ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৬ এপ্রিল ২০১৮

ইতিহাস-ঐতিহ্য

চাই জাতীয় ঐকমত্য

ড. এম এ সবুর

২৫ মার্চ ২০১৮,রবিবার, ১৬:২৮


প্রিন্ট
চাই জাতীয় ঐকমত্য

চাই জাতীয় ঐকমত্য

বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্চ এক অনন্য মাস। ১৯৭১ সালের এ মাসেই তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, বঞ্চনা, শোষণ ও আক্রমণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ-সংগ্রাম তথা মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। আর এ দেশের সর্বস্তরের মুক্তিকামী মানুষেরা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধিকার অর্জনের শপথ নিয়েছিলেন। ফলে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। ’৭১-এর মার্চের প্রতিটি দিন ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা-দুর্দশা, সংগ্রাম-সংঘাতের। তাই মার্চ মাস জাতির সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত, গৌরবোজ্জ্বল, আনন্দময় এবং বেদনাবিধুর।

১৯৭১ এর মার্চে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হলেও এর প্রেক্ষাপট বেশ দীর্ঘ সময়ের। এ দেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রাম দীর্ঘদিনের। ১৭৫৭ সালে পলাশীর ষড়যন্ত্রে হৃত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য তারা নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ব্রিটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে শহীদ তিতুমীর-সূর্যসেনসহ অনেকেই সংগ্রাম-আত্মত্যাগ করেছেন। তাদের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এবং মুক্তির অন্বেষায় ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শোষণের নাগপাশ থেকে পূর্ববাংলা স্বাধীন হয়ে পূর্বপাকিস্তান নাম ধারণ করে। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অপরিণামদর্শী রাজনীতি, বৈষম্য ও শোষণনীতি পূর্ব পাকিন্তান তথা বাঙালিদের হতাশ ও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলাভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আন্দোলন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। সর্বোপরি ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতার মোহে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে। অধিকন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।

যার ফলে ২৬ মার্চে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার ডাক আসে। আর মুক্তির আশায় এ দেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনতা সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে গ্রামের কৃষক, শহুরে শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবসায়ী-চাকরিজীবীসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। শিল্পী-সাহিত্যিক, প্রবাসী-সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে। সবার ভূমিকা সমান না হলেও তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও ত্যাগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে।

’৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জনই একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। লক্ষ্য ছিল অনেক বিস্তৃত, সেটা ছিল জনগণের মুক্তি অর্জন। মুক্তি অনেক গভীর এবং ব্যাপক ব্যাপার। স্বাধীনতা বলতে বোঝায় রাজনৈতিক স্বাধিকার। আর মুক্তি বলতে বোঝায় সার্বিক উন্নতি, যেমন রাজনৈতিক স্বাধিকার তেমনি বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার। তবে মুক্তি ও স্বাধীনতা পারস্পরিক সম্পর্কিত এবং মুক্তিই অগ্রগণ্য। এজন্য ’৭১-এর ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে উচ্চারিত হয়েছিল ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমাদের অবশ্যই রাজনৈতিক স্বাধিকার অর্জিত হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক তথা সার্বিক মুক্তি এখনও অর্জিত হয়নি। উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমেনি। জনগণ সংগ্রাম করেছে, কিন্তু মুক্তি আজও পায়নি।

আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ইতোমধ্যেই ছেচল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময় আমাদের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন আছে। এতে দেখা যাবে আগ্রাসন, দুর্নীতি-নেতৃত্বের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন রকমের সমস্যার কারণে বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত উন্নতি না হলেও উন্নয়নের পথেই চলছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও সত্তর দশকে দেশটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। ’৭৪-এ দুর্ভিক্ষের করুণ চিত্র আমাদের অনেকেরই দেখা। কিন্তু চার দশক পর বর্তমানের বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয় না, খাদ্যাভাবে মানুষও মারা যায় না। ‘মঙ্গা’ শব্দটিও দেশ থেকে প্রায় নির্বাসিত। অধিকন্তু বাংলাদেশ এখন সত্তর দশকের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অভিযোগ থেকেও মুক্ত। আমাদের তৈরী পোশাক বিশ্ববাজারে অনন্য। আমাদের দেশের অর্ধকোটিরও বেশি মানুষ পোশাক তৈরি শিল্পে নিয়োজিত।

দেশের অর্থনীতির নবযাত্রায় পোশাক তৈরি শিল্পের ভূমিকা অগ্রগণ্য। যাদের পরিশ্রমে আয় হয় দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় তিন চতুর্থাংশ। এ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিকি উন্নয়নের বড় শক্তি প্রবাসী জনশক্তি। আগে জনসংখ্যাকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে জনশক্তি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল করতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স অনন্য ভূমিকা পালন করছে। স্বাধীনতা-পরবর্তীতে আমাদের জাতীয় জীবনে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। স্বাধীনতার অব্যাহতি পরেই যখন বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১০০ ডলারের নিচে বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় দ্ইু হাজার মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে ছয় শতাংশ ছাড়িয়েছে। অথচ সত্তরের দশকে এ হার ছিল মাত্র এক শতাংশের কাছে। অর্থনৈতিক এ প্রবৃদ্ধি দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হয়েছে। যাতে বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়নের (এমডিজি) লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথেই এগিয়ে চলছে। অধিকন্তু অতিসম্প্রতি (১৭ মার্চ-২০১৮) উন্নয়শীল দেশের কাতারে শামিল হয়েছে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও শিক্ষার মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। এ সময় স্বাস্থ্য খাতেও বাংলাদেশ অনেক উন্নতি লাভ করেছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। পোলিও রোগ দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। কলেরাসহ বিভিন্ন মহামারী রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে আর শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার অনেক কমেছে। অন্য দিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় অনেক কম হলেও তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ বেশ অগ্রসর হয়েছে। এ দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন আছে। সরকারি উদ্যোগে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া হয়েছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তীতে সড়ক ও পরিবহন যোগাযোগেও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। পাড়াগাঁয়ের অধিকাংশ রাস্তা পাকা হয়েছে। যমুনা সেতু, লালন শাহ সেতু, মেঘনা সেতু, ভৈরব সেতুসহ ছোট-বড় অসংখ্য সেতু দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থাকে উন্নত করেছে। রাজধানীতে অনেক উড়াল সেতু নির্মিত হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজও এগিয়েছে। আর দীর্ঘ প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর অগ্রগতিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণসহ সমগ্র জাতি আশান্বিত হয়েছে। আমাদের তরুণরা ইতোমধ্যে ক্রিকেটে বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। তারা ক্রিকেটবিশ্বের বিভিন্ন রেকর্ড ভাঙছে ও গড়ছে। এমনকি বিশ্বসেরা ক্রিকেট খেলোয়াড় তালিকায় বাংলাদেশী খেলোয়াড়ের নাম শীর্ষে থাকছে। খেলাধুলায় ছেলেদের সাথে মেয়েরাও এগিয়ে চলছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী চার দশকে প্রচার ও গণমাধ্যমের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। স্বাধীনতাকালে শহরের মানুষ ছাড়া গ্রামের মানুষ পত্রিকা দেখত না বললেই চলে। বর্তমানে শতাধিক দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা, বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, এফএম ও কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে দেশ-বিদেশের সব খবর মানুষের হাতের নাগালে। এসব কারণে দেশের মানুষ অনেক সজাগ-সচেতন হয়েছে।

উল্লিখিত প্রাপ্তির সাথে অপ্রাপ্তিরও দীর্ঘ তালিকা আছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমলেও ধনবৈষম্য ব্যাপক হারে বেড়েছে। আকাশচুম্বী ভবনের পাশাপাশি বস্তির সংখ্যাও বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা অপূর্ণই থাকছে। বেকারত্ব, যানজট, পরিবেশ দূষণ, নদী-খাল দখলের প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজমি কমছে। সর্বস্তরের দুর্নীতি দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম-খুন, অপহরণ-ধর্ষণ, বিরুদ্ধ মত দমন আমাদের স্বাধীনতাকে বিপর্যস্ত করছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য গণতন্ত্র স্বাধীনতার চার দশক পরেও অস্ফুটই রয়েছে। সামরিক শাসনের দীর্ঘ পরিক্রমা, স্বৈরতান্ত্রিকতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের পথ বন্ধুর করেছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অনাস্থা-প্রতিহিংসায় বাংলাদেশের রাজনীতি অসহিষ্ণু ও কলুষিত হয়েছে। আর রাজনৈতিক দলগুলো জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় বেড়েই চলছে। এসবের সাথে জঙ্গিবাদের বৈশ্বিক সমস্যা এবং আধিপত্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি আমাদের আতঙ্কিত করছে।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও এখনও মানুষের মুক্তি মেলেনি। দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চললেও এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পরেও গণতন্ত্র তেমন করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে এ দেশের মানুষ হতাশ হয়নি এবং হালও ছাড়েনি। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে তাদের আন্দোলন অব্যাহত আছে। এজন্য সব বিভেদ ভুলে আইনের শাসন, বৈষম্য নিরসন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। আর এ ঐক্যের ভিত্তিতে জাতীয় সমস্যা সমাধানের পথ নির্ণয় করা যাবে। অধিকন্তু সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ পরিহার করে রাজনৈতিক দলগুলোকে জনকল্যাণে নিয়োজিত হতে হবে। আর মহান স্বাধীনতার মাসে জাতি এসবই প্রত্যাশা করে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫