ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৬ এপ্রিল ২০১৮

ইতিহাস-ঐতিহ্য

ছবি কথা বলে

খসরুজ্জামান চৌধুরী

২৫ মার্চ ২০১৮,রবিবার, ১৬:৩৩ | আপডেট: ২৫ মার্চ ২০১৮,রবিবার, ১৬:৪০


প্রিন্ট
ছবি কথা বলে

ছবি কথা বলে

আমার আজো ভাবতে কষ্ট হয় যে অকুতোভয়, স্মিত হাসি, ধৈর্য্যশীল ও বিচক্ষণ এই ব্যক্তিটি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ শাসন আমলে মন্ত্রীত্ব দূরের কথা, একজন উপমন্ত্রীর মর্যাদাও পাননি। সত্যিই, কী বিচিত্র আমরা!

বাহাত্তর সালের জানুয়ারি মাস। মাত্র দু’সপ্তাহ আগে এসে ময়মনসিংহ জেলার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত হলেও সব কিছু এখনো আয়ত্তে আসেনি। চার দিকে আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি। বহু দল উপদল। সদ্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতার উৎসবের জের এখনো চলছে।

এই কিছুক্ষণ আগেই তুমুল কাণ্ড হয়ে গেল। এক মুক্তিযোদ্ধার সাথে অফিস চেম্বারে প্রায় হাতাহাতির উপক্রম। আমার কাছে এসেছিলেন অনুমতি নিতে, ওই রাজাকার সরকারি কর্মকর্তাকে শেষ করে দেবেন। আমি আইনের ধারক ও বাহক, আইন বজায় রাখাই আমার কাজ। এই নিয়েই তর্ক ও শেষপর্যায়ে হাতাহাতি জোর করে পুরো ম্যাগজিন ভর্তি ওর স্টেনগানটি ছিনিয়ে নিয়ে আমাকে জানিয়ে গিয়ে মানুষ খুন করবে, এটা আমি হতে দিতে পারি না।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। অফিসে বসে অন্য কয়েকজনের সাথে এই বিষয় কথা হচ্ছিল। এমন সময় পিওন এসে স্লিপটা দিয়ে গেল। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা নাম : হাবিবুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা। একটু সময় লাগলেও চিনতে কষ্ট হলো না।

ভেতরে ডাকলাম তাকে। ছোটখাটো মানুষ। পুরো ৯ মাস গ্রামগঞ্জে ঘুরে, সীমান্ত এলাকায় সংগ্রাম চালিয়ে ক্লান্ত। দেখেই চিনতে পারলাম।

হাবিবুর রহমান বেশি সময় নিলেন না। কিছু দিন আগে ২৯ ডিসেম্বর স্থানীয় সার্কিট হাউজের সামনে একটা ছবি তুলেছিলেন তার ক্যামেরায়। ওই ছবিটা আমাকে দিতে এসেছেন অনুরোধ সত্ত্বেও চা খেলেন না। ছবিটা দিয়েই চলে গেলেন। তারপর বহু বছর ছবিটার কথা মনেই ছিল না। সেদিনকে যেন স্বাধনীতা পরবর্তী ময়মনসিংহ-এর উপর গল্প শুনতে চাচ্ছিলেন। তখনই মনে পড়ে গেল ছবিটার কথা। এমনিতে কয়েকজন মানুষ। ওই সময়কার বিভিন্ন ভূমিকায় কাজ বা অভিনয় করা কয়েকজন মানুষ। এতদিন পরেও কিন্তু আমার স্মৃতিতে তারা বিরাজমান। ছবিটি দেখলে ওই সময়ে হারিয়ে যাই আমি। স্মৃতির রোমন্থন আমাকে তন্ময় করে রাখে। সত্যি স্মৃতি বড় জ্বালাময়।

আমার সামনেই ছবিটা। ছবি কথা বলছে, ওই সময়ের কথা, আমাদের স্বাধীনতার কথা। মনে হয় বহু মানুষের হয়ে ছবিতে আমরা আছি আমি ছাড়া দু’জন মানুষ আমার খুবই চেনা।
হাবিবুর রহমানের কথাতো বলেছিই। আর একজন প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান। ওই নামেই সবাই তাকে চিনত। একাত্তরে মার্চে বিদ্রোহ ঘোষণার পর আমরা একত্রে কাজ করেছি বহু ক্ষেত্রে। ওই সময়টাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ভদ্রলোক। তার ছোটখাটো অবয়ব লম্বা দাড়ি দেখে মনেই হবে না এতে কাজ করতে পারেন। মার্চের শেষ দিকে ময়মনসিংহ এলাকায় আগত বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ও জোয়ানদের দেখাশোনা করেছেন। এত মানুষকে কোথায় পাবে, কিভাবে পাবে- প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান সাহেবকে বলে দিতে হয়নি। ঠিকই সব ম্যানেজ করেছেন। তাকে এই কাজে সাহায্য করেছেন তখনকার গণপরিষদ সদস্য জনাব আবুল মনসুর আহমেদ। চশমাপরা সদা প্রফুল্ল এই মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিও ভুলে যাওয়ার নয়। মতিউর রহমান ও আবুল মনসুর আহমেদ সাহেব আজ কিভাবে কোথায় আছেন জানি না- তবে আমার স্মৃতিতে তারা ভাস্বর হয়ে আছেন।

চবিটির মূল চরিত্র রফিকউদ্দিন ভূঞা। তদানীন্তন ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। সবচেয়ে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার স্বাধনীতা যুদ্ধে, স্বাধীনতার আগে পরে। জেলা প্রশাসক হিসেবে তার সাথে কাজ করেছি। সব সময় সহায়তার হাত নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। অসীম ধৈর্য ছিল তার। কোনো কিছুতেই সাহস ও ধৈর্য হারাতেন না।

সে রাতের কথা আমার এখনো মনে আছে। বাহাত্তরের মার্চ মাসের বারো কি তেরো তারিখ। নদীর ওপারে শম্ভুগঞ্জ পাটের কলে বিরাট আকারে শ্রমিক সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। সে চার দিকে আগ্নেয়াস্ত্রের তখনো ছড়াছড়ি। তার উপর সংঘর্ষটা দলীয় উপদলীয় সঙ্ঘাতেরও কিছুটা প্রতিফলন। রাত ১২টায় খবর পাওয়ার পর থেকে অস্থিরভাবে পায়চারী করছি। কি করব ভেবে পাচ্ছি না। সহিংস হানাহানিতে রক্তপাত হবে, এটা আমি কি করে দেখি। কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু এই অবস্থায় পুলিশ পাঠানো যুক্তিযুক্ত নয়।

রফিকউদ্দিন ভূঞা সাহেবকে ফোন করলাম। তার গাড়ি নেই। আমার বাংলোতে আসার জন্য গাড়ি চাইলেন। তারপর এলেন। ওই এত রাতে মাত্র কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে যেতে চাইলেন। আমি সাথে যেতে চাইলে স্মিত হেসে বললেন : এটা রাজনৈতিক গণ্ডগোল মনে হচ্ছে। আপনি অযথা জড়াবেন না।
ওই রাতে তিনি ওভাবে না গেলে ঘটনা হয়তো বহুদূর গড়াত। হয়তো বেশ কয়েকটা তাজা লাশের রক্তে নদীর পানিটা রঞ্জিত হতো।

এরপরে তার সাথে আরো বিচিত্র পরিবেশে কাজ করেছি। সবসময় দেখেছি প্রশাসনের সম্মান করেছেন- সহায়তা করেছেন। কিন্তু একই সময় তার রাজনৈতিক সত্তা ও ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে চলেছেন, নীতি বিসর্জন দেননি।

আমার আজো ভাবতে কষ্ট হয় যে অকুতোভয়, স্মিত হাসি, ধৈর্য্যশীল ও বিচক্ষণ এই ব্যক্তিটি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ শাসন আমলে মন্ত্রীত্ব দূরের কথা, একজন উপমন্ত্রীর মর্যাদাও পাননি। সত্যিই, কি বিচিত্র আমরা!

ছবির আর দু’জন চরিত্র ব্রিগেডিয়ার সানথ সিং ও কর্নেল রাও। এরা ওই এলাকার মুক্তিবাহিনীর সাথে জড়িত ছিলেন। কর্নেল রাও সম্পর্কে বিশেষ জানি না। তবে ব্রিগেডিয়ার সানথ সিং আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধারা তাকে আদর করে ‘বাবাজী’ ডাকতে শুনেছি। কিছুটা বয়স্ক ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই শিখ ব্রিগেডিয়ারকে মুক্তিযোদ্ধারা ও ওই অঞ্চলের মানুষেরা যথেষ্ট শ্রদ্ধা সমীহ করত। আমি ওই সেক্টরে না থাকায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার ভূমিকা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের চোখ দেখে বুঝেছি তিনি তাদের প্রিয় ছিলেন। চোখ ফাঁকি দেয় না- চোখ মনের কথা বলে। ওদের চোখ বলেছে ব্রিগেডিয়ার সানথ সিং ওদের যুদ্ধে সহায়তা করেছেন এবং সম্ভবত অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালের এই ঐতিহাসিক ছবিটা এখনো সযত্নে রেখে দিয়েছি। কিছুটা আবেগে, কিছুটা খেয়ালের বশে। ছবিটার জীববিজ্ঞান মতে কোনো প্রাণ নেই কিন্তু আমার তবু মনে হয় আছে। প্রাণ আছে বলেই হয়তো এই ছবি আজও কথা বলে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫