ঢাকা, শুক্রবার,২৭ এপ্রিল ২০১৮

সম্পাদকীয়

স্টিফেন হকিংয়ের মৃত্যু

বিজ্ঞানাকাশের এক নক্ষত্রের পতন

১৬ মার্চ ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিজ্ঞানী, যিনি সারা জীবন হুইল চেয়ারে বসে অনন্য আগ্রহে প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে হতে পেরেছেন অসমান্তরাল এক বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী, সেই অসাধারণ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং গত বুধবার ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজে নিজ বাড়িতে মারা গেছেন। তার এই চলে যাওয়া যেন বিজ্ঞানাকাশের এক নক্ষত্রের পতন। তার সন্তান রবার্ট, লুসি ও টিম হকিং গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা গভীরভাবে মর্মাহত’ আজ আমাদের প্রিয় বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি বড়মাপের একজন বিজ্ঞানী এবং অসাধারণ মানুষ ছিলেন, যার কাজ ও অবদান বহু বছর ধরে টিকে থাকবে। বিবৃতিতে তার সন্তানেরা এই বিজ্ঞানীর একটি স্মরণীয় উক্তি উল্লেখ করেন। কোনো একসময় হকিং তার সন্তানদের বলেছিলেন, ‘এই মহাবিশ্ব যদি তোমাদের প্রিয় মানুষের আবাস না হতো, তাহলে এটি মহাবিশ্বই হয়ে উঠত না।’
স্টিফেন হকিংয়ের সন্তানদের মতো আমরাও মনে করি, তিনি ছিলেন অতি বড়মাপের একজন বিজ্ঞানী। তার বিজ্ঞানসম্পর্কিত জ্ঞান আর প্রজ্ঞার গভীরতা এতটা পরিব্যাপক ছিল যে, কেউ কেউ বলতেন স্টিফেন হকিং ছিলেন সৃষ্টিকর্তার মনপাঠক। তিনি সৃষ্টিকর্তার মনের কথা জানতেন। তিনি সৃষ্টিকর্তার মনের কথা জানতেন কি না, সে ব্যাপারে তর্কবিতর্ক হতে পারে। কিন্তু আমরা তার বক্তব্যকে শুধু রূপক অর্থেই বিবেচনা করতে চাই। যারা স্টিফেন হকিং সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন, তারা শুধু এই বিজ্ঞানীর বিজ্ঞানজ্ঞানের ব্যাপক রূপ প্রকাশ করতে এ বক্তব্য রেখেছিলেন। অবশ্য হকিং বলেছেন, আমার লক্ষ্য একটাই। আমি মহাবিশ্বকে বুঝতে চাই।
৭৬ বছর বয়সী এই অনন্য বিজ্ঞানীর কাছ থেকে পেয়েছি তার লেখা সুপরিচিত একটি বই ‘অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ বা সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। বইটি তার বিজ্ঞানবিষয়ক গভীর জ্ঞানের পরিচয় বহন করে। তার অবাক করা জ্ঞানসাধনা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে তুলেছে। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি বিরল এক রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকেরা তখন জানিয়ে দিয়েছিলেন, বড়জোর আর দুই বছর তিনি বাঁচবেন। কিন্তু তিনি বেঁচেছিলেন আরো ৫২ বছর। তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ার পরবর্তী ৫২ বছর হুইল চেয়ারে বসে কোনো কথা না বলে বিশেষ ধরনের কম্পিউটার ব্যবহার করে তার বিজ্ঞান সাধনা অব্যাহত রাখেন এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে। তিনি পদার্থবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন। পরে ক্যামব্রিজে শিক্ষকতাও করেছিলেন। আইনস্টাইনের পর তাকে মনে করা হতো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাব সৃষ্টিকরা বিজ্ঞানী। তিনি নিজে বলেছেনÑ ‘ক্যামব্রিজভিত্তিক তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হওয়ার সুবাদে আমি অতিমাত্রায় সুবিধাভোগী একটি জমকালো জীবন কাটিয়েছি।’
বিজ্ঞানী হলেও তাকে আমরা মাঝে মধ্যে মানবিক হয়ে উঠতে দেখি। তাকে বলতে শুনেছি, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপ্তির কারণে আর্থিক বৈষম্যের চেহারা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি ফুটে উঠেছে। আমার কাছে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রযুক্তি খুবই গ্রহণযোগ্য মাধ্যম। প্রযুক্তি না থাকলে আমার পক্ষে বিগত বহু বছর ধরে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। কিন্তু বুঝতে হবে, বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এলাকার ধনিক শ্রেণীর জীবনযাপন কেমন, তা পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সামর্থ্য থাকা একজন গরিব মানুষ অত্যন্ত পীড়াদায়ক অনুভূতি নিয়ে দেখছে। উপসাহারীয় এলাকায় এখন যত মানুষ বিশুদ্ধ পানি পায় না, সেখানে তার চেয়ে বেশিসংখ্যক লোকের হাতে মোবাইল ফোন। এর অর্থ উত্তরোত্তর জনাকীর্ণ হতে থাকা আমাদের এই গ্রহে কিছু দিনের মধ্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে, যেখানে প্রায় কারো পক্ষে বৈষম্য থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় থাকবে না। তার কাছে মনে হয়েছে, এখন সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে মানবেতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে আমাদের এই গ্রহে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
আগামী প্রজন্ম স্টিফেন হকিংয়ের বিজ্ঞান সাধনা ও মানবিক তাগিদের মর্মার্থ বুঝে তাদের আগামী পথরেখা রচনা করবে, সেটাই তার এই মৃত্যুর সময়ে আমাদের তাগিদ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫