সমর্পণ
সমর্পণ

সমর্পণ

সাইমুনা তারিন

দশটার মতো বেজেছে। গেট খুলে সুপ্তি তার ফুফুর বাড়িতে ঢুকল। তার ফুফু সুবর্ণা মালীকে নিয়ে বাগান তদারকি করছিলেন। ভাইয়ের মেয়েকে দেখে তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। 

‘আজ ইউনিভার্সিটি নেই?’
‘আছে। ক্লাসে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে তোমার এখানে চলে এলাম। আমি এখানে কিছু দিন আত্মগোপন করে থাকতে চাই।’
‘ঝগড়াঝাটি করে এসেছিস মনে হচ্ছে?’
‘ওসব কিছুই নয়। তোমাকে টেনশন করতে হবে না।
‘চা খাবি?’
‘না। বাসা থেকে খেয়ে এসেছি। আপাতত আর খাবার ইচ্ছে নেই।’ সুপ্তি বাড়ির ভেতরে ঢুকল। তার সাথে সূবর্ণাও। দু’জনে তাঁর শোবার ঘরে এসে বসল। সুপ্তি ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়েছে। ওর মুখটা দেখে চিন্তিত মনে হলো।
সুবর্ণা আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, ‘ব্যাপার কী বল তো।’
‘আমি একজনকে পছন্দ করি, তাও ফর্মালি নয়।’ সুপ্তি গম্ভীর হয়ে জানাল।
‘আচ্ছা! তাহলে এই ব্যাপার। ছেলেটা কে?’
‘জেনে লাভ কী? তুমি তো বাবার কাছে অনুরোধ নিয়ে যাবে না। যদিও আমি এসেছি তোমার সাহায্য নিতেই। যেকোনো ভাবে তুমি একটা ব্যবস্থা করে দেবে, সে আশাতেই।’
‘ছেলে যদি খুব কোয়ালিফায়েড হয়, যাবো।’
‘থাক, তোমার শুনে কাজ নেই।’ সুপ্তি মুখ ফিরিয়ে নিলো।
সুবর্ণা সুপ্তির গায়ে হাত রেখে বললেন, ‘নামটা শোনাই যাক। কাজ না থাকলে নাই।’
‘তোমার আত্মীয়। ইমন ভাই।’
সুবর্ণা চোখ কপালে তুলে ফেললেন, ‘এটা কী করে সম্ভব?’
‘হতেই তো পারে। তুমি এত অবাক হচ্ছো কেন?’
‘তোদের মধ্যে সম্পর্কটা কেমন?’
‘কোনো সম্পর্ক নেই, ফুফু। আমি তাকে পছন্দ করি। উনি আমাকে কতটুকু করেন তা তো আমি জানি না। ভেবেছিলাম তুমি একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।’

সুবর্ণা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁর ভাই-ভাবী মেয়ের জন্য বিয়ে দেখছেন। আয়োজিত সেই বিয়েতে মেয়ের মত নেই। এটুকুই যথেষ্ট জটিল বিষয়। কারণ, তাঁর ভাই যথেষ্ট কড়া ধাতের মানুষ। তার ওপর মেয়ে এমন একজনকে পছন্দ করে, যার সাথে তার তেমন আলাপও হয় না। সেই ছেলেকেই বা বিয়ের প্রস্তাব দেয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত! এই জেনারেশনের একটা সমস্যাই হলো তারা সব কিছু রেডিমেড পেতে চায়।
‘তুই আমাকে কী করতে বলছিস?’
‘তুমি ইমন ভাইকে ডেকে একটু কথা বলতে পারবে না?’
‘কী বলব?’
‘কী বলবে তা আমি শিখিয়ে দিতে পারব না। আমার ব্যাপরটা বুঝিয়ে বলবে। আমি নিজে বলতে পারছি না, তাই তোমার হেল্প চাইছি।’
‘সমস্যায় ফেলে দিলি!’
‘আমার জন্য না হয় একটু সমস্যায় পড়লেই।’

ইমন সুবর্ণার ভাসুরের ছেলে। এমএসসি পাস করেছে বেশ কিছুদিন হলো। কোনো চাকরি-বাকরি করছে না। কেন করছে না নাকি পাচ্ছে না, সুবর্ণা ঠিক জানেন না। ছেলেটার স্বভাবচরিত্র ভালো। গুরুজনকে সমীহ করে, যা আজকের যুগে বিরল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। কিন্তু সুবর্ণার ধারণা, ইমনের দায়িত্ববোধ কম। তা যা-ই হবে হোক, তিনি বিকেলে ওকে ডেকে পাঠালেন। ইমন যথাসময়ে হাজির হলো। টুকিটাকি সৌজন্য আলাপ শেষে তিনি কাজের কথায় এলেন।
‘ইমন, বিয়েশাদি করার কথা কিছু ভাবছো?’
‘চাচী, আমি বেকার মানুষ। কে মেয়ে দেবে?’ ইমন অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসল।
‘সেটাও একটা কথা। তা তুমি কি ইচ্ছে করে বেকারত্ব বেছে নিয়েছ, নাকি চাকরি হচ্ছে না?’
‘হচ্ছে না। আমি যেমনটি চাই, তেমনটি হচ্ছে না।’
‘ফ্যামিলি থেকে কোন প্রেশার নেই বোধহয় এ ব্যাপারে।’
ইমন একটু হাসল, ‘প্রেশার নেই বলেই তো জানি। আসলে বাবা-মা আমার ওপর রিলাই করেন অনেক বেশি।’
‘এ তো ভালো কথা। যে কারণে তোমাকে বিশেষভাবে ডেকে আনা সেটা বলি। আমার কাছে একটি পাত্রী আছে। পাত্রী না বলে তোমার ফ্যান বললেই বোধহয় ভালো হবে। মেয়েটি তোমাকে পছন্দ করে। তোমাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু সে নিজে বলতে চায় না বা বলতে পারছে না। বিয়েটা হতে পারে যদি তুমি রাজি হও এবং মেয়ের অভিভাবক রাজি হয়।’
চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠল ইমনের, তবু সে বিস্ময় চেপে বলল, ‘কে মেয়েটি?’
‘আমার বাবার দিকের আত্মীয়।’
‘নামটা বলা যাবে?’
‘সুপ্তি।’
‘ও আচ্ছা। কিন্তু ওর ফ্যামিলি আমার সাথে ওকে বিয়ে দিতে রাজি হবে কেন? আমি বেকার।’
‘সেটা তো আমারও কথা। আর আমি আমার ভাই-ভাবীকে এসব ব্যাপারে রাজি করাতে যাবো না। তুমি নিজে ওর সাথে একটু কথা বলে দেখবে? যদি বোঝাতে পারো।’
‘আমার আপত্তি নেই। সুপ্তি আপনার এখানে এলে আমাকে ডাকলেই হবে।’
‘ও এখন আমার এখানেই। আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

সুপ্তি এলো বেশখানিক দেরি করে। ইমন সামনে রাখা খবরের কাগজে চোখ রেখে বসেছিল, সুপ্তি চুপচাপ এসে বসলে ওর দিকে তাকাল।
‘কেমন আছো সুপ্তি?’
‘ভালো, আপনি কেমন আছেন?’
‘আমিও ভালো।’
ইমন লক্ষ করল সুপ্তির মধ্যে কোনো জড়তা নেই। ভালোই হলো। সে নিজেও এতে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারবে।
‘চাচী আমাকে তোমার ব্যাপারে কিছু কথা বললেন। আমার মনে হলো আমার তরফ থেকে এসব ব্যাপারে কিছু কথা পরিষ্কার করে বলে রাখা উচিত।’
‘বলুন।’
‘তুমি তো জানোই আমি এখনো চাকরি পাইনি। কোনো মেয়ের অভিভাবক বেকার ছেলেকে নিজেদের মেয়ের জন্য নির্বাচন করবেন না। আর তা ছাড়া আমি এখনকার জেনারেশনের ইয়াংদের মতো নই। আমার লাইফস্টাইল ওদের চেয়ে পুরোপুরি আলাদা। এ রকম লাইফস্টাইল অ্যাপ্রিশিয়েট করার মতো মানুষের সংখ্যাও খুব বেশি নেই।’
‘আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি। আপনার লাইফস্টাইল আলাদা বলেই আপনাকে আমার ভালো লাগে।’
‘তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু তোমার অভিভাবক?’
‘আপনার চাকরি হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতে পারি।’
ইমন একটু ভাবল। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘দেখো সুপ্তি, আমারও কিছু চাওয়ার থাকতে পারে। তুমি যদি সত্যিই সিরিয়াস হও তাহলে সে কথাগুলো আমাকে বলতেই হবে। শোনার পর তুমি সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারো।’
‘আপনি বলতে পারেন।’
‘আমি যার সাথে জীবন কাটাব তাকে আমার লাইফস্টাইল মেনে নিতে হবে। শুধু তাই নয়, তাকেও এ রকম লাইফস্টাইল মেনটেইন করতে হবে। তোমাকে আমি কোনো শর্ত দিচ্ছি না। আমি শুধু আমার চাওয়াটুকুর কথাই তোমাকে জানালাম।’
সুপ্তি মাথা নাড়ল, ‘আপনার চাওয়াটুকু সত্যিই সুন্দর। এখানে আমার দ্বিমত থাকা উচিত নয়,
‘এখন তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারো।’
আমি একটু ভাবব বৈকি। চট করে আপনার মতো করে ভাবা এত সহজ কাজ নয়। আমি আপনাকে জানাব।’

আত্মগোপন করে থাকতে চাইলেও সুপ্তি পরদিন নিজের বাড়ি ফিরে গেল। ইমন তার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে আছে। কিন্তু কখনো ইনবক্সে কথা হয় না। ইমনের ফোন নাম্বারও তার কাছে আছে। কোনো দিন ফোন দেয়া হয়নি।

ছয় মাস পরের কথা। সুপ্তি আবার এসেছে তার ফুফু সুবর্ণার বাসায়। এবারও সে ইমনের সাথে দেখা করার নিয়তেই এসেছে।

সেদিনের মতোই বসার ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল ইমন। সুপ্তি নিঃশব্দে এসে তার মুখোমুখি বসল। ইমন তার দিকে তাকিয়েই বুঝল এই সুপ্তি আগের মতো নেই। বদলে গেছে বেশ।
‘কথা কি তুমি শুরু করবে না আমি?’ ইমন খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দিলো।
‘আপনার যদি কিছু বলার থাকে বলবেন। তবে আগে আমি বলব।’
‘আচ্ছা বেশ।’
‘আপনার সেদিনের কথাগুলো নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। ভেবে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এক পর্যায়ে আমার ফ্যামিলিতে আপনার কথা বলেছি। ওরা রাজি হয়নি। আমিও জোর করিনি। আশ্চর্যের ব্যাপার ওরাও আমাকে আর জোর করেনি। আমি মনের মধ্যে এখন আর কোনো চাপ অনুভব করি না, জানেন? আসলেই মনে-প্রাণে-কর্মে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারলে কোনো কষ্ট থাকে না। কষ্ট না থাকার ব্যাপারটা আমি এখন ভীষণভাবে অনুভব করছি।’
ইমন হাসল, ‘তাহলে তুমি ঠিকপথেই আছো। বাকিটা তাঁর ওপর ছেড়ে দাও। তিনি যাতে কল্যাণ রেখেছেন সেটাই হবে।’
‘ছেড়ে তো দিয়েই রেখেছি। আপনি আমাকে একটা নতুন পথ দেখালেন। এ পথে আমি আজীবন হাঁটতে চাই।’
ইমন মুখে কিছু বলল না। তার মনটা অন্যরকম প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.