ঠোঙাওয়ালি

দিল আফরোজ রিমা

রাত শেষ না হতেই আমেনা ঘুম থেকে উঠে ঠোঙা বানানো শুরু করে। কখন পাখিরা ডেকে উঠেছে, কখন চার দিক ফর্সা হয়েছে, কখন সূর্য উঠেছে আমেনা টেরও পায়নি। এ দিকে স্বামী কাজে যাবে, নিজেও কাজ করতে যাবে। মেয়েটা যাবে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে। আপন মনে একটার পর একটা ঠোঙা বানিয়ে যাচ্ছে আমেনা। মেয়েটা এসে তাড়া দেয়Ñ অ-মা কি নাস্তা করমু। আইজতো পান্তা ভাতও নাই। আমরা কি আইজ না খাইয়া কামে যামু?
মেয়ের কথায় আমেনার খেয়াল হয়। সকাল হয়েছে কিছু মুখে দিয়ে কাজে যেতে হবে সবাইকে। তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে চুলায় আগুন ধরায়। খুদের ভাত রান্নার প্রস্তুতি নেয়। হাঁড়িটা চুলার ওপর চাপিয়ে দিয়ে ধইনা পাতা আর কালোজিরার ভর্তা বানাতে ব্যস্ত হয় আমেনা। এমন সময় জমীর আলী এসে বলে- আইজ বড্ড দেরি অইয়া গেল। সাতটা তো বাইজা গেল। কাইল ভ্যান গাড়িটার কয়খান স্পোক ভাঙল। মন-মেজাজ ভালা নাই। দে তাড়াতাড়ি কিছু মুখে দেই।
আমেনা সভয়ে বলে- ইট্টু খাড়ান, খুদের ভাত রানতাছি। অহনই অইয়া যাইব। এই ভর্তা বানাইতে বানাইতে ভাতও অইয়া যাইব।
কি কইলি ? অহনো অয় নাই? আরো দেরি অইব? এতণ তুই কি করছস?
কথাটি বলেই জমীর আলী আমেনার চুল ধরে টেনে তুলে দিতে থাকে কিল থাপ্পড়। তারপর ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। আমেনা পড়ে যায়। শিলপাটার ওপর মাথাটা গিয়ে পড়ে কপালের কোণ বেয়ে রক্ত জেগে ওঠে। পাটার মধ্য থেকে কালোজিরার ভর্তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। আমেনা নিজের হাত দিয়ে রক্ত মোছার চেষ্টা করে। তার হাতটি লাল টকটকে রক্তে রাঙা হয়ে ওঠে। সে চোখে জল নিয়ে মুচকি হেসে বলেÑ এই তো আমার কপাল।
জমীর আলী না খেয়েই ভ্যান নিয়ে বের হয়ে যায়। মেয়ে রুমকি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করে। সে তৈরি হয়ে মায়ের কাছে আসে। বলে- অ-মা অহনো নাস্তা অয় নাই। আমেনা তাড়াতাড়ি চুলার ওপর থেকে ভাতের হাঁড়িটা নামিয়ে দেয়। তাড়াতাড়ি একটি দাগ পড়ে যাওয়া পুরনো থালায় খুদের ভাত বাড়তে থাকে আর আহাদ করে বলে- দেখ মা, আইজ খুদের ভাত রানছি, মজা অইছে, তুইতো খুদের ভাত খাইবার চাস, নে মা খা। ধইনা পাতার ভর্তাডা অইছে খা।
রুমকি রেগে আগুন হয়ে বলে- তোর ভাত তুই খা মা। আমার অত গরম ভাত খাইবার সময় নাই। তুই খা, বাবাতো না খাইয়া চইলা গেল। আমারও খাওনের দরকার নাই। তুই খা, জন্মের খাওয়া খা।
খালি মুখে যাইছ না মা, কয়ডা খাইয়া যা।
খাবার না খেয়েই চলে গেল রুমকি। আমেনার মন খারাপ করে বসে থাকার সময় নেই। পেট ভরে খাওয়ারও কোনো রুচি নেই। তবে সকাল সকাল স্বামীর হাতে মার খেয়ে শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। মাথাটা খুব ব্যথা করছে। কিন্তু সেসব উপো করে আমেনাও না খেয়ে কাজ করতে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই তারও কাজে যেতে দেরি হয়ে গেছে। যে বাসায় কাজ করে তাদেরও অসুবিধায় পড়তে হয়েছে। ৮টার মধ্যে নাজমা বেগমের সকালের কাজগুলো করে দেয় সে। দেরি হলে তাদের নাস্তা খেতে দেরি হয়ে যায়। সব কাজেই দেরি হয়। তাই আমেনাকে নাজমা বেগমের ঘরে ঢোকার আগেই কাজ থেকে বিদায় করে দেয়া হয়। নাজমা বেগমের ভাষ্যÑ এর আগেও একদিন আমেনা এমন করেছিল। মাসে দু-তিন দিন কামাই করে। তার তখন খুব কষ্ট হয়ে যায়। তাই নাজমা বেগম একজন ভালো বুয়া ঠিক করেছে।
আমেনা অনুরোধ করে- আর কামাই দিমুনা মেম সাহেব। খুব জ¦র অইছিল তাই দুই দিন আইতে পারলাম না। আইজ আমার ভুলেই দেরি অইল। এমন আর অইব না।
চলে যাও অনেক কষ্ট দিয়েছ তুমি।
আমেনা চলে যায় অন্য বাসায়। সেখানে সে বহু দিন ধরে কাজ করে। সে বাসার ভদ্র মহিলা আনোয়ারা হোসেন ভালো মানুষ। গরিব দুঃখীদের কষ্ট বোঝেন। তাই আমেনা তার বুক ভরা ব্যথা নিয়ে তারই কাছে ছুটে যায়। আনোয়ারা বেগম দরজা খুলে দিয়ে মুচকি হেসে বলেন- ‘কি রে আমেনা আজ এত আগেই এসেছিস।’
আমেনা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল- আইলাম খালাম্মা। সময় পাইলাম তাই আইয়া পড়লাম।
ভালো করেছিস। সময় থাকলে বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে নে। কি হয়েছে তোর মুখটা কেমন ভারাক্রান্ত দেখাচ্ছে, কণ্ঠটাও ভারী। আচ্ছা, কপালের পাশে রক্ত লেগে আছে মনে হচ্ছে। কী হয়েছে বলত?
ওসব কিছু না খালাম্মা। গরিবের কপালই অমন। রক্তের দাগ লাগাইনা কপাল।
আজও বুঝি স্বামীর হাতের মার খেয়েছিস?
হ্যাঁ, তয় এসব নিয়া চিন্তা করবেন না। আমার অভ্যাস অইয়া গেছে। বিয়ের পর থিকা মাইর খাইতে খাইতে শরীলডাই মেলা শক্ত অইয়া গেছে। নিজেতো কোনো দিন ঠিকমতো কাজকর্ম করবার পারল না। কত কাজ জোগাড় কইরা দিলাম। কাজতো ভালা কইরা করবার পারেই না, আরো কাজের জায়গায় ঘটনা ঘটাইয়া বসে। মদ খাইয়া টাকা উড়ায়। কইলেই আমারে ধইরা মারে। তয় এইডা আমার বড় চিন্তা না। আমার চিন্তা তো অন্য খানে।
অন্য জায়গায় মানে? আরো বড় কোন সমস্যা?
হ খালাম্মা, আমার কাছে আমার মাইয়াডাই তো সব কিছু। ওরে নিয়া আমি কত্ত স্বপ্ন দেখছিলাম। আমার জীবন দিয়া অইলেও ওরে আমি যত লেখাপড়া করতে অয় করাইতাম। আর আমার মাইয়া একদিন বড় চাকরি করার পারত। না অয় বড় ডাক্তার অইবার পারত। বড় একখান কিছুতো অইবার পারতই। মানুষ চেষ্টা করলে কীনা করবার পারে তাইনা খালাম্মা।
হ্যাঁ তাইতো, তুমি ঠিক বলেছ। তোমার মেয়ে কি পড়াশোনা করেত চায় না?
খালাম্মা কী কমু আপনারে। আমার রুমকি পাঁচ কাস পাস করছে। পরীার ফল খুব ভালো অইছে। স্কুলের মাস্টাররা খুব খুশি অইছে। কিন্তু মাইয়াডা আর বড় স্কুলে ভর্তি অইল না। আমি কত পায় ধরলাম, হ্যায় কিছুতেই রাজি অইল না। অহন গার্মেন্টসে চাকরি করে। মাসে পাঁচ হাজার ট্যাকা বেতন পায়। মা বাপেরে এক ট্যাকাও ছোঁয়ায় না। মাইয়ার চাল চলনও ভালা লাগে না আমার। সাজন কোজন কইয়া যহন তহন বাইর অইয়া যায়। জিজ্ঞাস করলে কয় কাম আছে তোমরা বুঝবা না। মাইয়া আমার একখান কতাও শুনবার চায় না। আমার বড় ডর লাগতাছে। মাইয়া কোন খারাপ কাজে জড়াইয়া গেল কি না। খালাম্মা মাইয়াডা যদি একখান ভালো ছেলে দেইখা বিয়া দিতে পারতাম তাইলে আমার মনডা শান্তি পাইতো। মাইয়াডা নিয়া আমার বড় চিন্তা।
সব ঠিক হয়ে যাবে। অত চিন্তা করো না। টেবিলে দুটো পরোটা রয়েছে। সবজি আছে খেয়ে কাজগুলো শেষ করো।
ুুধায় আমেনার পেটে কষ্ট হচ্ছে। তাইতো খাবার খেতে বসে। এক টুকরো পরোটা মুখে দিতে গিয়ে তার মনে পড়ে যায় তার স্বামী, মেয়ে না খেয়ে কাজে গিয়েছে। মনে হতেই চোখ জ¦লে ভরে ওঠে। আর খেতে পারে না সে। নীরবে কাজ শেষ করে বেরিয়ে যায়। আরো দুটো বাসায় কাজ করতে হবে। দুপুর তিনটা পর্যন্ত সে মানুষের বাসায় কাজ করে। ঘরে ফিরে দেখে জমীর আলী, রুমকি দু’জনই সকালে রান্না করা খুদের ভাত খাচ্ছে। ওদের খেতে দেখে আমেনা খুশি হয়। আমেনা গোসল সেরে খাবার খেতে যায়। হাঁড়িতে লেগে থাকা অল্প কয়েকটি ভাত মুখে দিয়ে পেট ভরে পানি খেয়ে নেয় সে। তারপর ঠোঙা বানাতে বসে। ঠোঙা বানাতে বানাতে সন্ধ্যা নেমে আসে। তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে গিয়ে তিনজনের জন্য ডালভাত আর সবজি রান্না করে। রান্না হয়ে গেলে খেয়ে আবার ঠোঙা বানাতে বসে। রাতে স্বামী আর মেয়ে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে যায়। কিন্তু আমেনা একা বসে গভীর রাত পর্যন্ত ঠোঙা বানায়। শহরে বিশ-পঁচিশটি দোকানে সে ঠোঙা বিক্রি করে। সবাই তাকে ঠোঙাওয়ালি বলেই চিনে। এভাবে চলে যাচ্ছিল আমেনার ঘর সংসার।
হঠাৎ একদিন আমেনা ঘরে ফিরে অপো করছিল মেয়ের জন্য। মেয়ের ফিরতে সেদিন খুব দেরি হচ্ছিল বলে সে খুব চিন্তায় পড়ে যায়। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত আসে। রাতের শেষ হলে দিন, আর দিনেরও শেষ হয়। এমন করে সাত দিন চলে যায় রুমকি আর ফিরে আসে না। সাত দিন পর তার মৃতদেহ এক ডাস্টবিনে পাওয়া যায়। আমেনা এ শোক সইতে না পেরে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে। অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। সেই সময় তার স্বামীও ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
আমেনার চৈতন্য ফেরে। সে মুখে কথা বলতে পারে না। তবে বিছানায় শুয়ে না থেকে স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে যায়। লিখতে পড়তে জানত বলে স্বামীর সমস্যার কথাগুলো ডাক্তারকে জানাতে পারে। পরীা করে দেখা যায় জমীর আলীর দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। সৌভাগ্যক্রমে আমেনার কিডনি জমীর আলীর কিডনির সাথে ম্যাচ করে। আমেনা মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য কিছু টাকা জমিয়ে ছিল সেই টাকা আর নিজের কিডনি দিয়ে স্বামীকে সুস্থ করে তোলে।
কিছু দিন পরেই এক বিধবা মহিলা ভানুমতির সাথে জমীরের সম্পর্ক হয়। মহিলা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে চাকরি করে। দেখতে খারাপ নয় সুস্থ স্বাভাবিক। একদিন জমীর আলী আমেনাকে জানায় বোবা অসুস্থ মেয়েমানুষ নিয়া আমি সংসার করতে পারুম না। আমি ভানুমতিরে বিয়া করছি। অহন থিকা আমি তার লগেই থাকমু। তুই এইহানে একলাই পইড়া থাক। আর খবরদার ভানুমতিরে বিরক্ত করবি না। আমাগো কাছে তুই কোন দিন যাবি না এই আমি না কইরা গেলাম।
চিরতরে আমেনার কাছ থেকে চলে গেল জমীর আলী। আমেনার কথা বলার শক্তি তো হারিয়ে ফেলেছে। শুধু চোখের জলেই বিদায় দিল স্বামীকে। তার চলে যাওয়া রাস্তার দিকে অপলক চেয়ে রইল কিছুটা সময়। সে একা শুধুই একা। স্বামীকে কিডনি দেয়ার পর থেকে লোকের বাড়ি বাড়ি আগের মতো আর কাজ করতে পারে না। শরীর মন দুটোই ভেঙে পড়েছে। তবুও সে মন শক্ত করে ভাবেÑ তারতো আর কেউ রইল না। কবে মরণ হবে তারও কোনো ঠিক নেই। যে কয়দিন বেঁচে থাকবে সে কয়টা দিন নিজেরতো চলতে হবে কিছু টাকা পয়সার দরকার হবে। তাই মানুষের বাসায় কাজ করা বাদ দিয়ে শুধু ঠোঙা বানিয়ে সে নিজের খরচ চালায় এবং কিছু টাকা জমাতে থাকে। শহরে শত শত দোকান, সবাই তার বানানো ঠোঙাই পছন্দ করে। তাই সে নিরলস ঠোঙা বানানোর কাজ করে যায়।
নিজে কোনো রকমে জীবন চালায় আর টাকা জমাতে থাকে। এভাবেই চলতে থাকে তার জীবন। একসময় সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রতিবেশী এক দোকানি মাজেদা বেগম তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চায় কিন্তু সে রাজি হয়নি।
আমেনা কাগজে লিখে দেয় তার আর সময় নেই। সে পরিচিত সবার সাথে দেখা করতে চায়। সবাই অনাত্মীয় হলেও তাকে খুব ভালো বাসত। মাজেদা বেগম সবাইকে কথাটা জানায় এবং সবাইকে নিয়ে আমেনার ঘরে উপস্থিত হয়। আমেনা একটি পুঁটলি বের করে সবাইকে দেখতে বলে। আর এক টুকরো কাগজ বের করে দেয়। কাগজে তার মনের এক সুপ্ত কামনার কথা লেখা। সে বহু দিন আগে স্বপ্ন দেখেছিল যে সে সমাজের দুস্থ মানুষদের জন্য কিছু করতে চায়। তার এই একাকিত্ব জীবনে নিরলস পরিশ্রম করে অত্যন্ত সাধারণ একটি কাজ করে বেশ কিছু টাকা জমিয়েছে। এই টাকা জমাতে গিয়ে নিজে দিনে একবেলা খেয়েছে। ছেঁড়া ফাটা কাপড় পরেছে। এই টাকাটা সে এতিমখানায় দান করতে চায়। ব্যাপারটি সবাইকে জানিয়ে দেয়ার ঘণ্টাখানিক পরই আমেনা শেষ নিশ^াস ত্যাগ করে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.