রাশিয়ান মুসলিম
রাশিয়ান মুসলিম

রাশিয়ান তিন নওমুসলিম বোনের কথা

মো: শরিফুর রহমান

সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল একটি একদলীয় সাম্যবাদী রাষ্ট্র, যার অস্তিত্ব ছিল ১৯২২ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯১ সালে ভেঙে যাবার আগে পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত সরকারের পতনে, ১৫টি নতুন প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।

সোভিয়েত আমলে রাশিয়ায় কোনো ধর্মকেই বরদাশত করা হতো না। কিন্তু কমিউনিজমের পতনের পর অর্থডক্স খ্রিস্টান এবং ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটেছে। বাস্তবতা হলো, দেশটিতে ইসলামি জাগরণ দেখা যাচ্ছে। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাশিয়ান অর্থডক্স খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী। রাশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মূলত অভিবাসীদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে। তা সত্ত্বেও দেশটিতে মুসলমানদের বিদেশি বা বহিরাগত হিসেবে গণ্য করা হয় না।

বর্তমানে রাশিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য এবং সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। সর্বশেষ পরিচালিত আদমশুমারিতে দেশটির নাগরিকদের ধর্ম সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের জবাব জানতে চাওয়া হয়নি।

রাশিয়ান মুসলমানদের সংখ্যা গণনা করা হয় ঐতিহ্যগতভাবে মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তদের সব সদস্যসংখ্যা যোগ করার মাধ্যমে। এসব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে তাতার, বাশখির ও চেচেন।
সর্বশেষ তথ্যে জানা যায় রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ২০-২৫ শতাংশ মুসলিম।দেশটিতে প্রতিদিনই ‘নতুন মুসলমান’ যোগ হচ্ছেন।

ককেশাস স্টাডিজ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কেন্দ্রের সিনিয়র সহকর্মী নিকোলাই সিলাভে বলেন, ‘এখানে বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ বিভিন্ন ধর্ম ছেড়ে ইসলাম কবুল করেছেন। এখনো করছেন। এক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন প্রচার হয় না। কিন্তু কোনো মুসলমান গোঁড়া খৃস্টধর্মে যুক্ত হলে সেই ঘটনা রাশিয়াজুড়ে ব্যাপক প্রচার পায়।’

রাশিয়ার একটি গণমাধ্যম ‘রাশিয়া বিয়ন্ড দ্য হেডলাইনস’-এ তিন নও মুসলিম বোনের ইন্টারভিউ প্রকাশ করা হয়েছে। সেই ইন্টারভিউ থেকে নওমুসলিম তিন বোনের বক্তব্য তুলে ধরা হলো-

ভ্যালেরিয়া, বয়স ২২ 
২০১১ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘আমি একটি খৃস্টান পরিবারে বড় হয়েছি। মুসলিম হওয়ার সিদ্ধান্তে আমার পরিবার দারুণ মর্মাহত হয়। প্রথমে তারা এ সম্পর্কে খারাপ কিছু চিন্তা করেছিল। তারা বিশ্বাস করতেন, আমি ভবিষ্যতে বোমা মেরে যানবাহন উড়িয়ে দেব।’

ভ্যালেরিয়া তার ছবি অস্পষ্ট করে দিতে বলেছিল
তিনি বলেন, ‘আমি পরিবারের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। তারা আমার পছন্দকে সম্মান জানিয়েছে। বিশেষ করে মায়ের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, তিনি অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ের মধ্যেই আমার সিদ্ধান্তকে সহজে গ্রহণ করে নেন। এমনকি আমার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছ থেকে মা আমাকে সুরক্ষিত রেখেছেন।
ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘মুসলিম হওয়ার পর আমি ইসলাম বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করি। নিয়মিত নামাজ শুরু করি। দুই মাস পর থেকে হিজাব পরা শুরু করি। এরপর আমি আমার হবু স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি একজন জাতিগত তাতার। তার পরিবার ইসলাম মেনে চলে না। শেষে আমরা বিয়ে করি। আমরা আমাদের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করি।’

ওলেয়ানা, বয়স ৩০ বছর
২০০৯ সালে তিনি মুসলিম হয়েছেন।
ওলেয়ানা বলেন, ‘ইসলামের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আমার আকর্ষণ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক ধারণা পাই। আরবি শিখি। সেখানে আমার অনেক মুসলমান বন্ধু ছিল। বর্তমান সমাজে মুসলিমদের নিয়ে স্বাভাবিকভাবে যা বিবেচনা করা হয়, তাদের সবার আচরণ ছিল তা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। এ কারণেই আমি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই। আমার বাবা-মা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা আমার পছন্দ বুঝতে পেরেছিল ।

তিনি বলেন, নামাজের সময় নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেকে নেই। প্রথমে রোজা রাখাটাও আমার জন্য কঠিন ছিল। গত তিন বছরে এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ইসলাম সম্পর্কিত গৎবাঁধা কিছু বিষয় নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, ইসলাম একটি নিষ্ঠুর ধর্ম। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে এমন মতের বিরোধিতা করি। বিশ্বাস করি, সকল ঐশ্বরিক শিক্ষা সুমহান কল্যাণ এবং ভালোবাসা দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে।’
ওলেয়ানা বলেন, ‘ইসলামে কথিত গৎবাঁধা অনেক বিষয় আছে। যেমন, মুসলমান কর্তৃক কাফের হত্যা, প্রাণিজবাই, ও অমুসলিমদের গ্রহণ না করা ইত্যাদি। এই মনোভাবের কারণ মূলত অজ্ঞতা। আপনি কিছু বুঝতে না পারলে কিংবা কোনো বিষয়ে ভয় পেলে আপনার উচিত, সেই ভয় বাস্তবসম্মত কিনা তা খুঁজে বের করা। আমি মনে করি, ধর্মের সঠিক অনুশীলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সচেতনতা বাড়ানোই তাদের এই ভয় দূর করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।’

জয়নাব ওরফে এলেনা, বয়স ৫৫ 
২০০৬ সালে তিনি মুসলিম হয়েছেন।
জয়নাব বলেন, ‘এটি ছিল ৯০-এর দশকের শেষের দিক। আমার স্বামীকে নিয়ে পর্যটক হিসেবে আমরা মিসর সফর করি। কোনো মুসলিম দেশে এটিই ছিল আমার প্রথম সফর। সেখানে আমি সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন মানসিকতার মানুষ দেখেছি। এই সংস্কৃতিতে মগ্ন থাকার ফলে আমি আরব বিশ্বের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি। আমি কোরআন শরিফ অধ্যয়ন শুরু করি।’

তিনি বলেন, ‘৪০ বছর বয়সে আমি আমার স্বামীকে বললাম, আমি মুসলিম হতে চাই। আমার স্বামী এবং সন্তানরা আমার মনোভাব বুঝতে পেরে আমার সিদ্ধান্তে শান্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আমার মা বিষয়টি অতটা সহজভাবে মেনে নেয়নি। মূল সমস্যা ছিল, মাথায় হিজাব পরা নিয়ে। পরিস্থিতি এখন ঠিক হয়ে গেছে। এখন আমার মা আমার জন্য হালাল খাদ্য ক্রয় করেন। চার বছরের ব্যবধানে আমার বড় মেয়েও মুসলিম হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ইসলাম কবুল করার কয়েক দিন পরই আমি বুঝতে পারলাম, আমার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তখন আমি আমার এলেনা নাম পরিবর্তন করে একটি মুসলিম নাম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেই। আমার মুসলিম নাম হয় জয়নাব।

জয়নাব বলেন, ‘আমি ইংরেজি এবং জার্মান কারিগরি অনুবাদক হিসেবে কাজ করি। আমি হিজাব পরা শুরু করলে আমার সহকর্মীরা আমার সঙ্গে একটু ভিন্ন রকম আচরণ শুরু করেন। একটি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে এমন আচরণে আমি খুব কষ্ট পাই। ওই সময় আমি খুবই মর্মাহত ছিলাম। দুই মাস পর আমি প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য একটি ফার্ম থেকে চাকরির প্রস্তাব পাই। ওই একই কাজে তারা আমাকে আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেতন অফার করে। আমি তাদের বলি, কর্মক্ষেত্রে আমি মাথায় হিজাব পরতে পারব কিনা। জবাবে তারা জানায়, এটি কোনো সমস্যা নয়। তাদের প্রয়োজন দক্ষতা এবং কাজ।’

এই নওমুসলিম বোন আরো বলেন, ‘নজির সৃষ্টির মাধ্যমে আমি ইসলাম সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে চাই। মানুষ ইসলাম সম্পর্কে দীর্ঘ বক্তৃতা শুনতে চায় না। সেই সময় তাদের হাতে নেই। তারা শুধু আপনার কাজকেই বড় করে দেখে। আমি বলব, মুসলিমরা প্রকৃত অর্থেই অনেক ভালো।’
রাশিয়া বিয়ন্ড দ্যা হেডলাইনস অবলম্বনে

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.