সৈয়দ আলী আহসান বহুমাত্রিক মনীষা

মনিরুজ্জামান

‘সাহিত্যাচার্য্য সৈয়দ আলী আহসান’ কথাটি বলেছিলেন প্রবোধচন্দ্র সেন, অধ্যাপক ও রবীন্দ্র গবেষক, বিশ্বভারতী। একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের নিকট থেকে এমন একটি উপাধি পাওয়া কম কথা নয়। বরং বলা যায় এক বিস্ময়কর ও রাজসিক মূল্যায়ন। এ রকম একটি উপাধিতে বাংলাদেশের অন্য কোনো কবি বা কোনো শিল্প গবেষকের জীবন অভিষিক্ত হয়েছে কি না আমার জানা নেই।
জন্ম ২৬ মার্চ ১৯২২, মাগওরা জেলার আলোকদিয়া গ্রামে। শিক্ষাজীবন মূলত শুরু ঢাকায়। ১৯৪৩ ও ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে যথাক্রমে অনার্স ও এমএ পাস করেন। এরপর বিবিধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন। কখনো অধ্যাপক, কখনো উপাচার্য, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় অধ্যাপক প্রভৃতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। আবার কখনো কখনো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিল্প-সাহিত্যজগতে বিশেষ বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
সৈয়দ আলী আহসান কবি, শিল্প গবেষক, সমালোচক এবং আরো অনেক পরিচয়ে আমাদের সামনে উজ্জ্বল এক শিল্পব্যক্তিত্ব। অভিজ্ঞতার উপকরণে এক পরিপূর্ণ শিল্পসাধক। সাহিত্য রচনা, আস্বাদন, উপলব্ধি, উৎঘাটন ও তার উপস্থাপন এগুলো তিনি একপ্রকার আত্মস্থ করেছিলেন। তিনি পঞ্চাশের দশকে অন্যতম প্রধান কবি। কিন্তু aesthetic ক্ষেত্রে উৎকর্ষগত প্রতাপে তার খ্যাতি উঁচু হয়েছে। aesthetic এই জায়গাটায় তিনি অনন্য এবং অনেকটা অদ্বিতীয় বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। জীবনের অসাধারণ রহস্যময় যে বিপুলতা আছে তা বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ যুক্তি দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন। তাঁর কথা ও কবিতা এক ও অভিন্ন। তাঁর একটি কথা মনে পড়ছে। তিনি বলেছেন, সময়ের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে, মনে রাখতে হবে সময়কে হারালে আমরা পৃথিবীকে হারাব। কথাগুলো আমাদের হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যায় এবং চিরকালীন একটি সত্য আমাদের উপলব্ধির কাছে পৌঁছে দেয়। ভাবনার এই বিশিষ্টতা মানবজীবনে যেমন বিস্ময়কর আবার কখনো কখনো নির্মম। উপলব্ধির এই শিক্ষা আমরা যে পেয়েছি তার প্রথম অভিভাবক তিনি। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক তার সম্পর্কে বলেছেন, " His aesthetic sense is very keen. " অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মতো ভারতের বিখ্যাত কবি শিল্পসাধক ড. মুলকরাজ আনন্দ বলেন, Ali Ahsan is great, Not I am তিনি আরো বলেন, তাঁর মতো লোক দণি এশিয়ায় জন্মগ্রহণ করতে হয়তো আরো ২০০ বছর লেগে যেতে পারে। মন্তব্যগুলো তাঁর সম্পর্কে আমাদের আরেকবার বিশেষভাবে ভাবিয়ে তোলে।
তিনি কবি ও গবেষক, তবে গবেষণা ও সাহিত্য সমালোচনায় তিনি অধিক উজ্জ্বল ও প্রসিদ্ধ। তাঁর ‘আলাওয়ালের পদ্মাবতী’ বাংলা সাহিত্যে একটি মৌলিক গবেষণা কর্ম। গ্রন্থটি পাঠ করে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন আলী আহসানের ‘আলাওয়ালের পদ্মাবতী’ একটি মৌলিক গবেষণা কর্ম, এই কর্মে অন্য কেউ সফল হতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে আলী আহসান অনন্য ও অসাধারণ। তিনি মধুসূদনের ওপর বই লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বই লিখেছেন এবং একই সাথে বাংলা সাহিত্যে তুলনামূলক পদ্ধতি অবলম্বন করে আধুনিক সাহিত্যের নিগূঢ় ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সঙ্গত কারণে মুনীর চৌধুরী তার তুলনামূলক সামলোচনা গ্রন্থটি সৈয়দ আলী আহসানকে উৎসর্গ করেন এবং উৎসর্গ পত্রে লেখেন, ‘অগ্রজ প্রতিম সৈয়দ আলী আহসানকে
যিনি আমাদের মধ্যে প্রথম গভীর
অন্তরদৃষ্টি সম্পন্ন বৈদগ্ধপূর্ণ
সাহিত্য সমালোচনার অত্যুকৃষ্ট দুষ্টান্ত
স্থাপন করে অনুরূপ অনুশীলন
অনুসন্ধানে ব্রতী হবার জন্য
আমাকে অনুপ্রাণিত করেন।’
মুনীর চৌধুরীর উৎসর্গ পত্রের এই শব্দগুলো আলী আহসান সম্পর্কে একটি অকৃত্রিম ও যথাযথ স্বীকৃতি।
জীবনে নিবিড় বাস্তবতা কিভাবে সাহিত্যে প্রতিফলিত হয় তার বিবিধ উপাদান ও যুক্তি আমাদের সামনে তিনি উন্মোচন করেন। মধ্যযুগের সাহিত্যে মানুষ দেবতার কাছে অসহায় ছিল। অর্থাৎ মানুষের ভাগ্য দেবতা দ্বারা নির্ধারিত। এই বিশ্বাসে মানুষ অসহায় ও হতবিহবল ছিল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ও দর্শনগতভাবে মানুষ মূলত তার অস্তিত্বের নিকট অসহায়। এই বোধ ও বিশ্বাস সর্বপ্রথম তিনি আমাদের সামনে উপস্থিত করেন এবং তা যুক্তির দ্বারা। আধুনিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য এটাই অর্থাৎ মানব প্রধান হওয়া। এ কারণে আধুনিক কবিরা অধিকতর প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য। আবার আধুনিক কবিতায় নিয়তির পরাক্রম যে অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য তা তিনি নির্মম সত্যের বিভাবনে আবিষ্কার করেন। জীবনকে পরাজয় ও ব্যর্থতার দৃষ্টি দিয়ে তিনি বিচার করেননি। জীবনে উপস্থিত কর্তব্যকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইংরেজিতে এমএ পাস সত্ত্বেও ১৯৪৯ সালে সিনিয়র অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে যোগদান করেন। কিন্তু তৎকালীন বিভাগীয় অধ্যক্ষ তা মেনে নিতে পারেননি। তাই তাকে হেয়-বিব্রত করার জন্য বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্য যুগ পড়ানোর দায়িত্ব দেন। তিনি বিষয়টা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সফলকাম হন। এভাবে তিনি তার প্রজ্ঞা মনীষার দ্বারা জীবনের বিবিধ সঙ্কট অতিক্রম করেছেন।
সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে একটি শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমের কবিতা। মধুসূদন-এর ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য যেমন বাংলা সাহিত্যের প্রথম দেশপ্রেমের কবিতা। আমার পূর্ব বাংলা কবিতাটিকে দেশপ্রেম ও বাংলার অপূর্ব রূপ বর্ণনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তস্বরূপ বিবেচনা করা হয়।
Aesthetic ক্ষেত্রে সৈয়দ আলী আসহানের মতো দ্বিতীয়জন আবিষ্কার করা কঠিন, অন্তত বুদ্ধদেব বসুর পরবর্তী সময়ে। অনেকে মোহিতলাল মজুমদারকে ‘Kind of Dr. Johnson ' বলেছেন এবং তা aesthetic কারণে। অনুরূপভাবে বুদ্ধদেব বসু ও সৈয়দ আলী আহসান যদি টি এস এলিয়ট ও এজরা পাউন্ডের সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত হন তা অমূলক হয় না। বরং comparative criticism -এ এরা অধিকতর অগ্রগামী। সুতরাং বলা যায় বাংলা সমালোচনা সাহিত্য জগতে সৈয়দ আলী আহসান অপরিসীম অনিবার্যতায় চিরকাল প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.