ঢাকা, শুক্রবার,২৭ এপ্রিল ২০১৮

রংপুর

হাঁড়িভাঙ্গার বিপ্লবে ৭ হাজার কোটি টাকার হাতছানি

সরকার মাজহারুল মান্নান রংপুর অফিস

১৭ মার্চ ২০১৮,শনিবার, ১৩:৪৯


প্রিন্ট
হাঁড়িভাঙ্গা

হাঁড়িভাঙ্গা

রংপুরের মিঠাপুকুরে এবার হাঁড়িভাঙ্গা আমের বিপুল মুকুল এসেছে, যা এবারের উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন চাষি, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও কৃষিবিদেরা। টানা একযুগের আলু চাষের সাফল্যজনক বিপ্লবের পর আম চাষের বিপ্লব এ অঞ্চলের কৃষিখাতে খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার দিগন্ত। বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা বলছেন, হাঁড়িভাঙ্গা আমের এই সম্ভাবনাকে ধরে রাখতে অবিলম্বে এখানে আম গবেষণা কেন্দ্র, হিমাগার স্থাপন ও চাষিদের উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে বছরে সাত হাজার কোটি টাকার আম উৎপাদন সম্ভব। তবে আমচাষিদের দাবি বিশাল এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের দিকনির্দেশনা ও তদারকি কার্যক্রম বাড়ানো গেলে কৃষকেরা আরো উৎসাহী হবেন।

কৃষক ও কৃষিবিদেরা বলছেন, রংপুরে এখন হাঁড়িভাঙ্গা আম চাষে বিপ্লব চলছে, যা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে আমের রাজধানী রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জকেও ছাড়িয়ে যাবে রংপুর। ইতোমধ্যেই রংপুরের গ্রামগঞ্জের কৃষকেরা আম উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। শুরু হয়েছে বাগানভিত্তিক বাণিজ্যিক চাষ। এবার হাঁড়িভাঙ্গা আমের মুকুলও এসেছে স্মরণকালের চেয়ে সর্বোচ্চ। আম বিশেষজ্ঞরা এই মুকুলকে ‘আমের অন এয়ার’ বলে দাবি করেছেন।


সরেজমিন রংপুরের মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ, ময়েনপুর, রানিপুকুর, বালুয়া মাসিমপুর, ছড়ান, বড়বালা, লতিবপুর, সদর উপজেলার সদ্যপুষ্করনী, বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর, গোপালপুর, লোহানীপাড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে হাঁড়িভাঙ্গা আম বিপ্লবের সেই চিত্র। এসব এলাকার যে পথ দিয়েই এখন যাবেন, সেই পথের দুই ধারের একরের পর একর জমিতে শুধু হাঁড়িভাঙ্গার বাগান। এসব এলাকার যে দিকেই তাকানো যায় সে দিকেই একরের পর একর জমিতে আমের বাগান। আমের সোনালী মুকুলে মন কাড়ছে সবার। এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ পথচারীকে কাছে টানে। রংপুর কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মওসুমে শুধু রংপুর জেলায় বাগানপর্যায়ে ১৫ হাজার ১২০ হেক্টর এবং বাসাবাড়ি ও ক্ষুদ্র পরিসরে তিন হাজার ১১৪ হেক্টর জমিতে আমের বাগান হয়েছে। রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় এই আম বাগানের পরিমাণ ৪৫ হাজার ৫০০ হেক্টর। এই পরিমাণ জমিতে প্রায় ৪১ লাখ ৭৪ হাজার গাছ রয়েছে, যা থেকে গড়ে ৫ মণ করে আম উৎপাদনের মাধ্যমে দুই লাখ ২৫ হাজার মণ আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এই পরিমাণ আমের মূল্য প্রায় তিন হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

সরেজমিন চাষিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আমের গুটি হওয়ার সময়ে যেকোনো ধরনের পচন রোগ এবং গুটি নিশ্চিত করার জন্য নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং ওষুধ কোম্পানির ওপর ভর করে স্প্রে করছেন চাষিরা। কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত মাঠে মুকুল বিপ্লবের এই সময়ে কোনো সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড কিংবা পরামর্শ দেননি। হাঁড়িভাঙ্গা আমের মাতৃগাছের মানিক মৃত নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে খোড়াগাছা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের তেকানী গ্রামের আমচাষি আমজাদ উদ্দিন পাইকার নয়া দিগন্তকে জানান, আল্লাহ এবার হাঁড়িভাঙ্গা আমের মুকুলের জোয়ার দিয়েছেন। অন্য দিকে ময়েনপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর কসবা গ্রামের বিশাল আয়তনের মিলনবাড়ি আম বাগানের মালিক তারিকুজ্জামান সরকার মিলন জানান, কৃষি বিভাগের সহযোগিতা না পাওয়ায় আমের মুকুলে দানা থাকছে না।

এসব এলাকার আমচাষিদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের কাছে আমচাষের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায় তাও অনেক কৃষক জানেন না। এসব কৃষক শুধু বোঝেন কৃষি অফিসের লোকজনের দায়িত্ব ধানের বেলায়। সে কারণে আমচাষিরা ‘নিয়তির’ ওপর ভরসা করেই প্রতি বছর আমের ফলনের ওপর নির্ভরশীল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কৃষি বিভাগ বা সরকার এবং বেসরকারিপর্যায়ে রংপুরে আম চাষের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ে কোনো প্রচারণা বা প্রশিক্ষণের আয়োজন হয় না। হাঁড়িভাঙ্গা এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। এ ছাড়াও এসহাক তেলি, আম্রপলি, সূর্যপুরি, নেংড়া, ফজলি, কুয়া পাহাড়ি, দেলশাদ, কপিল বাংরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির আমের চাষ হচ্ছে রংপুরে। রংপুর খামারবাড়ির উপপরিচালক ড. সরওয়ারুল হক জানান, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী হাঁড়িভাঙ্গা আমের এবার রেকর্ড পরিমাণ মুকুল এসেছে। মুকুল থেকে নাকফুল ও মোটর দানা বের হচ্ছে। আমরা হাঁড়িভাঙ্গা আমচাষিদের পাশে আছি। ১২টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আমরা পরামর্শ দিচ্ছি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্রের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. হামীম রেজা জানান, রংপুরের উৎপাদিত হাঁড়িভাঙ্গা আম স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। এই আমসহ রংপুরের আবহাওয়া উপযোগী আমের জাত আবিষ্কারের জন্য আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, রংপুরের মাটি আম আবাদের জন্য উপযোগী। সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দিলে এখানে আম দিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনা সম্ভব।

রংপুর খামারবাড়ির উপপরিচালক ড. সরওয়ারুল হক জানান, এই মুহূর্তে মুকুল থেকে নাকফুল ও মোটরদানা বের হচ্ছে। কার্যকরভাবে দানা টিকানোর জন্য ইমিডাক্লোরোফিড কীটনাশক এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য ম্যানকোজেব গ্রুপের ওষুধ আমরা চাষিদের স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছি। হাঁড়িভাঙ্গা আম চাষ ও বাজারজাতকরণে সাফল্যের জন্য বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক পাওয়া খোড়াগাছের আখিরাহাটের দয়ার দান আম্রকাননের মালিক আব্দুস সালাম সরকার জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো রংপুরে কৃষি বিভাগের আলাদা অফিস স্থাপন, সংরক্ষণাগার স্থাপন, গবেষণাগার স্থাপন ও এই অঞ্চল উপযোগী আমের ভালো জাত আবিষ্কার এবং আম প্রসেসিং কারখানা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫