টাকার লোভে বন্ধুদের নিয়ে  নানী-খালাকে হত্যা
টাকার লোভে বন্ধুদের নিয়ে নানী-খালাকে হত্যা

টাকার লোভে বন্ধুদের নিয়ে নানী-খালাকে হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক

টাকার লোভে বন্ধুদের নিয়ে নানী ও খালাকে হত্যা করেছে ভাগ্নে সঞ্জীব।  পরিকল্পনা অনুযায়ী বন্ধুদের নিয়ে খালা সুজাতার বাসায় যায় সঞ্জিব। এরপর সেখানে নাস্তা পানি, আর বাংলা মদ পান করে।

গল্পচ্ছলে প্রথমে নানী বেসেথ চিরানকে (৬৫) শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ খাটের নিচে রেখে দেয়। এরপর মদ্যপ পানে অচেতন খালা সুজাতাকে কুপিয়ে হত্যা করে বাসা থেকে চলে যায় খুনীরা। আর এ কাজে সহযোগিতা করে রাজু সাংমা ওরফে রাসেল, প্রবীণ সাংমা ও শুভ চিসিম ওরফে শান্ত নামে তার তিন বন্ধু।

রাজধানীর গুলশানে কালাচাঁদপুরে চঞ্চল্যকর গারো মা-মেয়ে খুনের ঘটনায় নিহত সুজাতার বড় বোন নির্ঝরা ছেলে সঞ্জীব চিরানসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১। র‌্যাব বলছে, চারজনই খুনের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। গত বুধবার রাতে শেরপুর জেলার নলিতাবাড়ি এলাকা থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। স্টার সানডে উদযাপনের টাকা জোগাতে গারো মা-মেয়েকে খুন করা হয়েছে। এক মাস আগে সঞ্জীব ও তার তিন বন্ধু মিলে টাকা লুট এবং বাধা দিলে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান। বৃহস্পতিবার দুপুরে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

মাহমুদ বলেন, সুজাতা চিরানের পরিবারের সবাই চাকুরীজীবী। তাদের কাছে ৫/৬ লাখ টাকা থাকতে পারে বলে ধারণা করে খুনিরা। ওই টাকা লুট করতে পারলে বন্ধুদের নিয়ে আসন্ন ধর্মীয় উৎসব ইস্টার সানডে জাকজমকভাবে উদযাপন করা যাবে। এই চিন্তা থেকেই মাস খানেক আগে শেরপুর বসে তিন বন্ধুকে নিয়ে খালা সুজাতাকে হত্যার পরিকল্পনা করে ভাগ্নে সঞ্জীব। তবে খালাকে হত্যার মুহূর্তে নানী বেসেথ চিরান বাসায় চলে আসায় তাকেও হত্যা করা হয়। হত্যার পর পালিয়ে তারা শেরপুর চলে যায়। সেখান থেকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সঞ্জীব চিরান (২১) , তার বন্ধু রাজু সাংমা ওরফে রাসেল (২৪০, প্রবীণ সাংমা (১৯) ও শুভ চিসিম ওরফে শান্তকে (১৮) গ্রেফতার করে র‌্যাব-১।

মুফতি মাহমুদ খান জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১৯ মার্চ সঞ্জীব, শান্ত ও প্রবীণ ঢাকায় আসে এবং কুড়িলে তাদের আরেক বন্ধু রাজুর সঙ্গে দেখা করে। রাজুর বাসায় স্থান-সংকট থাকায় উত্তরায় তাদের আরেক বন্ধুর বাসায় রাত্রীযাপন করে। পরের দিন সকালে সঞ্জীব, শান্ত ও প্রবীণ কুড়িলে রাজুর সঙ্গে দেখা করে পরিকল্পনার কথা তাকে জানায়। পরে রাজুর বাসা থেকে একটি ছোরা নিয়ে কালাচাঁদপুরে সুজাতাদের বাসায় যায় তারা। প্রথমে রাজু ও প্রবীণ ওই বাসায় গিয়ে সুজাতা, তার মেয়ে মায়াবী ও তার মা বেসেথকে দেখে ফিরে এসে সঞ্জীবকে জানায়। এরপর তারা ৫/৬ ঘণ্টা বাইরে ঘোরাঘুরি করে বিকেল তিনটার দিকে সঞ্জীবসহ তার বন্ধুরা সুজাতার বাসায় প্রবেশ করে। সেখানে হালকা নাশতা খাওয়ার পর সঞ্জীব তার খালা সুজাতাকে ২০০ টাকা দেয় এবং দেশি মদ আনতে বলে। তখন সুজাতার মেয়ে মায়াবী তার কর্মস্থলে চলে যায়। পরে সবাই মিলে মদ পান করে। সুজাতা মদ্যপ হয়ে বিছানায় পড়ে যান। সঞ্জীব ও তার বন্ধুরা তখন চুরির প্রস্তুতি নেয়। এ সময় সুজাতার মা বেসেথ বাসায় আসেন। ফলে চুরির কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। এরপর তারা বেসেথ চিরানের সাথে গল্প করে। গল্পের একপর্যায়ে রাজু ও প্রবীণ বেসেথের পা চেপে ধরে। শান্ত বালিশ দিয়ে মুখে চাপা দেয়। এ সময় সঞ্জীব তার নানী বেসেথের গলায় ওড়না পেচিয়ে শ্বাসরোধে মৃত্যু নিশ্চিত করে। তারপর তারা মিলে লাশ খাটের নিচে ফেলে রাখে।

পরে পাশের ঘরে বেহুঁশ থাকা সুজাতার দুই পায়ের ওপর সঞ্জীব চড়ে বসে। রাজু মুখে বালিশচাপা দিয়ে ধরে। এরপর সঞ্জীব ছোরা দিয়ে শরীরে ও গলায় আঘাত করে। এসময় শান্ত উক্ত বাসা থেকে অপর একটি ছোরা নিয়ে সুজতার গলা কাটতে উদ্যত হয়, কিন্তু ছোরাটি কম ধারালো হওয়ায় সঞ্জীব তার হাতের থাকা ধারালো ছোরা দিয়ে খালা সুজাতার গলায় জখম করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। দু’জনকে হত্যার পর ঘরে খোঁজাখুঁজি করে টাকা না পেয়ে চারজনই উত্তরায় ফিরে যায়। পরে সেখান থেকে নালিতাবাড়িতে চলে যায়।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, নালিতাবাড়িতে গিয়ে ভারতে অবৈধভাবে নিয়মিত যাতায়াতকারী মোস্ত নামে তাদের পূর্ব পরিচিত একজনের সাথে যোগাযোগ করে এবং আত্মগোপনের জন্য ভারতে যাওয়া উদ্দেশ্যে নালিতাবাড়ি অবস্থান করছিল। কিন্তু এর আগেই বিষয়টি টের পেয়ে র‌্যাব তাদের গ্রেফতার করে। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে উত্তরার আব্দুল্লাহপুরে অবস্থিত একটি বাস কাউন্টারের পেছন থেকে হত্যার কাজে ব্যবহৃত ছোরাটি উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে আসামিরা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। চুরি ছাড়া হত্যাকান্ডে আর কোনো কারণ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর গুলশানের উত্তর কালাচাঁদপুর এলাকার একটি বাড়ির ৪র্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে গারো সম্প্রদায়ের বেসেথ চিরান (৬৫) ও তার মেয়ে সুজাতা চিরানের (৪০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত সুজাতার স্বামী আশীষ মানকিন বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় সঞ্জীবের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করা হয়। এরপর থানা পুলিশের পাশাপাশি ছায়া তদন্ত শুরু করে র‌্যাব।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.