আবার পুতিন
আবার পুতিন

আবার পুতিন

আহমেদ বায়েজীদ

প্রধান বিরোধী প্রার্থী অ্যালেক্সি নাভালনিকে নির্বাচনের বাইরে রেখেই আরো এক মেয়াদের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন ভ্লাদিমির পুতিন। গত রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলেও ছিল না অবাক করার মতো কোনো কিছু। ধারণা মতোই পুতিন জিতেছেন বড় ব্যবধানে। তবে রাশিয়ার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে বহুদিন ধরেই। অবশ্য পুতিনের জনপ্রিয়তাও আছে দেশটিতে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিশ্বে প্রভাব বৃদ্ধিসহ অনেক কারণেই রুশ নাগরিকদের বড় একটি অংশ মনে করছে পুতিনই রাশিয়াকে সুপার পাওয়ার হওয়ার পথে নিয়ে চলছেন। আবার পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বিরোধের কারণে ক্ষতির বিষয়টি বড় করে দেখছেন পুতিন বিরোধীরা। তারা চান পরিবর্তন।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব খুব সাবধানী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পুতিনের বিজয়ী হওয়ার খবরে। ওয়াশিংটন, লন্ডন যে বিষয়টি খুব ভালোভাবে নিচ্ছে না সেটিও স্পষ্ট। তা যাই ঘটুক রাশিয়ায় যে পুতিনের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে সেটি অনেকটাই নিশ্চিত।

গোয়েন্দা জগত থেকে রাজনীতিতে আসা পুতিনে উত্থানের গল্প হার মানায় সিনেমাকেও। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির বৈদেশিক শাখার কর্মকর্তা হিসেবে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয় তার। গোয়েন্দা জীবন থেকে অবসর নেয়ার পর সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়র আনাতোলি সোবচাকের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন পুতিন। তরতর করে উঠতে থাকেন একের পর এক ধাপ। অনেকেই বলেন যে, কেজিবির মধ্যম সারির কর্মকর্তার পদ থেকে জাতীয় রাজনীতির প্রথম সারিতে পুতিনের আগমনের পেছনে পুরো কৃতিত্ব সোবচাকের। সোবচাকের নগর প্রশাসনে কাজ করার পর ১৯৯৬ সালে যোগ দেন রাশিয়া ফেডারেশনের প্রথম প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের প্রশাসনে।

১৯৯৯ সালের আগস্টে নিযুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। চার মাস পর ডিসেম্বরে ইয়েলৎসিনের পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে রাশিয়া ফেডারেশনের যে পুতিন যুগের সূচনা হয়, তা চলছে এখনো। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট পদে থেকেই ২০০০ সালের নির্বাচনে জেতেন। পুনর্নির্বাচিত হন ২০০৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে। রাশিয়ার সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়া যায় না। তাই নিজে প্রার্থী হতে না পারায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে পুতিন তার পছন্দের রাজনীতিক দিমিত্র মেদভেদেভকে প্রার্থী করেন। মেদভেদেভের সরকারে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন নিজে। মূলত এ সময়টিতেও পুতিনই রাশিয়াকে শাসন করেছেন বলে মনে করা হয়।

২০১২ সালের নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর থেকে বাড়িয়ে ছয় বছর করা হয়। আবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন পুতিন। ২০১৭ সালে শেষ হয় তার তৃতীয় মেয়াদ। আর গত রোববারের নির্বাচনে জিতে শুরু হতে যাচ্ছে চতুর্থ মেয়াদের পুতিন যুগ, যা চলবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। বর্তমান নিয়মে ২০২৪ সালের নির্বাচনে (পর পর তিনবার) প্রার্থী হতে পারবেন না পুতিন। তবে রাশিয়ার রাজনীতিতে তার যে অবস্থান তাতে এই মেয়াদের মধ্যেই সংবিধান থেকে মেয়াদের এই সীমাবদ্ধতা সংক্রান্ত ধারাটি তুলে দিলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। মাত্র কয়েকদিন আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একই কাজ করে নিজের আজীবন ক্ষমতায় থাকার পথ উন্মুক্ত করেছেন। পুতিনও সেই পথেই হাঁটতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিউ ইয়র্কের সিরাকিউস ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্রেইন টেইলর মনে করেন, পুতিনের ক্ষমতা স্থায়ী করতে রাশিয়ার সংবিধান পরিবর্তিত হতে পারে অথবা সংবিধান ঠিক রেখে অন্য কোনো বিকল্প কৌশলে তার শাসন দীর্ঘায়িত করার ব্যবস্থা হতে পারে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে যা করা হয়েছিল।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহণের পর থেকেই ক্রমেই নিজের অবস্থান সুসংহত করেছেন সাবেক এই কেজিবি এজেন্ট। সেই সাথে ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও আছে। সমালোচকেরা বলছেন, দেশটিতে মুক্ত গণতন্ত্র নেই সেটিই শুধু নয়, পুতিন যুগ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্নভাবে বিরোধীদের রাজনীতির মূল অঙ্গন থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। যার বড় উদাহরণ অ্যালেক্সি নাভালনি। রাশিয়ায় পুতিন বিরোধীদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় নেতা নাভালনি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ভাষায় ‘পুতিন যাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করেন’। এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে অংশ নিতে পারেননি।

পুতিন প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় সমালোচক হওয়ার কারণেই তার ওপর এই খড়গ নেমেছে বলে দাবি তার সমর্থকদের। তবে রুশদের মধ্যে পুতিনের জনপ্রিয়তাও কম নয়। বিশেষ করে তরুণেরা দেশের নেতৃত্বে পুতিনকেই চান বলে জানা গেছে বিভিন্ন জরিপে। পুতিন যুগে রাশিয়ার নাগরিকদের আর্থিক অবস্থা উন্নত হয়েছে। দারিদ্রের হার ২৮ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১৩ শতাংশে। দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি লোক এখন ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক। নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও বেড়েছে অনেক। তবে ২০০০ সালের পর থেকে রাশিয়াকে যেভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে তার পুরনো অবস্থান ফিরে পাওয়ার পথে নিয়ে চলেছেন- সেটিই তার জনপ্রিয়তার মূল কারণ।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘদিন নিজেদের ছায়া হয়েই ছিল, ভøাদিমির পুতিন ক্ষমতায় আসার পর ব্যাপক সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। গত ১৮ বছরে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে বহুগুণ। কিছু আগ্রাসী পদক্ষেপও নিয়েছে এ সময় রাশিয়া, যা আত্মবিশ্বাস ও ক্ষমতার কথাই প্রমাণ করে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধ করাকে পুতিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার গোয়েন্দারা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে বলে অভিযোগ আছে। এ ঘটনা নিয়ে দেশটির সাথে পাল্টা-পাল্টি কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে তদন্তও চলছে বিষয়টি নিয়ে। পুতিনের এসব পদক্ষেপের প্রভাব ভোটাদের মধ্যে কতটা তার প্রমাণ মেলে তাদের কথায়। ভোটের দিন গেলেনা জাখারোভা নামের এক ভোটার বিবিসিকে বলেন, আমরা পুতিনের সময় উন্নত জীবনযাপন শুরু করেছি, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ বাড়ছে আমাদের। রাশিয়া অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। আমরা আবার জেগে উঠছি’। দ্রিমিত্রি নামে আরেক ভোটার পুতিনকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিক বলে দাবি করেন।

তবে এসব কর্মকাণ্ডের ফলও ভোগ করতে হয়েছে মস্কোকে। ক্রিমিয়া দখলের পর থেকে রাশিয়ার ওপর কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো। যা দেশটির ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুতিনের নতুন মেয়াদেও পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক শীতল থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ইউরোপীয় নেতারা তো বলেই দিয়েছেন, মস্কোর সাথে তাদের সম্পর্ক সহজ হবে না। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে রাশিয়া ও ব্রিটেনের সাবেক ডাবল এজেন্ট সের্গেই স্ক্রিপালকে নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ ওঠে রাশিয়ার বিরুদ্ধে।

লন্ডন-মস্কো সম্পর্কের বড় রকমের অবনতি হয়েছে এই ইস্যুতে। তবে নির্বাচনে জেতার পর পুতিন তার বক্তৃতায় বুঝিয়ে দিয়েছেন এসব অভিযোগ তিনি থোরাই কেয়ার করেন। পশ্চিমাদের সাথে মস্কোর সম্পর্ক কেমন হবে তারও একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় পুতিনের এ বক্তৃতা থেকে।

একনজরে পুতিন

১৯৫২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের লেলিনগ্রাদে(বর্তমানে সেন্ট পিটার্সবার্গ) জন্ম পুতিনের। বাবা ভ্লাদিমির স্প্রিদোনোভিচ পুতিন ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। সোভিয়েত বাহিনীর হয়ে অংশ নিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। সেন্ট পিটার্সবাগ স্টেস ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে স্নাতক করে ১৯৭৫ সালে পুতিন যোগ দেন কেজিবিতে। আশির দশকে কেজিবির হয়ে অনুবাদকের ছদ্মবেশে কাজ করেছেন পূর্ব জার্মানিতে। একই পেশায় থেকেই কাজ করেছেন সেন্ট পিটার্সবাগ স্টেস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। আসলে এখানে তার মূল দায়িত্ব ছিলো ছাত্রদের মধ্য থেকে কেজিবির জন্য লোক বাছাই করা। এসময় ঘনিষ্ঠতা হয় তার সাবেক শিক্ষক আনাতোলি সোবচাকের সাথে। ১৯৯১ সালে মস্কো অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় পুতিন অবসরে যান লেফট্যানেন্ট কর্নেল হিসেবে। সোবচাক মেয়র হলে পুতিনকে আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। সেই শুরু রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। ব্যক্তিগত জীবনে দুই মেয়ের জনক পুতিনের স্ত্রী লুদমিলার সাথে বিচ্ছেদ হয় ২০১৩ সালে। রুশ, জার্মান ও ইংরেজিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় পারদর্শী তিনি। জুডোতে ব্ল্যাকবেল্টধারী পুতিন আইস হকি, মার্শাল আর্ট, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার ও শিকারে দক্ষ। ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিনের পত্রিকার ‘বছরের সেরা ব্যক্তিত্ব’ ও ২০১৫ সালে সবচেয়ে ‘প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব’ এবং ফোবর্স ম্যাগাজিনের ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত টানা সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব মনোনীত হয়েছেন। বিরোধীদের দাবি, পুতিন অত্যন্ত ধনী ব্যক্তি হলেও সরকারি কাগজপত্রে সম্পদের পরিমাণ কম দেখানো হয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.