সৃজনশীল নামে যা হচ্ছে
সৃজনশীল নামে যা হচ্ছে
সৃজনশীল নামে যা হচ্ছে

ক্লাসে পড়ানো হয় গাইড!

মেহেদী হাসান

রাজধানীর নামকরা একটি স্কুলের অভিভাবক সাদিয়া জানান, তার মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। এ বছর সমাপনী পরীক্ষা দেবে। সমাপনী পরীক্ষা উপলক্ষে স্কুল থেকে কয়েকটি কোম্পানির গাইড বই কিনতে বলেছে এবং তা কেনাও হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ বিষয়ে দু’টি করে গাইড বই কেনা হয়েছে স্কুলের দেয়া নামানুসারে। এ ছাড়া গণিতের জন্য আলাদা একটি প্রকাশনা সংস্থার গাইড কিনতে বলা হয়েছে। কিন্তু বইয়ের দোকানে গিয়ে জানা গেল ওই প্রকাশনা সংস্থাটি গণিতের গাইড বই আলাদা বিক্রি করে না। সব বিষয়ের পুরো সেট একসাথে বিক্রি করে প্যাকেজ আকারে। ফলে গণিতের গাইড বই কেনার জন্য বাধ্য হয়ে তাদের সব বিষয়ের গাইড কিনতে হলো।

সাদিয়া জানান, তার মেয়ে জানিয়েছে ইংরেজি ও বাংলার শিক্ষক কাসে গাইড বই নিয়ে আসেন। ব্যাকরণসহ বিভিন্ন বিষয় গাইড থেকে পড়ান এবং বাসায়ও পড়া দেন। তিনি বলেন, আমার পঞ্চম শ্রেণী পড়–য়া ছোট মেয়েটিকে এখন বোর্ডের নির্ধারিত বিনামূল্যের ছয়টি পাঠ্যবইসহ মোট ১৬টি বই পড়তে হচ্ছে।

ভাই গাইডের বিরুদ্ধে লিখবেন না : রাজধানীর আরেকটি নামকরা স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে অভিভাবকদের কাছে জানতে চাওয়া হয় সমাপনী পরীক্ষা উপলক্ষে স্কুল থেকে তাদের সন্তানদের গাইড বই কিনতে বলেছে কি না। তারা জানান, না এ ধরনের কিছু বলা হয়নি স্কুল থেকে।
এ সময় একজন অভিভাবক এগিয়ে এসে বলেন, ভাই দয়া করে গাইডের বিরুদ্ধে কিছু লিখবেন না।

সৃজনশীল আর সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে যা হচ্ছে তাতে নোট গাইড ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। গাইড আছে বলেই একটু ভরসা পাচ্ছি। ছোট ছোট শিশুদের ওপর সৃজনশীল পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। শিক্ষকরাই তো ভালো বোঝেন না। সৃজনশীল নিয়ে মহা বিপদে আছি। শিক্ষক কাসে যা বোঝান তাতে কাজ হয় না। কোচিং প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য হচ্ছি। কিন্তু তারপরও ভরসা পাচ্ছি না। দোকান থেকে নামকরা একটি প্রকাশনা সংস্থা ও শিক্ষকদের লেখা সমাপনী সহায়িকা কিনেছি সব বিষয়ের। সব গাইড খারাপ নয়। আমার মনে হয় একটি ভালো গাইড অনেক শিক্ষকের চেয়ে ভালো কাজ দেয়। যারা গাইড লিখেছেন তারা স্কুলের শিক্ষকদের চেয়ে অনেক মেধাবী এবং শিক্ষিত লোক। তারা অন্তত কিছু পড়ালেখা জানেন। স্কুলের শিক্ষকদের যে অবস্থা তাতে এসব গাইড থাকায় আমাদের জন্য অনেক সহজ হয়েছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে এ অভিভাবক বলেন, সরকার শিক্ষা নিয়ে যা করছে তাতে আমরা গাইডের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছি। এ ছাড়া উপায় নেই।
তিনি বারবার অনুরোধ করতে থাকেন ভাই গাইডের বিরুদ্ধে লিখে আমাদের বিপদে ফেলবেন না। সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে যে বিপদে আছি তাতে নতুন করে আর বিপদ বাড়াবেন না। সরকার আমাদের মেরে ফেলার অবস্থা করেছে। সন্তানের লেখাপড়া করানো বিরাট বড় ভোগান্তি আর শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জীবনে।
আরেকটি স্কুলের কয়েকজন অভিভাবক বলেন, শিক্ষকরাই তো গাইড পড়েন, কাসে গাইড পড়ান। আমরা কিনলে দোষের কী।


শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেল, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী সহায়িকার নামে বিভিন্ন ধরনের নোট গাইড সংগ্রহ করেনি পঞ্চম শ্রেণীতে এমন শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে। এ জন্য তারা দায়ী করলেন সমাপনী পরীক্ষা আর সৃজনশীল পদ্ধতিকে।
অনেক অভিভাবক জানান, সৃজনশীলের কারণে মূল বই পড়তে চায় না শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে। কারণ তারা জানে বই থেকে সরাসরি প্রশ্ন আসবে না। সৃজনশীল ব্যবস্থা ছাত্রছাত্রীদের বইবিমুখ করেছে। তারা পড়ে গাইড। কারণ নামকরা বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার গাইড থেকে হুবহু প্রশ্ন অনেক সময় তুলে দেয়া হয় পরীক্ষায়।


সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুখস্থ প্রবণতা কমানো, নকল বন্ধসহ নোট গাইড নির্ভরতা বন্ধ করা এবং কোচিং প্রাইভেট বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য থামানো। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত। আগে নোট গাইড কিনত শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পর বাংলাবাজারে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে নোট গাইড কিনছেন শিক্ষকেরা। কারণ বিষয়টি তারাও অনেকে ভালো বোঝেন না। সৃজনশীলের কারণে শিক্ষার্থীদের নোট গাইডের ওপর নির্ভরতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।


অনেক অভিভাবক এবং শিক্ষক বলেন, পঞ্চম শ্রেণী পাস করতে নোট গাইড পড়ার কথা চিন্তাই করা যায় না। আমাদের কখনো এসবের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু এখন লেখাপড়ার যে ধরন চালু হয়েছে তাতে এসবের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। ছোট ছোট শিশুদের ওপর বাড়ানো হয়েছে বইয়ের বোঝা, এত বই তারা পড়বে কখন।
সৃজনশীল কেলেঙ্কারি : সৃজনশীলের কারণে নোট গাইড নির্ভরতা নিয়ে ঘটে গেছে এক কেলেঙ্কারির ঘটনা। ২০১৬ সালের জেএসসি পরীায় ঢাকা শিা বোর্ডের বাংলা বিষয়ের সব সৃজনশীল প্রশ্ন হুবহু গাইড থেকে তুলে দেয়া হয়েছে। একাধিক গাইড থেকে প্রশ্ন তুলে দেয়া হলেও একটি কথা ছিল। সব প্রশ্ন একটি মাত্র গাইড থেকে হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে।


২০১৬ সালের ১ নভেম্বর সারা দেশে জেএসসি পরীা শুরু হয়। প্রথম দিন বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এতে ৬০ শতাংশ সৃজনশীল এবং ৪০ শতাংশ বহু নির্বাচনী (এমসিকিউ) প্রশ্ন করা হয়। সৃজনশীল অংশে মোট ৯টি উদ্দীপক (পূর্বের কমপ্রিহেনসিভ বলা যেতে পারে) তুলে ধরে প্রশ্ন করা হয়। এর মধ্যে ৮টি উদ্দীপক ও তা থেকে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে তা বাজারে খুবই পরিচিত একটি গাইড থেকে হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে। আরেকটি উদ্দীপক গাইডের সাথে না মিললেও তা থেকে করা চারটি প্রশ্নের মধ্যে তিনটি প্রশ্ন হুবহু ওই একই গাইড থেকে তুলে দেয়া হয়েছে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। ৯টি উদ্দীপকের মধ্যে চারটি উদ্দীপক আবার পূর্বের বিভিন্ন পরীক্ষায় এসেছে। এ ছাড়া এমসিকিউ প্রশ্নেরও বেশির ভাগ গাইড থেকে তুলে দেয়া হয়েছে।


২০১০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় দু’টি বিষয়ের মাধ্যমে সর্বপ্রথম দেশে চালু করা হয় সৃজনশীল পদ্ধতি। এরপর ধীরে ধীরে বাড়ানো হয় এর আওতা। ২০১২ সালে এইচএসসিতে চালু হয় সৃজনশীল। একই বছর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় শতকরা ১০ ভাগ সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সমাপনী পরীক্ষায় ৮০ ভাগ প্রশ্ন করা হয় সৃজনশীল পদ্ধতিতে। আর এ বছর নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য সমাপনী পরীক্ষায় শতভাগ প্রশ্ন সৃজনশীল পদ্ধতিতে করা হবে বলে ইতোমধ্যে নোটিশ জারি করা হয়েছে জাতীয় প্রাথমিক শিা অ্যাকাডেমির (নেপ) পক্ষ থেকে।


অপর দিকে ২০১০ সালে এসএসসিতে সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পর থেকে বর্তমানে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সব বিষয় সৃজনশীলের আওতায় আনা হয়েছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.