাক্ত সম্পর্ক সামরিক দ্বন্দ্বকে উসকে দিচ্ছে। সেন্টার ফর দি ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি সিমেস অবশ্য বলছেন, পরাশক্তিগুলোর মাঝে নতুন করে কোনো ঠাণ্ডা যুদ্ধ শুরু হয়নি। তবে এটা ঠিক যে, নতুন ধরনের ঠাণ্ডা যুদ্ধের আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কারণ, পরাশক্তিগুলো খুবই পৃথক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে উঠছে। কোনো আন্তর্জাতিক আকর্ষণীয় মতাদর্শের উপস্থিতি নেই, যা দেশগুলোকে যুদ্ধ ও উত্তেজনা থেকে বিরত রাখতে সহায়তা করবে। তৃতীয়ত, হ্যাঁ, অবশ্যই রাশিয়া ঠাণ্ডা যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি সামরিক উপস্থিতির জানান দিচ্ছে, যা অন্যান্য পরাশক্তির মাঝেও উত্তেজনা বৃদ্ধি করছে।
দেখতে হবে এর পাশাপাশি আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়াসহ আফ্রিকার দেশগুলোতে সন্ত্রাস দমনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ব্যর্থতাকেও। এর আড়ালে ফিলিস্তিন আরো সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। তবে ক্রেমলিনকে ওয়াশিংটন যদি কম বিবেচনায় রাখে, তাহলে এ দু’টি পারমাণবিক শক্তিশালী দেশের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব বৃদ্ধিকে ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সিরিয়ায় রুশ উপস্থিতি বা ইসরাইলের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে সৌদি জোটের মার খাওয়ার মধ্যে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের শাসন টিকে থাকাও দ্বন্দ্বের উপকরণ মাত্র।
সেন্টার পর ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের আরেক বিশ্লেষক বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাওয়া এখনো অবিশ্বাস্যভাবে উচ্চমাত্রার ঝুঁকি বলেই মনে হয়। সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসিসের গবেষক বিজ্ঞানী মিখাইল কফম্যান স্বীকার করেন, পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার মতো সত্যিকারের ঝুঁকিও রয়েছে। তবে তা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঘটবে না। সঙ্কট এবং তা নিরসনে কোনো কিছু করতে না পারলে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে পরাশক্তিগুলো। আরেক বিশ্লেষক পল স্যান্ডার্সের ধারণা, সামরিক দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হওয়া পরাশক্তিগুলোর মধ্যে এখন অনিবার্য মনে না হলেও তা অগ্রহণযোগ্য বটে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি রাশিয়ার ওপর চড়াও হয়েই বসে, তাহলে ভøাদিমির পুতিন আছেন শক্ত অবস্থানে। নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তার আগে সামরিক শক্তিতে ঢের অগ্রগামী হওয়ার অনেক তথ্যের জানান তিনি দিয়েছেন। নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়, সে দিক থেকে নড়বড়ে ট্রাম্প প্রশাসনে ধারাবাহিক পদত্যাগ কিংবা পর্নো তারকাদের মামলার হুমকি একেবারেই বেমানান। একই সাথে চীনে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন গিয়ে পৌঁছেছেন, এমন খবর চাউর হওয়ার পর পরাশক্তিগুলোর মাঝে টানাপড়েনের আরো অনেক কিছু দেখার বাকি আছে বৈকি!

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫