শহীদ মায়ের মুক্তিযোদ্ধা সন্তান
শহীদ মায়ের মুক্তিযোদ্ধা সন্তান

শহীদ মায়ের মুক্তিযোদ্ধা সন্তান

রায়হান রাশেদ

মুক্তিযোদ্ধা শামসুল ইসলাম, ৬৫ বছর। বয়সে ভার এসছে। সাদাসিধে মানুষ। দাড়ি পেকেছে। হাঁটেন সামান্য কুঁজো হয়ে। কথা বলেন দু’গাল হেসে। রস লাগিয়ে। তবে অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর শাণিত। যেন ’৭১-এর ১৭ বছরের সেই যোদ্ধা। অবসরে আছেন। সংসারের হাটবাজার করেন। নিজ হাতে লাগানো গাছের পরিচর্যা করেন। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান মুক্তিযোদ্ধা সংসদে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদে না বসলে তার দিন যায় না। 

সময় কাটান বাগানবাড়ি ও স্কুলে : নদীর পারে বাড়ি। বাড়ির সামনে দিয়ে লম্বা সড়ক গিয়ে মিশেছে নদীতে। গ্রামের বউ-ঝি এপথে নদীতে যায়। শামসুল ইসলাম রাস্তার দু’পাশে লাগিয়ে দিয়েছেন গাছপালা মানুষের ছায়ার জন্য। অনেক পরিশ্রমে করেছেন বাগানবাড়ি। ভাতা পাওয়ার টাকা থেকেই করেছেন। বাগানে আছে প্রায় ১২০টির মতো বৃক্ষ শুধুই মানুষের জন্য। নাম দিয়েছেন- বীর মুক্তিযোদ্ধা বাগানবাড়ি। সুরুজ মোল্লা বলেন, ‘মানুষের ছায়ার জন্য গাছ লাগিয়েছি। মরে গেলেও যেন মানুষ আমাকে স্মরণ করে। লোকে যেন বলে- লোকটা তো নাই, এই গাছগুলো লাগিয়ে দিয়ে গেছে। আল্লাহ তারে ভালো রাখুক।’
বাড়ির পাশেই মাঝের চর ইসলামপুর কিন্ডারগার্টেন। অবকাশে স্কুলে যান। ঘুরে ঘুরে শিশুদের দেখেন। কখনো তাদের পাশে গিয়ে বসেন। সময় পেলে তাদের সাথে গল্প করেন। উৎসাহিত করেন। বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখান। বিভিন্ন উপলক্ষে ছাত্রদের যুদ্ধের কথা শোনান। একাত্তরের স্মৃতি বলেন। তারাও বেশ পছন্দ করে তাকে। ডাকে ‘মুক্তিযোদ্ধা দাদা’।

গড়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব : দোচালা ঘর। ঢেউটিনের বেড়া। টিনে লাল-সবুজের রঙ। সম্মুখের দু’টি জানালায় আঁকা হয়েছে দু’টি পতাকা। মাটির মেঝে। পলেস্তারাহীন ইটের ভিটে। গাছের ছায়াঘেরা পরিবেশ। এই ঘর তার বসার জায়গা। এখানেই অবসর কাটান। খুব ভালোবেসে বেঁধেছেন ঘরখানা। নাম দিয়েছেন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক ক্লাব’ নিজ উদ্যোগে সরকারি বেতনের টাকায়। দেশের জাতীয় দিনগুলোতে ক্লাবে অনুষ্ঠান করেন। দেশীয় সঙ্গীত বাজান। মানুষ জমা করে যুদ্ধদিনের গল্প শোনান। ‘রাস্তার পাশে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব করেছি। মানুষ যেন আসতে যেতে দেখতে পায়। দেখে যেন স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা মনে করে। দেশের প্রতি দরদ রাখে। রক্তে অর্জিত দেশকে ভালোবাসে’Ñ বলেন শামসুল ইসলাম।

পড়াশোনার হাতেখড়ি : স্বাধীনতার আগে অজপাড়াগাঁ ছিল মাঝের চর। অক্ষরজ্ঞান শেখার স্কুল পর্যন্ত ছিল না গ্রামে। পড়তে চাইলে যেতে হতো দূরের গ্রামে। শামসুল ইসলামের হাতেখড়ি হয় পাশের গ্রাম দৌলতকান্দি এমবি পাইলট স্কুলে। লজিংয়ে ছাত্র পড়িয়ে নিজে পড়তেন। থাকতেনও লজিংয়ে। যুদ্ধের বছর পড়েন অষ্টম শ্রেণীতে। তখন ১৭ বছর। দেশে যুদ্ধের হাওয়া লেগেছে। যুদ্ধের হাওয়া লাগে স্কুলেও। স্কুলের হেডমাস্টার রশিদ সাহেব ছাত্রদের যুদ্ধের প্রতি উৎসাহিত করতেন। বলতেন যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে। শোনাতেন পাকিস্তান শোষকশ্রেণীর শোষণের কথা। যুদ্ধের কারণে স্কুলও বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্ররা যার যার বাড়ি চলে যায়। সেও বাড়ি চলে আসে। বাড়ি থেকেই অনেকে জড়িয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে; দেশ স্বাধীনতার আন্দোলনে। এম বি স্কুলের প্রায় ৫০-৬০ জন ছাত্র প্রশিক্ষণের জন্য ভারত যায়। শুধু সুরুজ মোল্লাদের ক্লাস থেকেই যায় ১৭ জনের মতো ছাত্র।

মায়ের ক্ষতবিক্ষত দেহ ও শামসুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধ : শুক্রবারের দুপুর। থমথমে রোদ। শামসুল ইসলাম ছিলেন বাড়িতে। গোসল সারতে নদীতে যান। হঠাৎ আলগীবাজারের দিকে সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শোনেন। আলগীবাজারের আকাশে বারুদের গন্ধ। বাতাসে কালো ধোঁয়া। ভয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি আসেন। সবাইকে সতর্ক করেন।

বিকেলে পাক বাহিনী নৌকা নিয়ে মাঝের চর যান। খবর পেয়ে গ্রামের লোকেরা ছুটে চলেন পালানোর পথে। ঘরের চালে, ধানের গোলায়, বাড়ির ঝোপে, ধানক্ষেতের ভেতর ও কচুরিপানা মাথায় দিয়ে বেঁচে যায় অনেকে। গ্রামের ১৫টির মতো ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। হত্যা করা হয় ১৩-১৪ জন নারী-পুরুষ। শামসুল লুকিয়ে ছিলেন বাড়ির পাশের পানির গর্তে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে। লুকিয়ে দেখেছেন পাক বাহিনীর আনন্দ-উল্লাস। আগুন লাগিয়ে তাদের আনন্দের লাফালাফি। পেয়েছেন ব্রাশফায়ারের বিকট শব্দ। ‘নদীপথে তারা আসছে দেখে, মাকে পালাতে বলে নিজে পালিয়ে গেলাম। কচুরিপানা মাথায় দিয়ে বাড়ির পাশেই পালালাম। দেখি, পাকবাহিনী আমাদের বাড়িতে ঢুকছে। একটু পর দুইটা ব্রাশফায়ার ও গুলির আওয়াজ শুনতে পাই। ভয়ে অন্তর কেঁপে উঠল। আমাদের বাড়িটা অন্ধকার। কিছুক্ষণ পর বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখি। অপারেশন শেষে তারা পশ্চিম দিকে চলে যায়। দৌড়ে বাড়ি যাই। আমাদের একটি মাত্র ঘর আগুনে পুড়ছে। কাঁদতে কাঁদতে মাকে খুঁজি। ঘরের পাশের ঝোপে মায়ের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখি। মায়ের বুকে কোনো মাংস নেই। হাতে নেই আঙুল। ক্ষতবিক্ষত শরীরে মাকে চেনার মতো নাই। মাকে ধরে শিশুর মতো কাঁদতে থাকি। বাবা মারা গেছেন আগেই। আমার এখন পৃথিবীতে কেউ নেই। মায়ের রক্ত আর দেশের মাটি একসাথে মিলিয়ে শপথ নিই। তখনই বেরিয়ে পড়ি মুক্তির সংগ্রামে।’ কথাগুলো বলেই অঝোর ধারায় কাঁদছেন। তার গাল-জামা ভিজে একাকার। বুক ভেঙে যাচ্ছিল হয়তো। অন্তরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল আবার নতুন করে। আমার চোখেও পানি। আমরা দু’জনেই আবেগাপ্লুত হয়ে কিছুক্ষণ থ মেরে রইলাম।

যুদ্ধদিন : ১৭ বছরের তাগড়া যুবক মায়ের রক্ত আর বাংলার মাটি ছুঁয়ে শপথ নেন। দেশরক্ষার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য নামেন ভারতের পথে। প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন হাপানি ক্যাম্পে। তারপর চলে যান গুকননগর। সেখান থেকে আসাম রাজ্যের লায়লাপুরে অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং নেন। প্রশিক্ষণ শেষে ৬৫ জনের এক টিম কর্নেল সফিউল্লার নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু করেন। তাদের গ্রুপ ক্যাপ্টেন ছিলেন রায়পুরা সায়দাবাদের নুরুজ্জামান। তারা ছিলেন ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে। নারায়ণপুর প্রাইমারি স্কুলে তারা ক্যাম্প তৈরি করেন। প্রতিশোধ আর দেশরক্ষার আগুন বুকে নিয়ে নেমে পড়েন যুদ্ধের ময়দানে। নারায়ণপুর, রায়পুরা, ভৈরব, রামনগর আশপাশ এলাকায় পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেন। ভৈরবে থাকত পাক বাহিনী। সেখান থেকে তারা বিভিন্ন জায়গায় অত্যাচার-হত্যা-লুটতরাজ চালাত। মেয়েদের ধরে এনে ধর্ষণ করত। শামসুল ইসলামরা রামনগর এসে তাদের সাথে যুদ্ধ করেন। কয়েক দফা যুদ্ধ হয়। হত্যা করেন অনেক পাকহানাদারকে।

মা নেই বাড়ি : দেশ স্বাধীন হলে সবাই বাড়ি ফেরে। দুধপানিতে গোসল করে মায়ের হাতে। স্বাধীনতার খুশিতে সবাই আনন্দিত। ‘দেশ স্বাধীন করেছি; আনন্দ লাগছে অনেক। কিন্তু ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। কারণ, আমার মা তো বেঁচে নেই। আমি কার কাছে যাবো। আমার তো ঘরও নেই। কোনো পথ না পেয়ে গেলাম লজিং মাস্টারের বাড়ি। লজিং মাস্টারের বউকে ‘কাকী’ ডাকতাম। তিনি আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। বললেন- তুই আমার ছেলে। আমিও কাঁদতে লাগলাম। তিনি তৎক্ষণাৎ আমাকে দুধপানিতে গোসল করালেন। থাকতে লাগলাম কাকীর এখানে’- বলেন মুক্তিযোদ্ধা শামসুল ইসলাম।

বঙ্গবন্ধু ও শামসুল ইসলাম : দেশ বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু সবাইকে ঢাকায় ডেকে পাঠান। শামসুল ইসলাম ঢাকায় যান। বঙ্গবন্ধুর নাম শুনেছেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু তাকে দেখা হয়নি বাস্তবতার চোখে। আজ দেখবেন প্রাণভরে। নেতাকে দেখেই তিনি বিমুগ্ধ। ভিড় ঠেলে গেলেন কাছে। বঙ্গবন্ধুর পরম ভালোবাসার হাতের ভেতর ঢুকিয়ে দেন ছোট দু’টি হাত। পৃথিবীবিখ্যাত মানুষ, স্বাধীনতার স্থপতির সামনে দাঁড়িয়ে ১৭ বছরের শামসুল কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, ‘মুজিব ভাই, পাকিস্তান বাহিনী আমার মাকে হত্যা করেছে। আমি এখন এতিম। আমার কেউ নেই। বাবাও নেই। ’ তখন বঙ্গবন্ধু তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন- ‘কাঁদিস না, আমি আছি তো!’ সুরুজ মোল্লা বলেন- ‘তখন থেকে বঙ্গবন্ধু আমার বাবা-মা।’

শামসুলের মায়ের নাম বাংলাদেশ : মা হারিয়ে আরেক মা পেয়েছেন শামসুল। এই মায়ের নাম বাংলাদেশ। এ দেশকে ভালোবাসেন মায়ের মতো। ভালোবাসেন দেশের মানুষকে। স্বপ্ন দেখেন তরুণদের নিয়ে। সৎ তরুণদের হাতে দেশকে তুলে দিতে চান। তরুণদের কেন্দ্র করে শামসুল ইসলাম বলেন- ‘তারা যেন দেশকে ভালোবাসে। স্বাধীনতার ইতিহাস পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস পড়ে। তাদের সম্মান করে। আমরা তো একটা সময় মারা যাবোই, তরুণেরা যেন আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের স্মরণ করে।’ সন্ধ্যার আজান পড়েছে। সামান্য পুবের জীর্ণ চাদরের মতো সূর্যটা ডুবে গেছে। বিদায় দিতে বললাম। তিনি হাত ধরে বললেন- আপনি কেন আমারে ’৭১-এর কাহিনী মনে করিয়ে দিলেন। আমি আজ রাতে আর ঘুমোতে পারব না। ’৭১-এর স্মৃতি মনে হলে আমার ঘুম আসে না। আমার চোখে শুধু ভাসতে থাকে মানুষের মরা লাশ। শিশুর কান্না। আমার মায়ের বুলেটে ঝাঁজরা বুক।’

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.