খালেদা জিয়া
খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে ছলচাতুরি হচ্ছে : মির্জা ফখরুল

নিজস্ব প্রতিবেদক

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ খালেদা জিয়ার জামিন আগামী রোববার পর্যন্ত স্থগিত করায় বিএনপি ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত। দলটি মনে করে এতে দেশের উচ্চতম আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে ওকালতনামায় সই করতে দেয়া হচ্ছে না। আমাদের দেশনেত্রীকে হাইকোর্টে জামিন দেওয়ার পরে আবার দীর্ঘসূত্রিতা শুরু হয়েছে তার জামিন যাতে চূড়ান্ত না হতে পারে। তিনি যাতে বের হতে না পারেন সেজন্য সমস্ত ছল-চাতুরি করা হচ্ছে।  সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, ওকালতনামায় সই করানো বা সই নেয়া এটা একজন কারাবন্দির কারা অধিকার। কিন্তু সেটা করতে দিচ্ছেনা।

সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চের সিদ্ধান্তের পর গতকাল দুপুরে নয়া পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষ থেকে তিনি এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিএনপি। এসময় আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করার বিষয়ে দলের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, উচ্চতম আদালত যেকোনো আদেশ দিতে পারেন কিন্তু এক পক্ষের বক্তব্য শুনে এই ধরনের আদেশ দেয়া মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। এতে দেশের উচ্চতম আদালতের ঐতিহ্য এবং ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমরা এই রায়ে ক্ষুব্ধ, দুঃখিত ও আশাহত হয়েছি।

প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত খালেদা জিয়াকে হাই কোর্টের দেওয়া জামিন আপিল বিভাগ আগামী রোববার পর্যন্ত স্থগিত করেন। দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বিভাগ বুধবার এ আদেশ দেন।

নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এজে মোহাম্মদ আলী, আবদুস সালাম, আতাউর রহমান ঢালী, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কেন্দ্রীয় নেতা ফজলুল হক মিলন, নজরুল ইসলাম মঞ্জু, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, নওশাদ জমির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করা প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা ক্ষুব্ধ হয়েছি, বিস্মিত হয়েছি যে, তাকে ওকালত নামায় সই করা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তার কাছে সঠিকভাবে ওকালতনামা প্রেরণ করা হচ্ছে না এবং অনেকসময় তাকে সই করতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে আইনি প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং আমাদের আইনজীবীরা যারা তাকে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তারা সঠিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছেন না।

তিনি বলেন, দেশে এই সরকার বিচার বিভাগকে সম্প‚র্ণভাবে দলীয়করণ করার চেষ্টা করছে, এটা করে আসছে, করছে। তার প্রমাণ আমরা দেখেছি যে, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে জোর করে পদত্যাগ করে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এরপর সুপারসিড করে অন্যদেরকে যারা জুনিয়র ছিলেন তাদেরকে আজকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে সমগ্র বিচার ব্যবস্থায় এর প্রতিফলন পড়েছে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা যারা এই সরকারের যে অপকৌশল মামলা-মোকাদ্দমায় জর্জরিত হচ্ছি, আমরা যাতে আইনি সুবিধাগুলো না পাই তার ব্যবস্থা করছে। তাদের মূল অস্ত্র হচ্ছে মিথ্যা মামলা দেয়া, সারাদেশে ৭৮ হাজার মামলা দেয়া হয়েছে, ১১ লক্ষের উপরে আমাদের আসামী। এমন একটা জেলা নেই, উপজেলা নেই, এমন একটা ওয়ার্ড নেই যেখানে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা নেই। সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে কেউ বাদ নেই। আইনজীবীরা এই মামলার বাইরে নেই।

দলের সাথে যুক্ত সাবেক আমলাদেরও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ছক তৈরি করে মামলা দেয়া হচ্ছে, আসামী করা হচ্ছে। এটা নতুন করে নির্বাচনের বছরে শুরু হয়েছে। আমরা যখন বলছি যে, আমরা নির্বাচন করতে চাই যদি নিরপেক্ষ সরকার থাকে, নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়। তখনই এসব মামলা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই তারা আমাদেরকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চায়, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আমাদের আসতে দিতে চায় না। সেজন্য আজকে দেশনেত্রীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে। তাকে রাজনীতি থেকে নির্বাচন থেকে দ‚রে সরিয়ে রাখার জন্য এসব অপকৌশল করছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, ছাত্রদল ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মিজানুর রহমান রাজ ও বরিশালে ডিবিসির ক্যামেরাম্যান সুমন হাসানের ওপর পুলিশী নির্যাতন এবং রিমান্ডে পুলিশি নির্যাতনে নিহত তেজগাঁও থানা ছাত্র দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন মিলনের ওপর বর্বরোচিত নির্যাতনের কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, এরকম নিমর্মতা আগে আমরা কখনো দেখিনি। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর এই ধরনের কার্যক্রম ছিলো। এখন সরকার একে একে সব প্রতিষ্ঠান ধবংস করে ফেলেছে, আজকে তারা আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর চড়াও হয়েছে। আদালত হচ্ছে মানুষের শেষ ভরসার স্থল, সেখানেও আজকে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই রায়ে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটছে।  দুভার্গ্যজনকভাবে আজকে আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে আমরা সেটাই দেখতে পারছি।

মওদুদ আহমদ বলেন, শুনানির সময়ে দুদকের আইনজীবীর বক্তব্য শুনার পর বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের কোনো বক্তব্য না শুনে হাইকোর্টে দেয়া জামিন আদেশ রোববার পর্যন্ত স্থগিত করার আদেশ দেয়া হয়েছে। এতো তাড়াহুড়া করে অপর পক্ষকে না শুনে এরকম একটি রায় আমরা কেউ প্রত্যাশা করিনি। আইনজীবীরা এই একতরফা শুনানির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

বেগম খালেদা জিয়ার হাইকোর্টে জামিন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্থগিত করায় আমাদেরকে বিস্মিত করেছে। সারাদেশের মানুষ দেশের উচ্চতম আদালত থেকে যেটা প্রত্যাশা করে নাই, সেটাই ঘটেছে। আদালত বিচারপ্রার্থী ও জনগণের প্রতিপক্ষ হতে পারে না। দেশে সুবিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের।

তিনি বলেন, আজকে নিশ্চিত আদালত সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। আগে নিম্ন আদালতের বিচারকদের কার্যবিধি, পদোন্নতির বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যাস্ত ছিলো এখন সেটা আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে চলে গেছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ সরকারের সমালোচনা করে বলেন, একটা মামলায় জামিন পাওয়ার পর আরেকটা মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট সম্পূর্ণ বেআইনি। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে এটা একেবারেই বেআইনি। তারপরও তারা করছেন। কারা করছেন? যারা নিম্ন আদালতে আছেন, কর্মকর্তা-কর্মচারি আছেন এবং বিচারক আছেন। তাদের জবাবদিহিতা হলো নির্বাহী বিভাগের ওপর।

ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা যদি ধবংস হয়ে যায় দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হবে। আমি আশা করবো বর্তমান সরকার দেশটাকে রক্ষা করার জন্য অন্তত: আইনের শাসন কায়েম থাকে, সব মানুষ যাতে সমভাবে আইনের শাসন পায়, আইনমত বিচার পায়, রাজনৈতিক নেতাদের চেহারা দেখে যাতে বিচার কার্য না চলে সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বলেন, দেশে আইনের শাসন হুমকির সম্মুখীন। আইনের শাসন রক্ষার জন্য, বিচার ব্যবস্থা রক্ষার জন্য আজকে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু আমাদের আইনজীবীদের ওপর ভরসা করলে এই অগণতান্ত্রিক সরকারের কর্মকাণ্ড রোখা যাবে না। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে দেশে বিচার ব্যবস্থা থাকবে না, সাধারণ মানুষ বিচার পাবে না

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.