ঢাকা, সোমবার,২৩ এপ্রিল ২০১৮

প্রকৃতি ও পরিবেশ

সবুজায়নের কোমল ছোঁয়া পাচ্ছে না রাজধানীবাসী

সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ

২১ মার্চ ২০১৮,বুধবার, ১৫:২৩


প্রিন্ট
গজারি বন

গজারি বন

ঢাকাকে ঘিরে এখন সারি সারি গাছপালা বা সবুজ বনবনানি নেই। ইট-পাথরের যান্ত্রিক এ নগরীতে এখন আছে শুধু বিষবাষ্প। শহরের চার দিকে সারি সারি ইটভাটা আর কলকারখানা, মরা খালগুলো শুধুই নর্দমা আর ময়লার ভাগাড়। বিশুদ্ধ অক্সিজেনের বদলে বায়ুমণ্ডল দখলে নিয়েছে সিসাযুক্ত বিষাক্ত বাতাস। উন্মুক্ত স্থানগুলো দখল করেছে দূষিত কঠিন ও তরল বর্জ্য। সব মিলিয়ে এ যেন এক দুঃসহ নাগরিক-জঞ্জাল।

রাজধানীর বিভিন্ন অংশের নামকরণ হয়েছে সবুজ-কোমল প্রাকৃতিক পরিবেশের নামে। যেমন- বনানি, নিকেতন, নিকুঞ্জ, বাগানবাড়ী, সবুজ কানন, মায়াকানন প্রভৃতি। যখন নাম দেয়া হয়েছিল সে সময় এলাকাগুলোর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যও ছিল সে রকম। কিন্তু এ এলাকাগুলোতে এখন প্রকৃতির ছোঁয়া দুষ্প্রাপ্য। নগরায়নের নামে নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংস করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসন। একসময় এই ঢাকার পাশেই গাজীপুরে ছিল দেশের সর্বাধিক বিস্তৃত গজারি বন; কিন্তু শিল্পায়নের এ যুগে ধীরে ধীরে উজাড় হয়ে যাচ্ছে বন। এহেন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই আজ পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বন দিবস।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন বন বা বৃক্ষায়ন নগরবাসীর ফুসফুস হিসেবে কাজ করে। ঢাকার বাসিন্দারা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর সে জন্য এ নগরী দিন দিন যেমন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে তেমনি বাসিন্দারা আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগব্যাধিতে। তা ছাড়া গাছপালার বা বৃক্ষায়নের অভাবে ভূগর্ভে পানিও রিচার্জ হচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এক হেক্টর বনভূমি বছরে ১৮ লাখ গ্রাম কার্বন গ্রহণে সক্ষম। ঢাকা সিটি করপোরেশনের এক সমীক্ষা অনুযায়ী ২০ শতাংশের বিপরীতে এ নগরে সবুজ বনভূমি রয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। অপর দিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নাগরিকদের সুস্থতায় একটি শহরের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সর্বোচ্চ ৯ বর্গমিটার সবুজের আচ্ছাদন থাকা দরকার, যা ঢাকায় রয়েছে ২ বর্গমিটারের কম। পর্যাপ্ত গাছপালা না থাকায় ঢাকায় মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বিরাজ করছে এবং তা ক্রমেই বাড়ছে। ভবনের অভ্যন্তরেও সহনীয় তাপমাত্রার চেয়ে এটি অন্তত ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

এ ব্যাাপারে দুর্যোগবিষয়ক গবেষক প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা ‘স্বপ্ন যখন সবুজ ঢাকা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধের বিভিন্ন গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, একটি ৯ দশমিক ৬ মিটার গাছ কমপক্ষে ৮ শতাংশ হিটিং পুলিং লোড কমাতে সক্ষম। পর্যাপ্ত বৃক্ষ রোপণ করা গেলে শহরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত বৃক্ষায়ন করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে তীব্র পানিসঙ্কট দেখা দেবে। পাশাপাশি ভূভাগ দেবে যাওয়ার আশঙ্কা তো আছেই। তিনি আরো বলেন, ঢাকায় জনসংখ্যা বাড়ছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে উত্তোলন হচ্ছে ভূ-অভ্যন্তর থেকে প্রচুর পানি। এতে নামছে পানির স্তর। আইডব্লিউএমের এক গবেষণায় বলা হয়, প্রতি বছর গড়ে অন্তত ১০ ফুট পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এর বিপরীতে রিজার্ভের পরিমাণ সামান্য।

বৃক্ষায়নে রাজধানীর চিত্র : শাজাহানপুর থেকে ফকিরেরপুল রাস্তা। কয়েক দিন আগেও এখানে নানা জাতের গাছ সড়কের মধ্যে শোভিত ছিল। মাঝে অনেক নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি ছিল রঙচঙ লাগানোর নানা আয়োজন। এ সড়কদ্বীপ বা রাস্তার মাঝে অনেক গাছই এখন উধাও। নতুন করে ড্রেন নির্মাণ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সেবা সংস্থা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এখন অনেক গাছ নেই। এমনকি অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িতে ফুটপাথ ও সড়কদ্বীপে গাছের শিকড়ও কেটে ফেলা হচ্ছে। অনেক গাছের গোড়া ইট-সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দেয়া হচ্ছে, যা পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে না। এক দিকে সবুজ বনায়নের চেষ্টা অন্য দিকে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নের নামে গাছ হত্যা। ফলে সবুজ বনায়নের ফল পাচ্ছে না নগরবাসী। ঢাকার অন্যতম সবুজ এলাকা ছিল উত্তরা; কিন্তু সড়ক বর্ধিতকরণের নামে যুগ যুগের পুরনো শত শত গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।

নিসর্গপ্রেমিক তরুপল্লবের সাধারণ সম্পাদক মোকারম হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদেশে একটি নগরে কত ধরনের, কোন প্রজাতির গাছ পালা থাকে তার একটা হিসাব থাকে। কোথায়ও কোনো গাছ মরে গেলে সেখানে দ্রুত প্রতিস্থাপন হয়। তিনি বলেন, ঢাকাকে বাহ্যিক, পরিবেশ ও প্রতিবেশগতভাবে সুন্দর ও সুস্থভাবে গড়ে তুলতে অন্যান্য বিষয়ের মতো বৃক্ষায়নেও গুরুত্ব দিতে হবে এবং তা হতে হবে সুপরিকল্পিতভাবে। লাগাতে হবে দেশীয় প্রজাতির ফুল-ফল ও দৃষ্টিনন্দন গাছপালা। কেননা নগরে পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাব রয়েছে। তাই ঢাকাকে ঘিরে নিতে হবে ভিন্ন পরিকল্পনা।

অপর দিকে প্রকৌশলী সুবীর সাহা মনে করেন, শহরের ভেতরে বড় বড় গাছপালা লাগানোর সুযোগ কম। তাই ঢাকার চার পাশে যে বেরিবাঁধ, নদীতীর এবং বাঁধসংলগ্ন এলাকা রয়েছে সেখানে ব্যাপক বৃক্ষায়ন করতে হবে। এ ছাড়া যেসব স্থানে নি¤œ জলাভূমি রয়েছে সেখানে টিকে থাকতে পারে তেমন জলজ উদ্ভিদ, যা জল ও স্থল উভয় পরিবেশেই টিকতে পারে এমন গাছ লাগাতে হবে। ঢাকার মধ্যে গাছ লাগানোর সুযোগ কম থাকলেও বড় সড়কের দুই ধার ও সড়কদ্বীপে লতাগুল্ম জাতীয় বিশেষ করে কাঠটগর, পলাশ, জবা, করবী, মহুয়া প্রভৃতি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে জারুল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, সোনালী, অর্জুন, নিম, বকুল, দেবদারুর মতো গাছ লাগালেও পরিবেশ পরিস্থিতি অনেকাংশে সহনীয় হয়ে উঠবে।

সবুজায়ন না থাকার ক্ষতি : পর্যাপ্ত সবুজ না থাকায় এবং ঢাকার চার পাশের ইটভাটা, যানবাহন, শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, ধুলা ও যত্রতত্র উন্মুক্ত ডাস্টবিন থাকায় দিনে দিনে বাড়ছে নগরীয় বায়ুদূষণের মাত্রা। গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট অনুযায়ী বায়ুদূষণের দিক দিয়ে সবচেয়ে নিচের দিকে অবস্থান বাংলাদেশের। বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ের চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি। প্রতি কিউবেক মিটারে এয়ার বর্ন রেট পার্টিকুলেট ম্যাটারের (বাতাসে সহনীয় পদার্থ) পরিমাণ এ শহরে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম, সেখানে সহনীয় মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। বাতাসে কার্বনের পরিমাণ সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ২৯০ থেকে ৩০০ পিপিএম (পার্ট পার মিলিয়ন) সেখানে ঢাকার বাতাসে কার্বনের মাত্রা ৩৫০ পিপিএম।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন নয়া দিগন্ত বলেন, নগরে পরিকল্পিত বৃক্ষায়ন হলে নগরবাসী ফুসফুস তাজা থাকবে। পর্যাপ্ত গাছপালা না থাকায় নগরে বায়ুদূষণের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুস ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তা ছাড়া মানুষের জন্য যে পরিমাণ অক্সিজেন দরকার, তা-ও পাওয়া যাচ্ছে না গাছের অভাবে।


দূষিত নগরী ঢাকা : ইউএস এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সির মতে ঢাকা হলো বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর মধ্যে চতুর্থ। স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশজ ডিপার্টমেন্ট অব এনভায়রনমেন্ট দেখাচ্ছে যে, বাতাসের গুণগত মানের সূচক ঢাকায় গত ১১ মার্চ ছিল ৫০১ স্কোর। একই দিনে এ স্কোর গাজীপুরে ছিল ৩৩৮ ও নারায়ণগঞ্জে ছিল ৩০৮। দেশে সব শহরের মধ্যে মার্চে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ রেকর্ড করা হয় নারায়ণগঞ্জে। সেই স্কোর ছিল ৫৩৮। চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক মওসুমে বাতাসে সাধারণত ধুলোবালির পরিমাণ অন্য সময়ের তুলনায় ৫ গুণ বৃদ্ধি পায়।


আর এমনই বাস্তবতায় আজ পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বন দিবস। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য ফরেস্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবল সিটি’স বা ‘সবুজ বনসমৃদ্ধ নগর’। জাতীয়ভাবে দিবসটি উদযাপনের জন্য বন অধিদফতরের হৈমন্তি মিলনায়তনে সকালে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এতে প্রধান অতিথি থাকবেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। এ ছাড়া উপস্থিত থাকবেন- মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী ও স্থাপত্য অধিদফতরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির। অনুষ্ঠানে সভপতিত্ব করবেন বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ সফিউল আলম চৌধুরী।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫