ঢাকা, বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮

ধর্ম-দর্শন

স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র

ড. ইউসুফ আল কারযাভী

১৫ মার্চ ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৪:১৩


প্রিন্ট
স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র

স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র

সারা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের কর্তব্য হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক ও একনায়কত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচার ও জনগণের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। মেকি নয়, প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথে আন্দোলনকে সোচ্চার হতে হবে। স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে তারা জালেম শাসকদের স্বীকার করে না এবং একনায়কত্ববাদীদের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না। এমনকি কোনো জালেম শাসক সাময়িকভাবে কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য দৃশ্যত আন্দোলনের প্রতি সদিচ্ছা পোষণ করলেও।

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : যখন আমার উম্মাতকে দেখবে তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং কোনো অন্যায়কারীকে বলে না তুমি অন্যায় করছ, তাহলে তুমি তাদের আশা ছেড়ে দিতে পার (আল হাকিম)। তাহলে দাম্ভিক জালেম শাসকদের ব্যাপারে কি করতে হবে যে জনগণকে তারই উদ্দেশ্যে বলতে বাধ্য করে- কী ন্যায়পরায়ণ, কী মহান আপনি, হে আমাদের বীর, আমাদের ত্রাণকর্তা, মুক্তিদাতা।
আল-কুরআন কেবল নমরুদ, ফেরাউন, হামান ও অন্যান্য জালেম শাসকদের নিন্দা করেনি বরং যারা তাদের অনুসরণ করে, তাদের হুকুম মেনে চলে সে সব লোককেও ভর্ৎসনা করেছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ নূহের কওমের নিন্দা করে বলেছেন : আর তারা এমন লোকদের অনুসরণ করেছে, যাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি তাদের সমৃদ্ধি নয় ক্ষতির কারণ হয়েছে (সূরা নূহ : ২১)।
মহান আল্লাহ হুদের লোকদের সম্পর্কেও বলছেন : এবং তারা অনুসরণ করল প্রত্যেক উদ্ধত স্বৈরাচারীর আদেশ (সূরা হুদ : ৫৯)।

ফেরাউনের লোকদের সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে : তারা ফেরাউনের আদেশমতো চলতে থাকল এবং ফেরাউনের আদেশ মোটেও ঠিক ছিল না (সূরা হুদ : ৯৭)। অন্যত্র আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে : এবং তারা তার আনুগত্য করল। নিশ্চয়ই তারা নিতান্ত আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ছিল (সূরা যুখরুফ : ৫৪)।
আধুনিক কালের মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে ঘনিষ্ঠভাবে দৃষ্টিপাত করলে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন পরিবেশ ছাড়া ইসলামী চিন্তাধারা, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী জাগরণ বিকাশ লাভ করেনি অথবা ফলপ্রসূ হয়নি। জনগণের ইসলামকে আঁকড়ে থাকার ইচ্ছা স্বৈরাচারী জালেম শাসকদের আমলেই অবদমিত হওয়ার ফলে আন্দোলন ও জাগরণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। স্বৈরশাসকরা গুপ্ত নির্যাতন, প্রকাশ্যে হত্যা ছাড়াও অন্যান্য নিষ্ঠুর কৌশল প্রয়োগ করে জনগণের ওপর জোরপূর্বক সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম ও সেকুলারিজম চাপিয়ে দিয়েছে।
আমরা বিভিন্ন সময়ে তুরস্ক, মিসর, সিরিয়া, ইরাক, দক্ষিণ ইয়েমেন, সোমালিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ বহু মুসলিম রাষ্ট্রে স্বৈরশাসনামলে এ নিষ্ঠুর আচরণ প্রত্যক্ষ করেছি।

অন্য দিকে, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক শাসনামলে ইসলামী আন্দোলন ফলপ্রসূ ও বিকশিত হয়। যেসব সরকার জনগণের ওপর ত্রাস ও জুলুমের রাজত্ব কায়েম করেছিল তাদের পতনের পর ইসলামী আন্দোলনে প্রাণ সঞ্চারিত হতে দেখা যায়। সুতরাং আমি কল্পনাও করতে পারি না যে, ইসলামী আন্দোলন রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ছাড়া অন্য কোনো কিছুকে সমর্থন দিতে পারে, স্বৈরশাসকেরা কেবল ইসলামের কণ্ঠ ছাড়া আর সব কণ্ঠ সোচ্চার হতে দেবে, ইসলামী চিন্তাচেতনা ছাড়া আর সব চিন্তা-মতবাদ রাজনৈতিক অথবা অন্য যেকোনোরূপে প্রকাশ করতে দেবে। অথচ ইসলামী চিন্তাধারাই এ উম্মাহর প্রাণের কথা বলে এবং তাদের আকিদা বিশ্বাস, মূল্যবোধ, চেতনা ও অস্তিত্বের অভিব্যক্তি ঘটায়।

অবশ্য কোনো কোনো ইসলামপন্থী গণতন্ত্রের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে। এমনকি ‘গণতন্ত্র’ শব্দটির প্রতিও তারা সহনশীল নয়। এখানে আমি জোরের সাথে বলতে চাই, ইসলাম গণতন্ত্র নয় আর গণতন্ত্রও ইসলাম নয়। বরং আমি বলব, অন্য কোনো নীতি বা পদ্ধতির সাথে ইসলামের সম্পর্ক নেই। উদ্দেশ্য, পন্থা ও পদ্ধতি সবদিক দিয়ে ইসলাম অতুলনীয়। আমি চাই না পশ্চিমা গণতন্ত্র তার খারাপ দিকসহ ইসলামের মাঝে স্থান পাক। আমাদের স্বকীয় মূল্যবোধ ও আদর্শ যোগ করেই কেবল আমরা আমাদের সুবিস্তৃত কাঠামোর মধ্যে পশ্চিমা গণতন্ত্রকে অঙ্গীভূত করতে পারি।

তবে শাসকদের অভিলাষ ও খামখেয়ালির লাগাম টেনে ধরার জন্য পৃথিবীতে ইসলাম যে রাজনৈতিক নীতিমালার রূপায়ণ ঘটায় গণতন্ত্রের সৃষ্ট কৌশল ও রক্ষাকবচ তার অনেক কাছাকাছি। এ মূলনীতি হচ্ছে- পরামর্শ সভা বা শূরা, সদুপদেশ, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ, অন্যায় আদেশ অমান্য করা, কুফরি প্রতিরোধ করা এবং সম্ভব মতো শক্তি প্রয়োগ করে অন্যায় অবিচারের প্রতিকার। কেবল গণতন্ত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে পার্লামেন্টের ক্ষমতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে। শাসনতন্ত্র লঙ্ঘন করলে জনগণের প্রতিনিধিরা যেকোনো সরকারের ওপর অনাস্থা আনতে পারে। কেবল এরকম এক পরিবেশেই স্বাধীন সংবাদপত্র, স্বাধীন পার্লামেন্ট, বিরোধী দল ও জনতার শক্তির সর্বাধিক উপস্থিতি অনুভূত হয়।

এ ক্ষেত্রে অনেকের আশঙ্কা যে গণতন্ত্র জনগণকে শক্তির উৎস মনে করে এমনকি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও, যদিও আইন কেবল আল্লাহরই। এ আশঙ্কা অমূলক, কারণ আমরা যে জনগণের কথা বলছি তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক দিয়ে মুসলমান এবং তারা আল্লাহকে প্রভু, মুহাম্মদ সা:-কে রাসূল ও ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মেনে নিয়েছে। এ জনগণ তো ইসলাম এবং ইসলামের অলঙ্ঘনীয় নীতিমালা, চূড়ান্ত বিধিবিধানের পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন করবে বলে আশা করা যায় না।
যা হোক ইসলামের অলঙ্ঘনীয় বিধানের পরিপন্থী যেকোনো আইন বাতিল বলে গণ্য হবে এমন একটি অনুচ্ছেদ সংযোজন করে এ আশঙ্কা দূর করা যেতে পারে। কেননা ইসলাম হচ্ছে রাষ্ট্র ধর্ম এবং রাষ্ট্র সব প্রতিষ্ঠান ও রীতিনীতির বৈধতার উৎস বিধায় এর লঙ্ঘন করা যেতে পারে না।
এটি জেনে রাখা দরকার আইন আল্লাহর, এ মূলনীতি মেনে নেয়ার মাধ্যমে সতত পরিবর্তনশীল জীবন ও জাগতিক ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইন কানুন তৈরির ক্ষেত্রে জাতির অধিকার হরণ করা হয় না।
আমরা মূলগ্রন্থ কুরআন, শরিয়াহর সামগ্রিক লক্ষ্য ও ইসলামের মর্মবাণীর সীমার মধ্যে থেকে আইন বিধি প্রণয়ন করতে চাই। বাধ্যতামূলক আদেশ নিষেধের সংখ্যা খুবই কম, অন্য দিকে ঐচ্ছিক অথবা আইন প্রণয়নের উন্মুক্ত পরিসর খুবই ব্যাপক। কুরআনের হুকুম আহকাম এত নমনীয় ও বিস্তীর্ণ যে এগুলো থেকে একাধিক উপলব্ধির অবকাশ রয়েছে এবং একাধিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করা যেতে পারে। এরই ফলে ইসলামের সুবিস্তৃত কাঠামোর আওতায় কয়েকটি মাজহাব ও দর্শনের উৎপত্তি হয়েছে।
সম্প্রতি কাতারে প্রবর্তিত কয়েকটি আইন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছি এগুলোর মধ্যে কল্যাণ অর্জন ও অকল্যাণ বর্জনের ভিত্তিতে বহু সংখ্যক অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু কুরআনে দু-একটি ছাড়া এসব বিষয়ের সরাসরি উল্লেখ নেই।

মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামী আন্দোলনের প্রতি সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি হচ্ছে ফেরাউনি আইন। ফেরাউনরা মনে করত তাদের মতামতই অভ্রান্ত ও সঠিক যা কখনো ভুল হতে পারে না। এ ধরনের শাসকেরা ফেরাউনের যুক্তিকে গ্রহণ করে : আমি সেই পথই দেখাই যা আমি সঠিক মনে করি এবং তোমাদের কেবল মঙ্গলের পথই দেখাই (সূরা মু’মিন : ২৯)।
এসব শাসক বিরুদ্ধবাদী যেকোনো মতামতকে অগ্রাহ্য করে এমনকি দোষারোপও করে, ঠিক যেমন মূসা আ. এর ব্যাপারে ফেরাউন বলেছিল : আমার আশঙ্কা হয় যে সে তোমাদের ধর্মই পরিবর্তন করে ফেলবে অথবা রাজ্যের মধ্যে কোনো বিপর্যয় ঘটিয়ে ফেলবে (সূরা মু’মিন : ২৬)।
অনুবাদ : সানাউল্লাহ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫