ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৬ এপ্রিল ২০১৮

ইতিহাস-ঐতিহ্য

মুক্তিযুদ্ধে নৌকমান্ডো অভিযান

নৌকমান্ডো মো. ফজলুল হক

২৫ মার্চ ২০১৮,রবিবার, ১৬:২২


প্রিন্ট
মুক্তিযুদ্ধে নৌকমান্ডো অভিযান

মুক্তিযুদ্ধে নৌকমান্ডো অভিযান

১৯৭১ সাল। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র ও সাবসিডিয়ারি পরীক্ষার্থী। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে আমরা প্রায় ২০ জন সংগঠিত হয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি আমাদের গ্রামের অনতিদূরে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে ভারতে যাই। মুর্শিদাবাদ জেলার শেখপাড়া (বাওনাবাদ) ট্রানজিট ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লেখাই। ১৩ মে সকালে ক্যাম্প কমান্ডার আমাদের ২০ জনকে সাঁতার প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত করে পাঠিয়ে দেন। বহরমপুর সেনানিবাসে পৌঁছে জানতে পারলাম, আমাদের নৌকমান্ডো প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। ওই দিনই দুপুরের মধ্যে ১৭৫৭ সালের পলাশীর সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের ময়দানের পাশে ডাকবাংলোতে গিয়ে উপস্থিত হই এবং নৌকমান্ডো প্রশিক্ষণে যোগ দিই।

নৌকমান্ডো ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা
১৯৭১ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কর্মরত আটজন বাঙালি ফ্রান্সে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করে অতি গোপনে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে ভারতে আসেন। তাদের উদ্যোগে যুদ্ধকালে বাংলাদেশ সেনাপ্রধান ও ভারতীয় নৌবাহিনীর যৌথ পরিকল্পনায় এবং পলাশীতে আমাদের নৌকমান্ডো সুইসাইড স্কোয়াড (সাঙ্কেতিক নাম সি২পি) ক্যাম্প স্থাপিত হয়। ওই আটজন বাঙালিই আমাদের ক্যাম্পের মূল প্রশিক্ষক ছিলেন- যাদের আমরা ‘দাদু’ বলে ডাকতাম। শ্রদ্ধেয় সেই দাদুরা হলেন- মো: রহমত উল্লাহ, মো: মোশারফ হোসেন, মরহুম আমান উল্লাহ শেখ, আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী (যিনি পরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ডিএনআই পদে উন্নীত হন), মো: বদিউল আলম, মো: আহসান উল্লাহ, মো: আবিদুর রহমান ও শহীদ আবদুর রকীব মিঞা (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ)।

ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ
যোগ দেয়ার দিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে আমাদের ভাগীরথী নদীর ধারে পলাশীর যুদ্ধ ময়দানে নেয়া হয়। সেখানেই তাঁবু খাটিয়ে রাত যাপন করলাম। দু-এক দিনের মধ্যেই পাশের বাবলা বনের জঙ্গল পরিষ্কার করে তাঁবু স্থানান্তর করা হলো। শুরু হলো পুরো প্রশিক্ষণ। প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৫টায় হুঁইসেল বাজিয়ে আমাদের জাগানো হতো। তার পর ৩০ মিনিটের মধ্যে প্যারেড-পিটির জন্য তৈরি হওয়ার পালা। ৭টা পর্যন্ত পুরো এক ঘণ্টা প্যারেড-পিটি করতে হতো। তার পর সকাল ৭টা থেকে ৭টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত নাশতা ও তাঁবু গোছগাছ ইত্যাদির জন্য বিরতি। ৭টা ৪৫ মিনিটে জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ পরিবেশন করা হতো।

সকাল ৮টা থেকে প্রশিক্ষণ শুরু। সব ক্যাডেটকে দুই দলে বিভক্ত করে এক দলকে সাঁতারের জন্য পানিতে, অন্য দলকে মল্লযুদ্ধ শিক্ষার জন্য মাঠে পাঠানো হতো। এ সময় প্রশিক্ষণের জন্য পোশাক একমাত্র সুইমিং কাস্ট। ফিনজ (হাঁসের পায়ার মতো রাবারের জুতা) পায়ে দিয়ে পুরো শরীর পানির নিচে রেখে শুধু নাক ও মুখমণ্ডল ভাসিয়ে চিৎ হয়ে পা দিয়ে ঠেলে অভিনব কায়দায় সাঁতার কেটে পেছনে যাওয়ার প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। পানির নিচে দীর্ঘক্ষণ ডুব দিয়ে থাকার অভ্যাস করানোও এই প্রশিক্ষণের অংশ। বিভিন্ন রকম প্যারেড-পিটিসহ বিনা অস্ত্রে যুদ্ধশিক্ষা দেয়া হতো। একটানা আড়াই ঘণ্টা এই প্রশিক্ষণ চলত। তার পর ৩০ মিনিট বিরতিতে লেমন জুস ও হালকা নাশতা পরিবেশন করা হতো।

১১টা থেকে আবারো প্রশিক্ষণ শুরু হতো। এরপর পানির দলকে মাঠে এবং মাঠের দলকে পানিতে পাঠানো হতো। প্রশিক্ষণ চলত বেলা ১টা পর্যন্ত। ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতি। এ সময় দুপুরের খাওয়া, বিশ্রাম, বৈকালিক চা-নাশতা। বিকেলের প্রোগ্রামে সব ক্যাডেটকে আবারো দুই ভাগে ভাগ করে এক দলকে যুদ্ধবিষয়ক অস্ত্রের বাস্তব ব্যবহার, যেমন- জাহাজে লিমপেট মাইন লাগানো, হাতবোমা নিক্ষেপ, এসএমজি চালানো, রেকি করা, অ্যামবুশ ইত্যাদির ক্লাস নেয়া হতো ও হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়া হতো।

অন্য দলের ক্যাডেটরা ফুটবল, ভলিবল, ওয়াটারপোলো খেলত। মাঝামাঝি সময়ে দল বদলে দেয়া হতো। এভাবে চলত সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। তখন রাতের খাবার পরিবেশন করা হতো। রাতের খাবার শেষে রাত ১০টা পর্যন্ত খবরের কাগজ পাঠ, কেরাম ও লুডু খেলা, গান-বাজনা, থিয়েটারে অংশ নেয়া চলত। রাত ১০টা বাজলে আলো নিভিয়ে সবাইকে বাধ্যতামূলক ঘুমাতে হতো।
এ ছাড়াও প্রত্যেক ক্যাডেটের জন্য সপ্তাহে দুই দিন রাত ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত নদীতে নাইট সুইমিং প্র্যাকটিস, দুই দিন রাতে পাহারা ও দুই দিন কুক ডিউটি (বাবুর্চির সাহায্যের জন্য) পড়ত।

অপারেশন জ্যাকপট :

প্রায় তিন মাস প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরসহ প্রধান প্রধান নদীবন্দরে একই সময়ে আক্রমণ করে বন্দরে রক্ষিত জাহাজে মাইন লাগিয়ে জাহাজ ধ্বংস বা ডুবিয়ে দিয়ে বন্দর ব্লক করার লক্ষ্যে ক্যাম্পের ১৬০ জন চৌকস নৌকমান্ডোকে প্রথম অপারেশনের জন্য মনোনীত করা হয়। তার মধ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের জন্য ৬০ জন মনোনীত হন। সে অপারেশনে আমিও ছিলাম।

যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ক্যাম্প থেকে জনপ্রতি একটি লিমপেট মাইন, সাঁতারের জন্য এক জোড়া রাবারের তৈরি ফিনজ্, আত্মরক্ষার জন্য একটি হ্যান্ডগ্রেনেড, উভয় দিকে ধারাল ও বিষযুক্ত চামড়ার খোলসে ভরা একটি ছোরা, এবং প্রতি তিনজনে একটি করে ৯ এমএম বোরের এসএমজি, সাথে প্রয়োজনীয় ম্যাগাজিন ও গুলির বাক্স সরবরাহ করা হয়। নিজস্ব কাপড়চোপড়সহ সব মিলিয়ে জনপ্রতি কমপক্ষে প্রায় ২৫ কেজির মতো ওজন দাঁড়ায়, যা আমরা লুঙ্গিতে বেঁধে নিয়েছিলাম। তার পর ২ আগস্ট ৬০ জন শ্রদ্ধেয় দাদু এ ডব্লিউ চৌধুরীর নেতৃত্বে অপারেশন জ্যাকপটের উদ্দেশে ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাই এবং ব্যারাকপুর সেনানিবাসে পৌঁছাই।

দমদম বিমানবন্দর থেকে ডোকোটা বিমানযোগে (ছত্রীবিমান) আমাদের আগরতলা বিমানবন্দরে নেয়া হয়। সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এক টিলার ওপরে আমাদের জন্য অস্থায়ীভাবে তৈরি ‘নিউ ইয়ুথ ক্যাম্প’-এ নেয়া হলো। সেখানে দু-তিন দিন অবস্থান শেষে ট্রাকে প্রথমে ‘হরিয়ান ক্যাম্পে’, পরে বাংলাদেশের কুমিল্লা সীমান্তে ‘ফংবাড়ি’ ক্যাম্পে নেয়া হয়। এবার দেশের ভেতরে ঢোকার পালা।

আমাদের ৬০ জনকে তিন দলে বিভক্ত করে একেক জন গাইডের অধীনে দাঁড় করানো হলো। এই ফংবাড়ি ক্যাম্প থেকে এক কিলোমিটার কম দূরত্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড। রাত ৯টার দিকে আমরা প্রথম ২০ জন গাইডের অধীনে ওই রোডের কাছে জঙ্গলের পাশে এসে দাঁড়াই। পাকসেনার গাড়ি রাস্তায় টহল দিচ্ছে এবং রাস্তার দুই ধারে ঘন ঘন বাঙ্কার, হারিকেন জ্বলছে। এ পরিস্থিতিতে রাস্তা পার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও যেতে হবে। সব মাল-সামান লুঙ্গি ও গামছা দিয়ে পিঠে বেঁধে নেয়া হলো।

এরপর যেই পাকসেনার গাড়ি টহল দিয়ে অন্য দিকে চলে গেল, সাথে সাথে আল্লাহকে স্মরণ করে আমরা চার-পাঁচজন ক্রলিং শুরু করি। রাস্তা পার হয়ে অতি সাবধানে ও দ্রুতগতিতে একটু ভেতরে অপেক্ষমাণ আরেকজন গাইডের কাছে পৌঁছাই। ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যেই দলের ২০ জন একত্র হতেই গাইড আমাদের নিয়ে রওনা হলেন। তিন দলকে তিন পথ দিয়ে একই জায়গায় নেয়া হবে। সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা পথ। আল্লাহকে স্মরণ করে গাইডের পেছনে হাঁটা দিলাম।

সারা রাত হেঁটে বৃষ্টিতে ভিজে, ভীতিকর ঘুটঘুটে অন্ধকারে কখনো খাল-বিল, ছোটখাটো নদীনালা, পাহাড়-টিলা, জঙ্গল পার হয়ে, প্রায় ২০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে, রাত শেষ হওয়ার আগেই পূর্ব নির্ধারিত শেল্টারে পৌঁছলাম। দিনভর বিশ্রাম নিয়ে রাতে একইভাবে সারা রাত হেঁটে পরবর্তী আশ্রয়স্থলে পৌঁছানো গেল। এভাবে পাঁচ-ছয় দিন সারা রাত হেঁটে আমরা ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার ‘সমিতি বাজার’ পৌঁছি। পূর্ব সিদ্ধান্ত মতে, সেখানকার আশ্রয়স্থলে স্থানীয় গাইডের তত্ত্বাবধানে সব অস্ত্রশস্ত্র জমা রেখে আমরা ৪০ জন নৌযোদ্ধা দু-তিনজনের দলে বিভক্ত হয়ে খালি হাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে এসে বাসে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ১৩ আগস্ট ‘সবুজবাগ’ বাড়িতে পৌঁছি। ১৩ আগস্টেই স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে সকাল ৭টার খবরের পর ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান’- পঙ্কজ মল্লিকের এই গানের মাধ্যমে অপারেশনের প্রস্তুতির জন্য সঙ্কেত পাঠানো হয়। এর অর্থ শুধু আমাদের দলপতি এ ডব্লিউ চৌধুরীই জানতেন।

এই সঙ্কেত প্রাপ্তির ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যখন পরবর্তী সঙ্কেত আসবে সে দিনই রাত ১টায় অপারেশন করতে হবে। ১৪ আগস্ট চট্টগ্রাম শহর ত্যাগ করে চার-পাঁচজন করে স্থানীয় গাইডের সাথে নৌকায় কর্ণফুলী নদী পার হয়ে পর্যায়ক্রমে জেটির অপর পাড়ে লক্ষ্যারচরে এক খামারবাড়িতে কৃষিকাজের শ্রমিক পরিচয়ে আশ্রয় নিই। ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে সকাল ৭টার খবরের পর একই সময়ে ‘আমার পুতুল যাবে আজকে প্রথম শ্বশুরবাড়ি’ গানের মাধ্যমে অপারেশন সঙ্কেত আসে। সন্ধ্যার মধ্যেই শাকসবজির কয়েকটি বস্তায় আমাদের অস্ত্রশস্ত্র খামারবাড়িতে পৌঁছে যায়। চট্টগ্রাম শহরের কয়েকজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ী অ্যাম্বুলেন্স ও ইলেকট্রিক ডাল সাপ্লাইয়ের গাড়িতে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে ‘সমিতি বাজার’ থেকে আমাদের অস্ত্রশস্ত্র চট্টগ্রাম শহরের গোপন আশ্রয়কেন্দ্রে আনেন এবং পরে শাকসবজির বস্তায় ভরে নৌকায় খামারবাড়িতে সময়মতো পৌঁছে দেন।

রাত ১০টার পর দাদুর কথামতো বস্তা খুলে অস্ত্রশস্ত্র বের করা হয়। তার পর দাদু সবাইকে অপারেশনের বিষয়টি জানালেন এবং অস্ত্রশস্ত্র বরাদ্দ করলেন। প্রতিজনকে একটি করে লিমপেট মাইন, সাঁতারের জন্য এক জোড়া ফিনজ, একটি করে হ্যান্ডগ্রেনেড এবং দুই ধারে বিষ মাখানো চামড়ার খোলসে ভরা একটি বিষাক্ত ছোরা ভাগ করে দেন। প্রতিকূল অবস্থায় ফংবাড়ি ক্যাম্প থেকে ‘সমিতি বাজার’ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাঁচ-ছয় রাত হেঁটে আমাদের মধ্যে সাতজন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমরা ৩৩ জন অপারেশনে অংশ নিতে মানসিক প্রস্তুতি নেই। উল্লেখ্য, দলপতির নির্দেশে আমরা চার-পাঁচজন করে পর্যায়ক্রমে দিনের বেলায় খামারবাড়ির পাশে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে প্রায় দুই কিলোমিটার এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করে রেকি করে দেখি এবং নদীতে নামা-ওঠাসহ খামারবাড়িতে আসা-যাওয়ার রাস্তা ঠিক করে নিই।

১৫ আগস্ট, পরিষ্কার চাঁদনি রাত। রাত ১২টা ৩০ মিনিটে আমরা ৩৩ জন নদীর পাড়ে যাই। প্রতি জাহাজে দুই সাইডে ও মাঝে তিনটি মাইন লাগানোর জন্য তিনজন করে গ্র“প করা এবং কে কোন জাহাজে মাইন লাগাবে, তা দলপতি ঠিক করে দেন। আমাদের গ্র“পের জন্য একটি আলোকিত জাহাজ পড়ে। ইঞ্জিন রুম কোনোটার সাইডে, আবার কোনোটার মাঝে। কাজেই ইঞ্জিন রুমকে সরাসরি হিট করার জন্যই প্রতি জাহাজে তিনটি করে মাইন লাগানোর সিদ্ধান্ত ছিল। নদীর অপর তীরে জেটির জাহাজকে টার্গেট করে নদীর পাড়ে নিজ নিজ গ্রুপের তিনজন করে আলাদা অবস্থান গ্রহণ করি। আমাদের গ্রুপে আমি অপারেশন গ্রুপ কমান্ডার নিযুক্ত হই। আমার গ্র“পে অন্য যে দু’জন ছিলেন তারা হলেন চট্টগ্রামের মো: আবুল বাশার (ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র) ও মো: মাযাহার উল্লাহ (চাকুরে)। আমি তাদের দু’জনকে জাহাজের দুই সাইডে মাইন লাগানোর নির্দেশনা দিলাম। নিজে দায়িত্ব নিই জাহাজের মাঝে মাইন লাগানোর।

রাত ১টা বাজলে নিজ নিজ টার্গেটে আঘাত হানার লক্ষ্যে আমরা ফিনজ পায়ে দিয়ে গ্রেনেড ও ছোরা কোমরে বেঁধে এবং বাম হাতে লিমপেট মাইন বুকের ওপর ধরে আল্লাহকে স্মরণ করে কমান্ডো কায়দায় সাঁতার শুরু করি। পুরো শরীর পানির নিচে ডুবিয়ে রেখে শুধু চোখ, মুখ, নাক পানির ওপর ভাসিয়ে চিৎ হয়ে সাঁতার কেটে পেছনে যেতে থাকি। কর্ণফুলী জোয়ার-ভাটার নদী। সেই সময় নদীতে ভাটা ছিল- অত্যন্ত খরস্রোতা অবস্থা। এরূপ পরিস্থিতিতে বেশ কিছুক্ষণ একত্রে সাঁতার কাটার পর নদীর প্রায় মাঝখানে এসে আমার সাথী আবুল বাশারকে রেখে একাকী সাঁতার কেঁটে আলোকিত টার্গেটের দিকে অগ্রসর হতে থাকি। বেশ কিছু দূর থেকেই জাহাজের নাম ‘হরমুজ’ পড়া যাচ্ছিল, যা একটি পাকিস্তানি জাহাজ। মাঝে মধ্যে উপুড় হয়ে ঠিকমতো যাচ্ছি কি না- তা দেখে নিই। এমনিভাবে দীর্ঘ সময় একাকী সাঁতার কাটার পর কাক্সিক্ষত টার্গেট ‘হরমুজ’ জাহাজের কাছে পৌঁছলাম। ইঞ্জিন চালু ছিল।

চাঁদনি রাতে মনে হলো, জাহাজটি লম্বায় প্রায় ৫০০ ফিট। জাহাজের কাছে পৌঁছে ইঞ্জিনের তথা জাহাজের শন শন শব্দে বুকটা কেঁপে উঠল। উপরন্তু নদীর সাইডে জাহাজে আলো দেয়া আছে, আবার জাহাজে লোড-আনলোডের কাজও চলছে। লোকসমাগমের শব্দ বোঝা যাচ্ছে। তবে জাহাজের নিচের অংশ স্ল্যান্টিং হয়ে নৌকার মতো সরু হওয়ায় জাহাজের পাশে পানির ওপর প্রায় তিন-চার ফুট জায়গা বরাবর ছায়া ছিল। আমার কাজ জাহাজের মাঝখানে লিমপেট মাইন লাগানো। মাইন লাগানোর সেই পবিত্র দায়িত্ব মাথায় রেখে সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে জাহাজের পাশের সেই ছায়ার অন্ধকারের মধ্য দিয়ে জাহাজঘেঁষে আস্তে আস্তে মাঝ বরাবর এসে উপস্থিত হই।

এই লিমপেট মাইন পানির প্রায় তিন-চার ফুট নিচে লাগানোর নিয়ম। কারণ এর বিস্ফোরণের ফলে জাহাজে একটি বড় ধরনের গর্ত হবে এবং গর্ত দিয়ে পানি ঢুকতে থাকবে। আর বিস্ফোরণের বিরাট ধাক্কায় জাহাজটি কাত হয়ে যেতে পারে। তাই পানির তিন-চার ফুট নিচে মাইন লাগানোর উদ্দেশ্য হলো বিস্ফোরণের ধাক্কায় জাহাজটি যেকোনো দিকে কাত হলেও যেন বিস্ফোরণে তৈরি গর্তটি পানির নিচেই থাকে এবং পানি ঢুকতেই থাকে। এর মুখ্য উদ্দেশ্য হলো, জাহাজটিতে পানি ঢুকে তা ডুবে যেন বন্দর অচল হয়ে যায়।

লিমপেট শব্দের অর্থ স্বয়ংক্রিয়, যা তাপে, চাপে, যেকোনোভাবে যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে। মূল বারুদ একটি পাটশোলা জাতীয় পদার্থের মধ্যে রাখা ছিল। এই মাইনের আকৃতি দেখতে হুবহু কচ্ছপের মতো। মাইনের তলায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ টুকরা হর্স-সু ম্যাগনেট (ঘোড়ার পায়ের আকৃতির চুম্বক) সেট করা। আর চুম্বক থাকায় মাইনটি জাহাজে লাগানো খুবই সহজ। প্রায় দু-তিন ফুট দূর থেকেই আকর্ষণে জাহাজে লেগে যায়। মাইনটি একটি টাইম বোমা, যাতে ডিলে টাইম হিসেবে একটি সল্ট ব্লক ব্যবহার করা হয়- যা রাবার ক্যাপ খুলে দেয়াসাপেক্ষে গলতে এক ঘণ্টা লাগবে, অর্থাৎ এক ঘণ্টা পরই বিস্ফোরণ ঘটবে। আর এ সময়ের মধ্যে কমান্ডোরা নদী পাড়ি দিয়ে অপর পাড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে যেতে পারবে। মাইন বহনে নিরাপত্তার জন্য ডবল সেফটি ডিভাইস ব্যবহার করা হতো। (ক) একটি সেফটি পিন বসানো থাকত, (খ) সেফটি ডিভাইসটি একটি রাবার ক্যাপ দ্বারা ঢাকা থাকত। মাইনটি লাগানোর পর প্রথমে রাবার ক্যাপ, পরে সেফটি পিন খুলে দিলে তবেই মাইনটি অ্যাকশনে যাবে।

আল্লাহকে স্মরণ করে নিয়মমতো মাইন লাগানোর জন্য লম্বা শ্বাস নিয়ে পানিতে ডুব দিয়ে প্রায় চার ফুট নিচে যাই এবং জাহাজের গায়ে মাইনটি লাগাই। এবার সেফটি ডিভাইস খোলার পালা। সেই সময় ভাটা ছিল এবং তীব্র স্রোতের ফলে রাবার ক্যাপটি এয়ারটাইট হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও রাবার ক্যাপটি খুলতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে দাঁত দিয়ে কামড়ে খুলে ফেলি। একইভাবে দাঁত দিয়ে সেফটি পিনও টেনে বের করে ফেলি। এ কাজে অনেক সময় লেগে যায়। ফলে আমার দম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। অথচ প্রশিক্ষণে পানির নিচে আমি ডুব দিয়ে প্রায় ২.৫ মিনিট থাকতে পারতাম। যাহোক তাড়াতাড়ি শ্বাস নেয়ার জন্য পানির ওপরে আসার লক্ষ্যে জাহাজ থেকে হাত ছেড়ে দিই। জাহাজ থেকে হাত সরানো মাত্রই স্রোতের ধাক্কায় আলোর মধ্যে ভেসে উঠি। আর পানির ওপরে ভেসে উঠতেই জাহাজে পাহারারত পাকসেনারা আমাকে দেখে ফেলে। এ অবস্থায় হঠাৎ করে আল্লাহর রহমতে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে সজোরে পানির ওপরে আরো বেশি ভেসে উঠি এবং লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে নদীতে জলজ প্রাণী শুশুকের কায়দায় ডিগবাজি দিয়ে আবার পানিতে ডুব দিয়ে আত্মগোপন করি। প্রথমে আমি স্রোতের অনুকূলে দ্রুত সাঁতার কেটে অনেক দূরে চলে যাই। তার পর পানির ওপরে নাক, মুখ, চোখ ভাসিয়ে কমান্ডোর কায়দায় সাঁতার কাটতে থাকি। এ অবস্থায় লক্ষ্য করলাম আমার মাইন লাগানো ‘হরমুজ’ জাহাজে পাহারারত প্যাকসেনারা সার্চলাইট দিয়ে জাহাজের আশপাশে খোঁজাখুঁজি করছে- ভাবলাম এতে অন্যদের অবশ্যই অসুবিধা হবে। যাহোক একাকী সাঁতার কেটে চলেছি। সাথে কেউ নেই, অন্যদের কোনো খবরও জানি না। কোথায় যাচ্ছি তাও জানি না। তখন নদীতে হাঙ্গর-কুমিরের কোনো ভয় নেই, ডোবার ভয় নেই, শুধু নিরাপদ আশ্রয়ের লক্ষ্যে সাঁতরিয়ে চলেছি। ডানে তাকালে শুধু পানি আর পানি; সমুদ্র মোহনা, সাগরের অথৈ জলরাশি। সামনে তাকালে অদূরে নদীর অপর পাড়ে একটি জঙ্গল মনে হয়। সে দিকেই সাঁতার কেটে চললাম। নদীর অপর পাড়ের প্রায় কাছাকাছি এসে পাড়ের দিকে তাকাতেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ল। মনে হলো একজন পাকসেনা রাইফেল হাতে ক্রলিং অবস্থায় নদীর দিকে তাক করে আছে। প্রথমে ভয় পেলাম।

ভাসমান অবস্থায় প্রায় ১০-১২ মিনিট অপেক্ষা করে পর্যবেক্ষণ করলাম, নড়াচড়া নেই। জীবিত মানুষ বা জীবজন্তু যাই হোক না কেন অবশ্যই নড়াচড়া করবে। সাহসে ভর করে নদীর পাড়ের দিকে এগোলাম এবং দূর থেকে মজার কাণ্ড দেখলাম। আসলে একটি গাছের মোটা শিকড় নদীর পাড়ে পড়ে আছে, যা দেখতে ওই রকম ভয়াবহ দেখাচ্ছিল। যাই হোক পানি ছেড়ে উঠে সোজা জঙ্গলে ঢুকতে লাগলাম। নির্দেশনা সত্ত্বেও নদী থেকে ওঠার সময় অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিইনি। কারণ অচেনা-অদেখা একটি নতুন জায়গা। তা ছাড়া একাকী জঙ্গলে ঢুকে যাচ্ছি। বাঘ, ভাল্লুক, সাপ-বিচ্ছু কোনো কিছুরই ভয় লাগেনি। কারণ জাহাজে মাইন লাগানোর আনন্দই ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে। জঙ্গলে কিছু দূর ঢুকে যেতেই বেত ঝাড়ের কবলে পড়লাম। বেতের কাঁটায় পুরো শরীর কেটে যাচ্ছে, তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। জঙ্গলের ভেতরে যেতে যেতে যখন বেশি পানি হলো, তখন ফিনজ পায়ে আবারো সাঁতারে যেতে লাগলাম।

অদূরে জোড়া খেজুরগাছ। অনুমান করলাম পাশেই লোকালয় হতে পারে। সাঁতরিয়ে ওই জোড়া খেজুরগাছের কাছে পৌঁছে ডাঙ্গা পেলাম। সব অস্ত্রশস্ত্র পানিতে ফেলে ওপরে উঠলাম। আল্লাহকে স্মরণ করে আকাশের তারকা লক্ষ্য করে খামারবাড়ি পৌঁছানোর লক্ষ্যে মহল্লার দিকে একাকী চললাম। মহল্লা পার হয়ে মাঠ পেলাম। বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত একাকী পাড়ি দিয়ে চলেছি। একপর্যায়ে একটি খাল পেলাম। প্রথম দিন নৌকায় নদী পার হয়ে এ খালেই আমরা নৌকা ভিড়িয়ে খামারবাড়িতে গিয়েছিলাম। সাঁতার কেটে খাল পার হলাম। খালের ওপর উঠে অপর পাড়ে জেটির দিকে তাকাতেই রাইফেল গর্জে উঠল।

শাঁ শাঁ শব্দে রাইফেলের গুলি এসে আমার আশপাশেই পড়তে লাগল- বুঝলাম আমাকে লক্ষ করে গুলি ছোড়া হয়েছে। সাথে সাথে জড়সড় হয়ে হামাগুঁড়ি দিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লাম। পরপর আরো ১০-১২ রাউন্ড গুলি এসে আমার আশপাশে কয়েক গজের মধ্যেই পড়ল। গুলি ছোড়া বন্ধ হতেই আমি ক্রলিং করে পাশের ধান ক্ষেতে ঢুকে পড়লাম। এরই মধ্যে জেটিতে প্রথম মাইন বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। তখন জেটি থেকে হইচইয়ের শব্দ ভেসে আসতে থাকল। সাফল্যের আনন্দে অতি সাবধানে ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে দ্রুত খামারবাড়িতে এসে পৌঁছলাম। এরই মধ্যে আবারো মাইন বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। খামারবাড়িতে পৌঁছেই জানলাম, অপারেশন শেষে ফিরে কয়েক ব্যাচে (চার-পাঁচজন) গাইডের মাধ্যমে ২০-২৫ জন নিরাপদে আশ্রয়ের জন্য খামারবাড়ি ত্যাগ করে চলে গেছে। আমি পৌঁছার পর চার-পাঁচজন একত্র হতেই আরেকজন গাইডের মাধ্যমে আমাদের পাঠিয়ে দেয়া হলো।

একের পর এক মাইন বিস্ফোরণের বিকট শব্দ ভেসে আসতে লাগল। রাত তখন প্রায় ৪টা হবে। গাইড জানালেন, রাত থাকতেই নির্দিষ্ট আশ্রয়ে প্রায় ১২-১৪ কিলোমিটার যেতে হবে। তাই আমরা কখনো ডবল মার্চ করে, কখনো বা দৌড়ে যেতে লাগলাম। কিছু দূর যেতেই নদীতে অঁ-অঁ শব্দে সাইরেন বাজতে শুরু করল। সে কী করুণ ও ভয়াবহ শব্দ। মাইন বিস্ফোরণের সেই বিকট শব্দ এবং ভয়াবহ সাইরেন কোনো দিন ভুলব না। এরই মধ্যে পাকসেনারা নদীতে গানবোট নামিয়ে সার্চলাইট দিয়ে তল্লাশি শুরু করেছে। সে সার্চলাইটের আলো নদীর পাড়ের কয়েক কিলোমিটার ভেতরে আমাদের রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। যতদূর মনে পড়ে, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ২৩টি মাইন বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি এবং স্বাধীনতার পর জেনেছি ১০-১২টি জাহাজ বা বার্জ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পানিতে ডুবে বন্দর ব্লক হয়েছিল। প্রায় তিন ঘণ্টা চলার পর রাত শেষ হওয়ার আগেই আমরা নির্দিষ্ট আশ্রয়স্থলে এসে পৌঁছলাম। ১৬ আগস্ট সেখানে আমরা দুপুর পর্যন্ত অবস্থান করি। এরপর চার-পাঁচজন করে নৌকায় কর্ণফুলী পার হয়ে চট্টগ্রাম শহরে এসে বাসে আগ্রাবাদের সেই আশ্রয়স্থলে ফিরে যাই। আমাদের এই অপারেশনে এস এম মাওলাসহ দু’জন পাকসেনার হাতে ধরা পড়েছিল। তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করা হয় এবং স্বাধীনতা পর্যন্ত আটকে রাখে।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে সফল অপারেশন শেষে আমরা অতি গোপনীয়তা রক্ষা করে যেভাবে চট্টগ্রাম এসেছিলাম ঠিক সেভাবেই চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে যাই এবং ভারতের পলাশীতে ক্যাম্পে ফিরে যাই।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে অপারেশন জ্যাকপট স্বাধীনতা যুদ্ধে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে স্বীকারই করেনি। বরং এটিকে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বা বিশৃঙ্খলা বলে বহির্বিশ্বে প্রচার করে আসছিল। কিন্তু আমাদের এই অপারেশন সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পাকিস্তান সরকারও এই নৌকমান্ডো আক্রমণের বিষয় স্বীকার করে নেয়। এই স্বীকারোক্তি মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ত্বরান্বিত হয় স্বাধীনতা। আমাদের এই অপারেশন জ্যাকপট নন্দিত হয় বিশ্বব্যাপী। এ মূল্যায়ন বিশ্বের সেরা যুদ্ধবিশারদদের।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫