বাংলাদেশে পাটচাষের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশে পাটচাষের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশে পাটচাষের ভবিষ্যৎ

এবনে গোলাম সামাদ

যাকে বলে উদ্ভিদবিদ্যা বা বোটানি, তার উদ্ভব কৃষিকাজ করতে গিয়ে হয়নি। এর উদ্ভব হয়েছিল কবিরাজদের হাতে। তারা চেয়েছেন ভেজষ উদ্ভিদের বর্ণনা দিতে। এই বর্ণনা দিতে গিয়েই উদ্ভব হয়েছে উদ্ভিদবিদ্যার। এ দেশে ঔষধি উদ্ভিদের বর্ণনা কবিরাজেরা দিয়েছেন কবিতায়। তাই তারা নাম পেয়েছিলেন ‘কবিরাজ’। কিন্তু ইউরোপে যারা ভেষজ উদ্ভিদের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন, তারা পরিচিত হয়েছেন ‘হার্বালিস্ট’ হিসেবে। উদ্ভিদবিদ্যা এ দেশে এখন যেভাবে পড়ানো হয়, তার সূত্রপাত ঘটেছে ব্রিটিশ শাসনামলে। এই উপমহাদেশের, বিশেষ করে বাংলাদেশের গাছপালা নিয়ে প্রথম বই লিখেছেন উইলিয়াম রক্্সবার্গ (William Roxburg, 1751-1815)। রক্্সবার্গ ছিলেন একজন স্কটিশ চিকিৎসক। তিনি স্কটল্যান্ড থেকে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির চিকিৎসক হিসেবে চাকরি নিয়ে প্রথম আসেন দক্ষিণ ভারতে। সেখান থেকে আসেন কলকাতায়। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল এই উপমহাদেশের গাছপালা সম্পর্কে গবেষণা। একপর্যায়ে রক্্সবার্গকে ইস্ট-ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ কলকাতার পার্শ্ববর্তী শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের কিউরেটর পদে নিযুক্তি প্রদান করে (১৭৭৩ সালে)। রক্্সবার্গের সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হলো ‘ফ্লোরা ইনডিকা’ (Flora Indica)। বইটি তার মৃত্যুর পর ১৮৩২ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়। ‘ফ্লোরা ইনডিকা’ গ্রন্থে তিনি প্রায় দুই হাজার ৫৪২টি গাছের বিবরণ দিয়েছেন। বাংলাদেশে পাটচাষ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রক্্সবার্গের কথা বলছি। কেননা, তিনিই প্রথম পাটকে একটি অর্থকরী ফসল হিসেবে আবাদ করার সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করতে বলেন।

১৭৯০ সালে রক্্সবার্গ প্রথম স্কটল্যান্ডের ডান্ডি (Dundee) শহরে ১০২ টন পাটের আঁশ পাঠান পরীক্ষামূলকভাবে তা দিয়ে চট বুনবার জন্য। ডান্ডি শহর ছিল তিসির আঁশ (মসিনা) দিয়ে বস্ত্র বুনবার জন্য বিখ্যাত। আমাদের দেশে আমরা তিসির (Linum usitatissimum) আবাদ করতাম কেবল তিসির বিচি থেকে তেল পাবার জন্য; তিসি গাছের ছাল থেকে আঁশ পাবার জন্য নয়। ব্রিটেনের সাথে রাশিয়ার বাধে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (১৮৫৪-১৮৫৬ সাল)। এ সময় রাশিয়া থেকে ব্রিটেনে তিসির আঁশ আসা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ডান্ডিতে আরম্ভ হয় পাটের আঁশ দিয়ে চট তৈরি। এভাবে পাট হয়ে ওঠে একটি অর্থকরী ফসল, যা এটা আগে ছিল না। পাটের আঁশ দিয়ে কৃষকেরা দড়ি বানাতেন। কখনো কখনো বানাতেন কম মোটা দড়ি, যা দিয়ে তারা কিছু চট বুনতেন হস্তচালিত তাঁতে, যা দিয়ে তারা বানাতেন থলি। কিন্তু এটা ছিল একেবারেই গ্রাম্য কুটিরশিল্প পর্যায়ের ব্যাপার। কৃষকেরা পাটের থলি তৈরি করতেন আসলে নিজেদের ব্যবহারের জন্য, বাজারে বিক্রির জন্য নয়। কিন্তু ডান্ডিতে তৈরি করা পাটের থলি বিক্রি হতে থাকল আন্তর্জাতিক বাজারে। ফলে পাট হয়ে উঠল একটি আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্য। পরে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড থেকে একাধিক কোম্পানি এসে কলকাতার কাছে গঙ্গার দুই ধার দিয়ে স্থাপন করে ১০৯টি চটকল। প্রথম চটকল স্থাপিত হয় ১৮৫৪ সালে। বিশ্বের শতকরা ৭৫ ভাগ পাট উৎপন্ন হতো তদানীন্তন বাংলা প্রদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে। কিন্তু ১৯৪৭-এ পাকিস্তান হওয়ার আগে এই অঞ্চলে কোনো পাটকল ছিল না। এই অঞ্চলে ১৯৫২ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাটকল স্থাপিত হয় নারায়ণগঞ্জে। পরে অন্যান্য স্থানে গড়ে ওঠে ২৭টি পাটকল, ১৯৭০ সালের মধ্যে। কিন্তু বিশ্বে পাটের থলির বা বস্তার চাহিদা এখন আর আগের মতো নেই। পাটের থলির জায়গায় এখন ব্যবহৃত হচ্ছে কাগজের থলি। সিমেন্ট বহন করা হচ্ছে কাগজের বস্তায়। কাগজের বস্তার জায়গায় আসছে পলিথিনের বস্তা।

অন্য দিকে, গম আর বহন করা হচ্ছে না আগের মতো পাটের বস্তায়। গম ক্ষেত থেকে জাহাজে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে সরাসরি, যাকে বলা হচ্ছে বাল্ক হ্যান্ডলিং (Bulk-handling)। গম বহনের জন্য এখন আর চটের বস্তার আগের মতো প্রয়োজন হচ্ছে না। পাটের চাহিদা কিছু বাড়ছে মোটর গাড়ির গদি নির্মাণের জন্য। কিন্তু এই চাহিদা বৃদ্ধি পাটের বাজারকে আগের অবস্থায় নিতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের দেশে সরকারকে পাটকল চালাতে গিয়ে দিতে হচ্ছে প্রতি বছর ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা লোকসান (প্রথম আলো, ১০ মার্চ ২০১৮)। এ পরিস্থিতিতেও আমাদের দেশে অনেক খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, পাটের বাজার আবার ফিরে আসবে আগের চেয়ে অনেক বড় আকারে। আর তা হয়ে উঠবে বাংলাদেশের আয়ের প্রধান উৎস। আমি অর্থনীতিবিদ নই। কিন্তু আমার সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হচ্ছে, এটা সম্ভব নয়।

যাকে বলা হচ্ছে পাটের ‘স্বর্ণযুগ’, সে সময় পাটচাষের জন্য যে এ দেশের কৃষকের আর্থিক অবস্থা খুব সচ্ছল হতে পেরেছিল, তা কিন্তু নয়। লাভবান হতে পেরেছিল পাট নিয়ে ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোর সাথে যারা সংশ্লিষ্ট ছিল, তারা। একসময় বাংলাদেশে পাট একচেটিয়া ব্যবহার করেছে ব্রিটিশ ইহুদি কোম্পানি র‌্যালি ব্রাদার্স। এরপর এই পাট কেনাবেচা ব্যবসায় এসে যুক্ত হয় পশ্চিম ভারতের রাজস্থান থেকে আগত মাড়ওয়ারিরা। বাংলাদেশের দরিদ্র পাটচাষিরা সংঘবদ্ধ ছিল না। তাই তারা কাঁচা পাটের দাম নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারত না। তারা পাট মজুদ রেখে পারত না ন্যায্য দাম পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। তারা চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে সংসার চালাত। পাট কাটা হলে পাট বিক্রির টাকার মাধ্যমে মহাজনের ঋণ পরিশোধ করত। পাটের স্বর্ণযুগের ইতিহাস এ দেশের কৃষকের সচ্ছলতার ইতিহাস নয়। কিন্তু আজকের দিনে আমাদের ভাবতে হবে কৃষকের সচ্ছলতা বৃদ্ধি নিয়ে। আমাদের দেশে যারা পাটের স্বর্ণযুগের কথা বলে ‘জাতীয় পাট দিবস’ উপলক্ষে সোনালি আঁশ নিয়ে বক্তৃতা করলেন, তারা এই ইতিহাসকে এড়িয়ে গেলেন বলেই মনে হলো।

যে জমিতে ধান হয়, সেই একই জমিতে পাটও হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে পাটচাষের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। কেননা পাটচাষ বৃদ্ধির ফলে কমছিল ধানচাষের পরিমাণ। ফলে সৃষ্টি হচ্ছিল খাদ্যসমস্যা। পাট বেচে অনেক সময় কেনা সম্ভব হচ্ছিল না বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য। এ জন্য সে সময় গঠন করা হয়েছিল ‘জুট রেগুলেশন বোর্ড’। এখন যদি পাটচাষ বাড়িয়ে ধানচাষ কমানো হয়, তবে দেশে সৃষ্টি হতে পারে আগের চেয়েও বড় রকমের খাদ্যসমস্যা। কেননা বিশ্বের খুব কম দেশই এখন করতে পারছে আগের মতো খাদ্যশস্য বিক্রয়। পাট বিক্রি করে তাই কেনা সম্ভব হবে না খাদ্যশস্য। এটাও মনে রাখা প্রয়োজন। ১৯৫০-এর দশকের কথা। আমি তখন চাকরি করতাম ঢাকার তেজগাঁও-এ অবস্থিত জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। এ সময় আমার অনেক সহকর্মীকে বলতে শুনেছি, ‘পাটের বাজার ভবিষ্যতে আর থাকবে না। পাট নিয়ে আমরা যে গবেষণা করছি, তা হয়ে পড়বে মূল্যহীন।’ আমি যা বলছি, তার ওপর আছে আমার সে সময়ের একাধিক সহকর্মীর চিন্তাচেতনার প্রভাব।

বাংলাদেশের কৃষক ছিল পাটচাষে খুবই দক্ষ। কেবল বাংলাদেশের আবহাওয়া ও নদীবাহিত মৃত্তিকা যে ছিল পাটচাষের অনুকূল, তা নয়। বাংলাদেশের কৃষকের কৃষি নৈপুণ্য ছিল পাটচাষের বিশেষ অনুকূল। এ জন্য ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রাজিল চেয়েছিল বাংলাদেশ থেকে দশ হাজার কৃষককে গ্রহণ করতে। তারা প্রস্তাব দিয়েছিল এই কৃষকদের তারা জমি দেবে, নগদ অর্থ দেবে এবং নাগরিকত্ব দেবে। এই কৃষকেরা সে দেশে করবে পাটচাষ। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এতে রাজি হয়নি। কারণ, ব্রাজিলে পাটচাষ হতে পারত বাংলাদেশের পাটের প্রতিযোগী। আমরা জাতীয় আয় বৃদ্ধির কথা বলছি; কিন্তু ভাবছি না, কৃষকের আর্থিক সঙ্গতির উন্নয়ন বিধানের বিষয়ে, যেটা হতে পারে না আমাদের জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্য।

লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.