স্বাধীনতা : নিরাপদ আশ্রয় ও সুশাসন
স্বাধীনতা : নিরাপদ আশ্রয় ও সুশাসন

স্বাধীনতা : নিরাপদ আশ্রয় ও সুশাসন

ড. সুকোমল বড়ুয়া

স্বাধীনতা এমন একটি অর্থবহ শব্দ, যার গন্ধ ও স্পর্শ দেশের সার্বভৌমত্ব মাটি, মানুষ আর জাতির অন্তঃসত্তাকে জাগিয়ে তোলে। আমরা আজ স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছরেও বোধ হয় সেই স্বাধীনতার অর্থ বুঝতে সক্ষম হইনি। এবং সেই স্বাধীনতা আমাদের অন্তঃসত্তাকে এখনো জাগাতে পারেনি। যদি পারত তাহলে আজ দেশের এ করুণ অবস্থা হতো না। দেশের সংবিধান, গণতন্ত্র, শাসন ও বিচারব্যবস্থা এত ক্ষতবিক্ষত হতো না। আমরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারতাম, লিখতে পারতাম এবং উৎকণ্ঠাহীন ভাবনায় চলতে পারতাম। আর নির্ভয় ও শঙ্কাহীনতায় পুলিশ, র‌্যাবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম। 

আমরা আজ কার বিরুদ্ধে কথা বলব, কার বিরুদ্ধে লিখব। আমরা সবাই তো এ দেশের মানুষ। র‌্যাব, পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা কি আমার ভাই নয়? আমার দেশের কি লোক নয়? আমার দেশের কি সন্তান নয়? তারা তো আর বাইরের দেশ থেকে আসেনি। আগে হয়তো ব্রিটিশ, পাকিস্তানিরা আমাদের শাসন করেছে; স্বাধীনভাবে চলতে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে। আমাদের গুলি করেছে। আমাদের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পরও কেন আমরা সেসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি? কেন আজ কথায় কথায় আমাদের ওপর গুলি বর্ষিত হয়? কেন অপহরণ ও গুম হয়? কোথায় আজ গণতন্ত্র, কোথায় আজ বাক-স্বাধীনতা, কোথায় আজ লেখনী-স্বাধীনতা, কোথায় আজ আমাদের অবস্থান? এখন তো আর ব্র্রিটিশ, পাকিস্তানি শাসকবাহিনী নেই। নেই লর্ড ক্লাইভ, ইয়াহিয়া আর টিক্কা খান কিংবা আইয়ুব খানের রাইফেলের বাঁট আর বন্দুকের গুলি।
তাই আজ বলতে চাই, স্বাধীনতা শুধু একটি ভৌগোলিক সীমারেখার স্বাধীনতা নয় কিংবা একটি স্বতন্ত্র পতাকার স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতা হলো সেসব ভূখণ্ডের মানুষের মুক্তবুদ্ধি, মেধা, মনন এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সামগ্রিক চিন্তাভাবনার স্বাধীনতা। সীমাহীন ভাবনা, স্বপ্ন ও হৃদয় উৎসারিত আশা-আকাক্সক্ষা ও আনন্দ-অনুভূতির স্বাধীনতা। নাগরিক ও ব্যক্তিসত্তার এসব মৌলিক উপাদান একটি জাতিকে সুদৃঢ় করে, সামনে এগোনোর অসীম শক্তি জোগায়।
যেসব দেশ আজ স্বাধীন, বিদেশী শক্তি ও শাসন থেকে মুক্ত তাদের ভাবনা, তাদের চিন্তা, তাদের জাতীয় ঐক্য আজ কোথায়। আর আমরা কোথায় আছি; একটু পার্থক্য খুঁজলেই বুঝতে পারি। আজ তারা তর তর করে বেড়ে উঠছে ওই সব কারণে; অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতির শীর্ষ শিখরে। আর আমরা এখনো অন্তর্ঘাতে, অন্তর্দ্বন্দ্বে পিছিয়ে আছি এবং নিজেদের মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাসের বেড়াজালে আটকে আছি। নিজের দেশে নিজে পরবাসী। নিজের ঘরে নিত্য খুন-খারাবি, গুম হচ্ছে। অহরহ আমরা নিজের ভাইকে হত্যা করছি। জাতীয় স্বার্থ বিনষ্ট করছি। জাতীয় রাজস্ব চুরি করছি। নানা ধরনের অপরাধে আমার দেশকে কলঙ্কিত করছি। বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করছি। সনদও চুরি করছি। কী অভাগা স্বাধীনতা! কী অভাগা স্বাধীন দেশ!
অনেক কষ্ট ও রক্তের বিনিময়ে বহু মা-বোনের মান-সম্ভ্রমের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। না খেয়ে, না দেয়ে ৯ মাসের যুদ্ধে অনেক তাজা প্রাণের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। আজ প্রশ্ন জাগে, এ স্বাধীনতা এ রকম হবে কেন? কেন স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে? কেন জাতি আজ দ্বিধাবিভক্ত হবে? আমাদের ১৯৭১-এর চেতনা তো সে রকম ছিল না। কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিষ্টান কিংবা কে পাহাড়ি, কে বাঙালি এসব জাতপাত বিচার তো তখন ছিল না। আমরা সবাই ছিলাম মুক্তিযুদ্ধের এক মাঠে, নদীর এক সীমানায়। আমাদের পরিচয় ছিল আমরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক। আমরা বাংলাদেশী। এ জন্যই তো একঘরে থেকেছি, একসাথে ঘুমিয়েছি, একই হাঁড়ি-পাতিলে খেয়েছি। কোনো বাছবিচার ছিল না তখন, কেউ করেনিও।
মুক্তিযুদ্ধের এসব স্মৃতি এখনো আমরা ভুলিনি। ভুলতে হয়তো পারবই না। এ স্মৃতি স্বাধীন-সার্বভৌমত্বের চেতনায়, সম্প্রীতির ঐক্য-সংহতি ও মিলনের ইট-পাথরে লেগে আছে, অনন্তকাল থাকবে। হয়তো কখনো মুছবে না। কিন্তু আমরা নিজেরাই ঘষে-মেজে আমাদের স্মৃতিগুলোকে প্রতিনিয়ত ধুয়ে নিচ্ছি, মুছে নিচ্ছি। এ জন্যই তো দেশের আজ এত দুর্দশা, এত দৈবদুর্বিপাক। এ সঙ্কট আমাদের নিজেদেরই সৃষ্টি; কোনো ঐশ্বরিক বা প্রাকৃতিক সৃষ্টি নয়। তাই আমরা নিজেরাই এর সমাধান করতে পারি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনের দরজা আর গুলশানের খালেদা জিয়ার তালাবদ্ধ দরজা খোলা থাকলেই সব কিছুর সমাধান হয়ে যায়।
এত হাঁকডাকের প্রয়োজন নেই, অন্যেরও কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু মুখোমুখি এক টেবিলে বসা, পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ আর সৌজন্য প্রকাশ করা। এতে সংলাপ ও সমঝোতার একটি বড় পরিপ্রেক্ষিত এবং আস্থা-বিশ্বাসের উদার দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয়। এটির দায়িত্ব সরকারের। ক্ষমতায় থাকলে সরকারকে অনেক উদার হতে হয়, অনেক কিছু ছাড় দিতে হয়। এটি আমার কথা নয়, জনগণের কথা। তাই আমরা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাব, আরো বেশি উদার হতে এবং মমতা ও সহানুভূতি দেখাতে। এতে প্রধানমন্ত্রীই মহৎ হবেন, বড় হবেন। আপনি কখনো ছোট হবেন না। আমরা শৈশবে বাল্যশিক্ষায়ও পড়েছি- ‘বড় যদি হতে চাও ছোট হও তবে’। এটি উদার মনোভাব ও আদর্শ রাজনীতির কথা। এর বাইরে আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই।
রাজনীতিতে পক্ষ-বিপক্ষ থাকা স্বাভাবিক। আগে যারা রাজনীতি করেছেন, তাদের কি পক্ষ-বিপক্ষ ছিল না? মতের বিরোধিতা ছিল না? সংলাপ ছিল না, আন্দোলন ছিল না? অবশ্যই ছিল। এখন করা যাচ্ছে না কেন? অসুবিধা কোথায়? এর জবাব কে দেবে? এগুলো তো রাজনীতির সংস্কৃতি বা কালচার হতে পারে না। যদি বলি বঙ্গবন্ধু কি আন্দোলন করেননি? ছয় দফা দেননি? সংলাপ করেননি? মওলানা ভাসানী কি আন্দোলন করেননি? আমরা কি মিটিং-মিছিলে যাইনি? শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কি রাজপথে নামেননি? প্রতিবেশী দেশ ভারতে কি রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ নেই? কংগ্রেস ও মোদির মধ্যে কি কোনো বিরোধ নেই? গান্ধীজী কি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি? কথা বলেননি? দেশ কি এমনিতে স্বাধীন হয়েছে? তাহলে আজ বিরোধিতা করা যায় না কেন? বিরোধিতা করতে গেলেই যেন খুন ও গুমের আতঙ্কে থাকতে হয়। এ কালচার চলতে থাকলে সামনের দিনগুলো হবে আরো ভয়ঙ্কর ও আরো মহাবিপজ্জনক।
‘গুম’ শব্দটির কথা আগে আমরা কখনো শুনিনি। শোনা গেলেও খুবই কম। ইদানীং এ শব্দটি মানুষের মগজেই ঢুকে গেছে বেশি। সুশীলসমাজের মধ্যে এর আতঙ্ক আরো বেশি। কারণ, তারা ভালো-মন্দ লেখেন, ভালো-মন্দ বলেন এবং সরকার ও বিরোধী দলের সমালোচনা করেন, পরামর্শও দেন। তাই তারা আজ শত্র“, এদের ওপর সরকার ক্ষিপ্ত। সত্য কথা বলতে নেই। সত্য কথা বলতে গেলেই আজ মহাবিপদ। সরকারের বিপক্ষে বললে তো আর কথাই নেই। এ ভয়ে আজ কেউ মুখ খুলতেও চায় না। দেখেও না দেখার মতো হয়ে থাকে। কী করবে, উপায় নেই। জেনেশুনে কেউ বিপদ ডেকে আনতে চায় না। গুমও হতে চায় না। কী ভয়ঙ্কর, স্বাধীন দেশের বিরূপ স্বরূপ।
শৈশব থেকে জেনেছি, শুনেছি এবং পড়েছিও শিক্ষিত জ্ঞানীজনেরা দেশের অলঙ্কার, দেশের মুকুট। গুণীর কদর সর্বদেশে, সর্বকালে। যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশে গুণী জন্মায় না। এ বাক্য চিরসত্য। কিন্তু আমাদের বেলায়? ক্ষমতার দাপটে বাহুবলে কিংবা বন্দুকের নলে এ পর্যন্ত কেউ কখনো বড় হয়নি। এ জীবন আমাদের কারো কাম্য নয়। আমরা সবার সুখ চাই, শান্তি চাই, দেশের উন্নতি-সমৃদ্ধি চাই।
আগে রাজনীতিকে বলা হতো রাজার নীতি। সক্রেটিস, প্লেটো আর ম্যাকিয়াভেলির মতো দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সেসব আদর্শের কথা বলেছেন। সুস্থ রাজনীতির ধারা দেখিয়েছেন। গুড গভর্ন্যান্সের কথা বলেছেন। সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র, আইন, শাসন ও বিচারব্যবস্থার নিয়মনীতি প্রবর্তন করেছেন। প্রজাদের সামগ্রিক সুখের চিন্তা করেছেন। নাগরিক-জীবনের নিরাপত্তার বিধান করেছেন। আজ মৌলিক অধিকার নেই কেন? স্বাধীন দেশে আজ বাক-স্বাধীনতা থাকবে না কেন? অপরাধ করলে তার বিচার হবে। তা হবে জনগণের সামনে, কোর্ট-কাচারির আঙিনায় কিংবা জেলে-কারাগারে। গোপন হত্যা ও গুম হবে কেন?
সুশীলসমাজের বহু লোক আছেন যারা দেশের জন্য ভাবেন, চিন্তা করেন এবং কথা বলেন। তারা আমাদের সমাজের আলোকিত জন, ভদ্র মানুষ। তাদের কোনো উচ্চাভিলাষ নেই, চাহিদাও নেই বরং তাদের চিন্তাভাবনা ও পরামর্শগুলো রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য অনেক ভালো ও হিতকর মনে হয়। কিন্তু তারাও আজ কথায় কথায় মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের অশিষ্ট বাক্যবাণে আক্রান্ত। তাহলে দেশের জন্য কে কথা বলবে? কে ভাববে? ভাবতে গেলেই তো অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হয়। সুতরাং এসব কালচার দূর না হলে দেশ কখনো ভালো মানুষ পাবে না। রাজনীতিতে ভালো মানুষ আসবে না।
আবারো বলছি, রাজনীতিতে পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে, মতের বিরোধিতাও থাকবে। এটা কোনো গানের আসর নয় যে, একসাথে বসে সবাই সুর মেলাবে আর আমরা বাদ্যযন্ত্রের তাল মেলাব। আমরা গুমের বিরুদ্ধে, পেট্রলবোমার বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। এমনকি জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির বিরুদ্ধেও। আজ স্বাধীনতার মহান এ দিবসে সবার কাছে আহ্বান জানাই, চলুন আমরা আজ ঐক্যবদ্ধ হই, শপথ গ্রহণ করি। দুর্বৃত্তায়ন রাজনীতি পরিহার করি, গুম-হত্যা বন্ধ করি। সঙ্ঘাত ও সহিংসতা পরিহার করি। দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করি। সবার মঙ্গল কামনা করি। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি কামনা করি। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.