ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

লাহোর প্রস্তাব : ইতিহাস ও জানা-অজানা কথা

সৈয়দ নাসরুল আহসান

২৩ মার্চ ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আজ শুক্রবার ২৩ মার্চ। ১৯৪০ সালের এই দিনে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে উপমহাদেশের মুসলমানেরা তাদের স্বাধীন আবাসভূমি অর্জনে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। লাহোরে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের ২৭তম বার্ষিক অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাবটি বিস্ময়কর ভূমিকা পালন করেছিল। অবিভক্ত ভারতে মুসলমানদের পৃথক স্থায়ী আবাসভূমি অর্জনে লাহোর প্রস্তাব মুসলমানদের মধ্যে নবজাগরণের জোয়ার ডেকে আনে।
১৯০৬ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার জন্য একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আগা খানকে স্থায়ী সভাপতি করে ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ আত্মপ্রকাশ করে। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব মহসিন উল মুলক, নবাব ভিকারুল মুলক, হাকিম আজমল খান, মাওলানা মোহাম্মদ আলীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মুসলিম লীগ ১৯৩৫ সালের পর সর্বস্তরে মুসলিম জনগণের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠে। সলিমুল্লাহসহ লীগের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অকান্ত প্রচেষ্টায় ১৯০৯ সালে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনব্যবস্থার অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল।
কংগ্রেস কখনো মুসলিম লীগের সাথে যথোচিত আচরণ করেনি। লীগ এক সময় পৃথক নির্বাচনব্যবস্থার দাবি পরিত্যাগ করতে রাজি হলেও হিন্দু নেতাদের একগুঁয়ে মনোভাবের জন্য শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছা সম্ভব হয়নি। এ তথ্য সর্বজনবিদিত যে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে মৈত্রীর সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন; কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন এবং শেষে অনুধাবন করেন, মুসলিম লীগের মাধ্যমেই মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। দুই বছর (১৯৩৭-৩৯) কয়েকটি প্রদেশে কংগ্রেস রাজত্বে তাদের স্বেচ্ছাচারিতায় মুসলমানদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে এবং তারা এইরূপ সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হন যে, স্বাধীন নিজস্ব আবাসভূমিই তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। অবশেষে ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমির দাবি তুলে ধরে। মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টির দাবি জানিয়েছিল। হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে স্থায়ী বিরোধ অবসানের লক্ষ্যে একই ধরনের প্রস্তাব বিভিন্ন সময় উপমহাদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উত্থাপন করেছিলেন। ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক আবদুল হালিম সারার ঊনবিংশ শতকে প্রথম উল্লেখযোগ্য মুসলিম বুদ্ধিজীবী, যিনি এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯১৭ সালে স্টকহোমে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে আবদুল জব্বার খায়েরী ও অধ্যাপক আবদুস সাত্তার খায়েরী (বিখ্যাত ‘খায়েরী-ভ্রাতৃদ্বয়’) ভারতকে বিভক্ত করে ‘হিন্দু ভারত’ ও ‘মুসলিম ভারত’ করার প্রস্তাব করেন। ১৯২০ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে সাপ্তাহিক জুলকারনাইন পত্রিকায় কাজী আজিজ উদ্দীন বিলগ্রামী গান্ধীকে একটি খোলা চিঠিতে প্রস্তাব দেন ভারতকে হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য দু’ভাগে বিভক্ত করার। তিনি এ জন্য বিভিন্ন জেলার নামও উল্লেখ করেন। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে মাওলানা মুরতাজা আহমেদ খান মাইকাশ লাহোরের দৈনিক ইনকিলাবে চারটি ধারাবাহিক নিবন্ধে পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানকে নিয়ে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠন করার ওপর জোর দেন। হিন্দু পরিচালিত দৈনিক পত্রিকা ‘প্রতাপ’ এর বিরোধিতায় নামে। ‘মুসলিম ভারত’ পত্রিকার সম্পাদক ফজল করিম খান ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ভারতে ইসলামের ভবিষ্যৎ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, পারস্পরিক দ্বন্দ্বের সংস্কৃতির ধারক দু’জাতির সহাবস্থান সম্ভব নয়। হায়দরাবাদের ড. সৈয়দ আবদুল লতিফ তার ’ A Federation of Cultural Zones of India’ গ্রন্থে ভারতকে কয়েকটি সাংস্কৃতিক এলাকায় বিভক্ত করার প্রস্তাব দেন, যেখানে মুসলমানদের জন্য চারটি ও হিন্দুদের জন্য ১১টি এলাকা থাকার কথা। ১৯৩৯ সালে ড. জাফরুল হাসান ও ড. আফজাল হোসেন কাদরী ‘ভারতের মুসলমানদের সমস্যা ও তার সমাধান’ শিরোনামে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি বিখ্যাত ‘আলিগড় স্কিম’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিল। এতে ভারতকে বিভক্ত করে তিনটি সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিলÑ ক. উত্তর-পশ্চিম ভারত যার মধ্যে থাকবে পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান; খ. বেঙ্গল ও সিলেট বিভাগ এবং গ. হিন্দুস্তান (ভারত)। ১৯৩৮ সালে করাচিতে সিন্ধু প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে সাংবিধানিক প্রস্তাবের প্রস্তুতি নিতে বলা হয় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগকে।
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরের মিন্টো পার্ক, বর্তমান ইকবাল পার্কে (বাদশাহী মসজিদ ও লাহোর দুর্গ সংলগ্ন) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করে, যা বিশ্বের মানচিত্র এবং উপমহাদেশের লাখ লাখ মুসলমানের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেয়।
লাহোরে মুসলিম লীগের সেই অধিবেশনে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক বিখ্যাত ‘লাহোর প্রস্তাব’ উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি চৌধুরী খালিকুজ্জামান, মাওলানা জাফর আলী খান, সরদার আওরঙ্গজেব খান, হাজী স্যার আবদুল্লাহ হারুন, নবাব ইসমাইল খান, কাজী মোহাম্মদ ঈশা, বেগম মোহাম্মদ আলী জওহর, আই আই চুন্দ্রিগড় ও ড. মোহাম্মদ আলম সমর্থন করেন। প্রস্তাবটি চার শ’ শব্দ ও চারটি অনুচ্ছেদ নিয়ে গঠিত। শেরেবাংলা এটি ইংরেজিতে উপস্থাপন করেন এবং উর্দুতে তরজমা করেন জাফর আলী খান। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উপমহাদেশের দূর-দূরান্ত থেকে আগত লক্ষাধিক লোকের সমাবেশে প্রায় দুই ঘণ্টা বক্তৃতা করেন। জিন্নাহ বলেন, ‘যদি ব্রিটিশ সরকার উপমহাদেশের জনগণের সুখ ও শান্তি অর্জনে সদিচ্ছা দেখায়, তবে ভারত বিভক্ত করে পৃথক আবাসভূমি গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগুলোকে অনুমতি দেয়া হোক। ওই ঐতিহাসিক অধিবেশনে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে যে নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন; তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেনÑ উপরিউক্ত নেতারা ছাড়াও নবাব বাহাদুর ইয়ার জং, সরদার আবদুর রব নিশতার, খাজা নাজিমুদ্দীন, আবুল হাশিম, মালিক বরকত আলী। যা হোক, সি আর দাসকে লালা লাজপত রায়ের লেখা ১৯২৪ সালের চিঠি জিন্নাহ সাহেব তার বক্তৃতায় পড়ে শোনান; যাতে লাজপত উল্লেখ করেছেন, হিন্দু ও মুসলমান দু’টি পৃথক ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তা এবং তারা কখনোই একটি জাতি হিসেবে অবস্থান করতে পারে না।’ এই চিঠির বক্তব্যগুলো সমবেত জনতা হতবাক হয়ে যায়।
বাস্তবে ভারতে উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল মুসলমানদের আবাসভূমি। তাই সেখানে তাদের নিজস্ব স্বাধীন সার্বভৌম দেশ প্রয়োজন; যেখানে তারা তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও রীতিনীতি অনুসারে জীবনযাপন করতে পারবেন। লাহোর প্রস্তাবের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ ভৌগোলিক দিক দিয়ে পাশাপাশি, এমন এলাকা নিয়ে পৃথক পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যার অঙ্গরাজ্যগুলো হওয়ার কথা স্বায়ত্তশাসিত, সার্বভৌম এবং সেই সাথে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার জন্য শাসনতান্ত্রিক নিশ্চয়তা দিতে হবে। উপমহাদেশে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রসার মূলত লাহোর প্রস্তাবেরই প্রভাব। কংগ্রেস তীব্রভাবে এর বিরোধিতায় নেমেছিল। বন্দে মাতরম, মিলাপ, ট্রিবিউনসহ হিন্দুদের পরিচালিত পত্র-পত্রিকা এ প্রস্তাবকে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ হিসেবে আখ্যা দিতে শুরু করে। অথচ লাহোর প্রস্তাবের কোথাও ‘পাকিস্তান’ শব্দটির ব্যবহার হয়নি।
১৯৪০ সালের ৬ এপ্রিল গান্ধীজী ‘হরিজন’ পত্রিকায় লেখেন, আমি মনে করি, মুসলমানেরা ভারত বিভাগের ধারণাকে মেনে নেবে না। তাদের স্বার্থেই তারা ভারত বিভাগের বিপরীতে অবস্থান নেবে। ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ একটি তত্ত্ব। শত শত বছর ধরে ভারতে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি বাস করে আসছে, কাজেই দেশ বিভাগ অসম্ভব। ‘রাজা গোপালচারিয়া বলেন, মি. জিন্নাহর ভারত বিভাগের পদক্ষেপ যেন দুই ভাইয়ের মধ্যে একটি গাভী নিয়ে বিরোধ এবং অবশেষে দুই ভাই গাভীটিকে কেটে দুই টুকরা করে ভাগ করতে যাচ্ছে।’ ইংরেজ শাসনের অবসানের সাথে সাথে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লাহোর প্রস্তাব সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ‘মাইলফলক’ হিসেবে বিবেচিত হলো। ব্রিটিশ সরকার লাহোর প্রস্তাবের ফলে উপলব্ধি করে যে, এ উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলমানদের একই রাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় রাখা নির্বুদ্ধিতার শামিল। স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র রচিত হয়েছিল লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই। তবে এই রাষ্ট্রের কাঠামোতে লাহোর প্রস্তাবের মূলনীতি লঙ্ঘিত হয়। বরং, ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আজকের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের উদ্ভব ওই লাহোর প্রস্তাবে নিহিত ছিল বলে মনে করেন।
লেখক : সভাপতি, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মেমোরিয়াল কমিটি
srahsan23@yahoo.com

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫