একজন শিক্ষক
একজন শিক্ষক

একজন শিক্ষক

মাহফুজ আনাম

১৮ মার্চ ১৯৭৯-এর সকালে বাবার চলে যাওয়ার কালে আমি তার পাশে থাকতে পারিনি। ঠিক ৩০ ঘণ্টা আগে প্যারিসের কর্মস্থলে রওনা হওয়ার সময় ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি যে, সেটিই চিরবিদায়। ধানমণ্ডির সেই লাল ইটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বুঝতে পারিনি যে ফিরে আসাটা আর কখনই আগের মতো হবে না। আর কখনই সেই স্বস্তিদায়ক, সহজানন্দ, সুখপ্রদ হবে না। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও বুঝতে পারিনি বাড়ি ফেরা মানে কী। ফেরার পথে বুঝলাম যে আমি ঠিক প্রিয় স্বদেশে নয়, সেই প্রিয় শহরটিতেও নয় যৌবনে যার রাস্তাগুলো আকাশ ফাটানো স্লোগানের শব্দে প্রকম্পিত করেছি, না, ঠিক সেই বাড়িতেও নয় যে বাড়িতে বড় হয়েছি। আমি ফিরছিলাম ঠিক তার কাছে। সেখানে, যেখানে তিনি ছিলেন। সত্যিকারে, তার উষ্ণ প্রাণের পরশ, স্নেহময় আলিঙ্গনে শেষ হতো দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা। পৌঁছতাম অবশেষে। সেই আমার বাড়ি।
যে সাড়ে পাঁচ সপ্তাহ একসাথে ছিলাম, তার মৃত্যু সম্ভাবনা ভুলেও ভাবিনি; না কি তা শুধু আমার জন্যই, তিনি কি সেভাবেই দেখাতে চেয়েছেন? তাকে অপেক্ষাকৃত সুস্থ দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যে তিনি খানিকটা শক্তিও ফিরে পেয়েছেন। খানিকটা হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এমনকি কয়েকবার হেঁটে খাবার ঘরে, আশৈশব দেখা পারিবারিক প্রথা অনুসারে, সবার সাথে দুপুরের খাবার খেয়েছেন। যদিও কণ্ঠ ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসছিল। অনেক আয়াসেই কিছু বলতেন। তারপরও আমরা অনেক কথাই বলেছি। তিনি আমার প্রবাস জীবন সম্পর্কে জানতে চাইতেন। আমি প্যারিস, ফ্রান্স, ইউনেস্কো এবং বহুজাতিক প্রয়াস সম্বন্ধে আমার প্রাথমিক ধারণা ব্যক্ত করেছি। তিনি আমার কৌতূহল পছন্দ করতেন আর ছেলেমানুষিতে মৃদু মৃদু হাসতেন।
কিন্তু যখন প্যারিসে পৌঁছবার এক ঘণ্টার মধ্যেই, আমার স্ত্রী বাবার খবর জানালেনÑ মনে হলো, কয়েক দিন আগে তার আরোগ্যের ‘লক্ষণগুলি’ যেন আমার প্রস্থানকে সহনীয় করবার, কম কষ্টদায়ক করবার, কম বেদনাদায়ক করবার ‘সাহসী প্রয়াস’ মাত্র। এমনকি জীবনের শেষকটা মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তার পরিবার, সন্তান, আমাকে নিয়ে ভেবেছেন।
সব কিছুর মধ্য দিয়ে আমার বোধহয় বোঝা উচিত ছিল। বিদায়বেলায় তার ভেঙে পড়া, বিদায় জানানো, চোখগুলো পানিতে ভরে যাওয়া। যে চোখে পানি কদাচিৎ দেখেছি। মাত্র দুইবার। এক, যখন জনাব সোহরাওয়ার্দী মারা গেলেন অন্যবার, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু সংবাদে। সে ছিল তার ব্যক্তিগত ক্ষতি। সে মৃত্যুর সংবাদে তিনি কেঁদে ছিলেন। সে কদাচিৎ কান্নার মানে বোঝা উচিত ছিল। কান্নাভেজা চোখে শেষ বিদায়ে অর্থ বোঝা এবং থেকে যাওয়া উচিত ছিল আমার।
বুদ্ধি দিয়ে যতদিনে বাবাকে বুঝতে শিখেছি, ততদিনে তিনি সত্তরের কোটায় পা দিয়েছেন। সে সময় তিনি ব্যঙ্গসাহিত্যিক হিসেবে স্বনামখ্যাত, লেখক হিসেবে শ্রদ্ধাভাজন, রাজনীতিবিদ হিসেবে বিখ্যাত আর প্রাক্তন সাংবাদিক, সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত সম্মানিত। সব থেকেই তিনি অবসর নিয়েছেন। সব সময় তার শক্তি নিয়োজিত করেছেন বই আর পত্রিকার কলাম লেখায়। ঘোর রাজনীতিবিদ বাবাকে আমার আবছা মনে পড়ে, যখন তাঁর ক্ষুরধার বক্তব্যের সময় পায়ের কাছে বসে ছিলাম, তার হাত ধরে থাকতাম, সাথে সাথে মিছিলে, র‌্যালিতে যেতাম। বরং দেশনেতা বাবাকে আমার স্পষ্ট দেখতে পাই যেন তিনি মন্ত্রিসভায় অংশ নিচ্ছেন, বিদেশী প্রতিনিধিদের সম্ভাষণ করছেন। তার সাথে দেশে ও দেশের বাইরে ভ্রমণের স্মৃতি আমার স্পষ্ট। তার জেলযাপন নিয়ে আমার ক্ষীপ্ততার স্মৃতি, সাতসকালে বাড়িতে পুলিশের হানা, সার্চ, জেলগেটে তার সাথে ১৫ মিনিটের সাক্ষাৎ আর দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা, বিশৃঙ্খলাপূর্ণ আদালতগমনের অসংখ্য স্মৃতিও বিদ্যমান। শেষের দিকে মা বলতেন যে, নিয়মিত পিতৃ সাক্ষাতের, কথা বলার সুযোগ পাওয়ার জন্য আমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। একই সাথে মনে পড়ে তার দীর্ঘ অসুস্থতা যা তিনি জেলে অর্জন করেছেন আর বাকি জীবন বয়ে নিয়েছেন।
কিন্তু যে স্মৃতি আমার মনের মণিকোঠায় খোদাই হয়ে আছে তা লেখক আবুল মনসুর আহমদের, একজন শিক্ষকের, তার, যার কাছে সব সময় আমার যেকোনো প্রশ্নের জবাব মওজুদ থাকত। সে সময় তিনি আত্মদর্শনে, ধ্যানে, গভীর রাজনৈতিক চিন্তায়, সমাজজীবন অধ্যয়নে মগ্ন থাকতেন। নিজের জীবনভিক্ষা, অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণপূর্বক নির্যাসটুকু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন। সে সময় সর্বোতভাবেই লেখক ও চিন্তাবিদ মনসুর আহমদের জন্যই নিবেদিত।
ছেলেবেলায়, কমই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছি। কিন্তু স্বাধীন চিন্তার কিছু লক্ষণ প্রদর্শন ও লেখার দক্ষতা, বিশেষত বিতর্ক প্রতিযোগিতার পাণ্ডুলিপি তৈরির মাধ্যমে খানিকটা নৈকট্য অর্জন করেছিলাম। ভাববিনিময় ও আলোচনার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তা বিদ্যমান ছিল শেষ, অঘোষিত বিদায় অবধি। এটি হঠাৎ-ই শুরু হয়েছিল। এক সন্ধ্যায় বন্ধু, পরিবার-পরিজন, বাবা-মা এমনকি নিজেকেও অবাক করে আন্তঃকলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতার ট্রফি নিয়ে ঘরে ফিরলাম। যা বাবার ভেতরে আমার সম্পর্কে একটি নতুন কৌতূহল তৈরি করল আর জন্ম হলো আমাদের নতুন সম্পর্কের। এক আচার্য আর এক শিষ্যের। সেই সন্ধ্যা থেকে তিনি আমার যাবতীয় লেখার আগ্রহী পাঠক। প্রথমদিকে শুধু বিতর্ক আর বক্তব্যের পাণ্ডুলিপিই লিখেছি। তিনি প্রত্যেকটি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চাইতেন। যেসব সিদ্ধান্তে তিনি একমত, জানতে চাইতেন কিভাবে সে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। আর যেসবের সাথে দ্বিমত, জানতে চাইতেন কেন ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিন্তু কখনই আমার সিদ্ধান্ত বদলের চেষ্টা করেননি। প্রয়োজনবোধে তিনি বিষয় নয়, বরং সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করতেন।
সেটা ছিল স্বাধীন চিন্তনের শিক্ষণ, নিদেনপক্ষে প্রশিক্ষণের অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। যা লিখেছি তাকে দেখাতাম। তিনি লেখার শক্তি ও দুর্বলতা এবং কিভাবে চিন্তাকে সাজিয়েছি কিংবা তার মধ্যে নতুন কোনো চিন্তা বা ধারণার অভাবকে নির্দেশ করতেন। বলতেন, তোমার চিন্তা ও লিখনকে ক্ষুরধার করতে সাহায্য করব কিন্তু তাকে তোমার চিন্তা, তোমার লেখাই হতে হবে। অনেকবারই তার আক্রমণের বিপরীতে আমার অবস্থানে অনিশ্চয়তা ও যথাযথ যুক্তির অভাবে, একমত হয়ে সহজ শেষ টানতে চাইতাম। কিন্তু তখন তিনি আলোচনার মোড় ঘোরাতেন। তিনি আমার প্রচেষ্টার শক্তিগুলোকে আলোকিত করতেন যেগুলোকে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারছিলাম না। দেখিয়ে দিতেন যে, দৃষ্টিকোণ পরিবর্তনের প্রয়োজন নাই কারণ যতটা প্রাথমিকভাবে মনে হয়, আমার যুক্তিগুলো তত দুর্বল নয়। যেন জাদুর কাঠির পরশে আমার আত্মবিশ্বাস ফিরে আসত। পূর্ণ শক্তিসহকারে মাথা কাজ করতে শুরু করত। ধারণাগুলো সঠিক শব্দ, যথাযথ উদাহরণ এবং উপসংহার খুঁজে পেতো। পুরো বিষয়টিতে যথাযথ গুরুত্বের দাবিদার হয়ে উঠত আমার অবস্থান। যেন হঠাৎ-ই বাবা তার কণ্ঠ ফিরে পেতো।
বাবা আমার নিজেকে নিয়ে চিন্তার শুদ্ধ আনন্দ উন্নয়ন শেখাচ্ছিলেন বা শেখানোর চেষ্টা করছিলেন যাতে বহুবিভক্ত জটিল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পথগুলোর মধ্যে নিজস্ব স্বাধীন পথটি বেছে নিতে পারি। তিনি ফুল ফোটানোর চেষ্টা করছিলেন। সে তার সন্তান বটে কিন্তু বিশেষভাবে আমাকেই।
আমার বাবা সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সততই একরৈখিক ছিলেন। তার চিন্তা পরিচ্ছন্ন ছিল। সে চিন্তা আবার ধারালো যুক্তি আবরণ আর বহু বছরের গবেষণায় শানানো। তার ব্যক্তিত্ব এতই শক্তিশালী ছিল যে, তিনি প্রয়োজনে সে চিন্তার সনির্বদ্ধ ও নিয়মিত প্রকাশে কখনই কুণ্ঠা বোধ করেননি। কেউ আলটপকা ধারণায় তাকে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি অধৈর্য হতেন, লোকের কুতর্কে সেটি ধ্বংসাত্মক হতে পারত কিন্তু কখনই তিনি নিজ মত অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেননি। সব দলেই তার বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী ছিল। পরিবারের সদস্য, সন্তানেরাও কখনো কখনো অন্যরকম মত পোষণ করতেন।
তিনি তার পিতৃত্বের মডেলটি একদিন ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘আমি তোমার পথের লাইটপোস্ট হবো কিন্তু তোমার হয়ে পথ খুঁজব না; ওটা তোমার নিজেকেই করতে হবে। তোমার জীবনের রাস্তায় পথনির্দেশক খুঁটি হবো যেটি বলে দেবে যে, কোন পথ কোনদিকে গেছে; বলব তোমার সামনের কোন রাস্তায় কি অপেক্ষা করছে। কিন্তু কখনই ভুলো না যে, তুমিই পথিক। তোমার পথ তোমাকেই বেছে নিতে হবে আর তার দায়িত্বও তোমার’।
আমি আমার গণতন্ত্র, ব্যক্তি অধিকার, কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য ও তাদের যথাযথ কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক প্রাথমিক জ্ঞানার্জন করেছি বাবা-মার প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক পদ্ধতি থেকে। পাঁচ ছেলের কনিষ্ঠ হিসেবে সর্বদাই, সব বিষয়ে আমাকে পাঁচস্তর অতিক্রম করতে হতো। আমার অন্য চার বড়ভাইকেও একই নিয়ম অনুসরণ করতে হতো। আম্মুকে সংসারে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিবেচনায় তার সমান হিসেবে প্রতিপন্ন করতে পারা বাবার একটি বিশেষ অর্জন মনে করি। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক প্রথম শিক্ষা পেয়েছি- আমার অধিকার ও বড়ভাইদের কর্তৃত্বের আন্তঃসম্পর্ক থেকে। একবার বড়ভাই একটা খারাপ কাজ মানে বন্ধুদের সামনে আমাকে অপমান করেছেন। যেটি কখনই আমাদের পরিবার অনুমোদিত নয়। আমি ভয়ঙ্কর রাগারাগি করেছি এবং এক অনিয়ন্ত্রিত মুহূর্তে হালকা বিকৃতি ঘটেছে অর্থাৎ বন্ধুদের সামনেই তা তার জন্য হালকা হলেও অপমানসূচক হয়েছে। নিশ্চিত ছিলাম যে আমাকে লজ্জিত করার জন্য বড়ভাই শাস্তি পাবেন। কিন্তু যখন বাবার কাছে নালিশ দিলাম, অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে বাবা আমাকেই বকছেন, বড়ভাইকে নয়। দু’টি ভুল করেছিলাম। কর্তৃত্বের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছিলাম আর পরিবারের ন্যায়বিচারের সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব প্রদর্শন করেছি। পরে বড়ভাইকে অনেক অনেক বকাঝকা দেয়া হয় কিন্তু তা আমার উপস্থিতিতে ঘটেনি। বড়ভাইয়ের কর্তৃত্বকে ছোট করা যেত না। বুঝলাম যে, কোনো কারণে আমি অপরাধী আর কেনই বা বড়ভাই আমার সামনে শাস্তি পেলেন না। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লাভবান হতে হলে, যথাযথ না হলেও, স্বাধীনভাবে তাদের ওপর অপির্ত কর্তৃত্বের চর্চা করতে দেয়া উচিত। আমরা যদি কেবলি প্রতিষ্ঠান তৈরি করি আর সেগুলো মনমতো না হলে কর্তৃত্বকে নষ্ট করি তাহলে পুরো সমাজব্যবস্থা যেমন কষ্ট পায় তেমনি এমনকি ভেঙে পড়তে পারে।
আমাদের বেছে নেয়া জীবন দর্শনে তার হস্তক্ষেপ না করার মধ্য দিয়ে আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতায় বাবার প্রতিশ্রুতির পরাকাষ্ঠা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমি মনে করতে পারি না যে তিনি কখনো আমি বা আমার কোনো ভাইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কোনো পরিকল্পনার কথা বলেছেন। কাজেই আমার সাংবাদিক হওয়া সম্পূর্ণই আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত কিন্তু জানতাম সিদ্ধান্তে তিনি অনেক আনন্দিত হয়েছেন। এটি আমাদের আরো কাছাকাছি এনেছে এবং বিতর্কের দিনগুলোতে শুরু হওয়া সম্পর্ককে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। আমার প্রথম লেখার কথা মনে আছে এবং মনে আছে যে, তিনি কিভাবে সেটি সব সময় হাতে রাখতেন। এখন আর আগের মতো তাঁকে লেখাগুলো দেখাই না। তাকে তা পড়বার জন্য পরের দিন পত্রিকায় প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। জানতাম তিনি পড়বেন এবং তার মন্তব্যের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করতাম। যদি ভালো না লাগত তিনি স্র্রেফ মৃদু হাসতেন, সে হাসির মানে আমি জানতাম। যেদিন তিনি মনে করতেন যে লেখাটি ভালো হয়েছে, অনেক অনেক খুশি হতেন। আমি বাড়ি ফিরে আসতে আসতে তিনি পড়ে ফেলতেন আর বিশেষ জায়গাগুলো পেনসিলে চিহ্ন দিয়ে, লেখাটি কেটে নিয়ে আমার জন্য তৈরি বিশেষ ফাইলে রাখতেন। যখনই লিখতাম, জানতাম যদি কেউই না পড়ে, সারা দুনিয়ায় অন্তত একজন আছেন যিনি লেখাটি পড়বেন। এই অনুভূতি, এই ধারণাকে তিনি বিশেষ মূল্য দিতেন যে জন্য যা লিখতাম তা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক সময়ই লিখতে যেয়ে, তার জন্যই, কোনো বিশেষ শব্দ, শব্দবন্ধ, চিত্রকল্প, গল্পসূত্রের ব্যবহার করেছি, গল্প বলেছি কারণ জানতাম যে তিনি খুঁটিয়ে পড়বেন।
তার সাথে শেষ উল্লেখযোগ্য আলাপে তিনি বলেছিলেন যে, ‘আমি সারাজীবন শুধু একটা কাজই করার চেষ্টা করেছি, যে বা যারা আমার কথা শুনবে বা আমার লেখা পড়বে, তাদের অন্তরে সৃষ্টিশীলতা ও স্বাধীন চিন্তার সাহস দানের চেষ্টা করেছি; ন্যূনতম নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধা উৎপাদন, মর্যাদা ও আত্মসম্মানের অনুভূতি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব উন্নয়নের চেষ্টা করেছি’। সৃষ্টিশীলতা, স্বাধীন চিন্তা, নৈতিকতা, মর্যাদা, আত্মসম্মান প্রভৃতি ছিল বাবার শব্দভাণ্ডারের চাবিস্বরূপ। এসব শব্দের অর্থ তার জীবনের মৌলিক অংশকেই ধারণ করত। তিনি তার দৈনন্দিন জীবনে ওই সব ধারণার ওপরই বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন। এসব মূল্যবোধের কতটুুকুু আমাদের আজকের জীবনে প্রতিফলিত সে প্রশ্ন বোধ করি না তোলাই ভালো। আমাকে তিনি বলেছিলেন, ‘যতদূর সম্ভব, এসব মূল্যবোধ জীবনের অংশীভূত করবে। তারপরই একজন ছেলে হিসেবে বাবার প্রতি সবচেয়ে মূল্যবান শ্রদ্ধাটা জ্ঞাপন করতে পারবে’। সেদিন তাকে শ্রদ্ধা জানানোর যোগ্যতা থেকে অনেক দূরে ছিলাম কাজেই তার দৃষ্টি এড়িয়ে মেঝেতেই তাকিয়ে ছিলাম। সে সন্ধ্যার অনেকটা সময় স্তব্ধতায় বসেছিলাম। চোখ তুলিনি। তার চোখে চোখ রাখতে পারিনি। আজো এই ক্ষুদ্র জলে ভরা চোখ তুলতে পারি না।

মাহফুজ আনাম : আবুল মনসুর আহমদের কনিষ্ঠ সন্তান ‘দি ডেইলি স্টার’র সম্পাদক ও প্রকাশক। লেখাটি তিনি লিখেছেন ইংরেজিতে। অনুবাদ করেছেন আশিক রেজা

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.