ঢাকা, শুক্রবার,২৭ এপ্রিল ২০১৮

থেরাপি

পিতার পুষ্পপ্রীতি

জোবায়ের রাজু

১৫ মার্চ ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

গুরুজনে কহেনÑ মানুষ বুড়ো হলে শিশু হয়ে যায়।
কথাটা আমি দারুণ আমলে নিয়েছি। আমলে নেয়ার কারণ আব্বার শিশুসুলভ আচরণ। অবশ্য তিনি যে আচরণ করেন, এটাকে পুরোপুরি শিশুসুলভ আচরণ বলা যায় না। এই বয়সে এসে আব্বা শিশুদের মতো ফুলের বাগান পরিচর্চায় আহামরি কাণ্ড পাকিয়ে ফেললেন। খুব অল্প দিনে আব্বা নানান জাতের ফুলের গাছে বাড়িটাকে একটা পুষ্পবিতান বানিয়ে ফেলেছেন। দূর-দূরান্তে যেখানেই ফুলের গাছের সন্ধান পান, সেখানেই ছুটে যান ফুল গাছের জন্য। আব্বার এই পুষ্পপ্রীতির মধ্য দিয়ে আমার শৈশব আমাকে নীরবে উঁকি মারে। একদা আমিও পুষ্পপ্রেমী ছিলাম। এ কারণে বাড়ির আনাচে কানাচে ফুলের সমারোহ ছিল। লেখাপড়া ভুলে তখন বাগানের কার্যে নিবেদিত থাকতাম বলে আম্মা রোজ আমাকে বকাবকি করতেন।
সেই আম্মা এখনো বকাবকি করেন। আমাকে নয়। আব্বাকে। সকাল-সন্ধ্যা স্বামীটি তার নাওয়া-খাওয়া ভুলে ফুল বাগানে শ্রম দেন বলে আম্মার কণ্ঠে সিংহের গর্জন এনে বলেন ‘এই বয়সে কী সব কাণ্ড! ঢং দেখে বাঁচি না।’
আম্মার কথাকে পরোয়া না করে আব্বা রীতিমতো ফুল কুমার হয়ে ফুলের রাজ্যে বিচরণ করেন। ফলে অল্প দিনে আমাদের বাড়ির পরিবেশ মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের চেয়ে কোনো অংশে কম হয়ে ওঠেনি। আব্বার দক্ষ হাতের আগাছা দমন আর প্রতিটি গাছ পরিপূর্ণ সেবা পেয়ে অল্প দিনে ফুল ফুটেছে ডালে ডালে। প্রজাপতির আনাগোনা, ভ্রমরের এক্কাদোক্কা আর ফুল-পাপড়ির হাস্যোজ্জ্বল চাউনিÑ সব মিলিয়ে বাড়িখানা আমাদের বেশ চকচক করতে শুরু করেছে।

২.
পাশের বাড়ির রুহিকে বড় ভালো লাগে আমার। বড় মায়াবতী মেয়ে। হাসলে গালে টোল পড়ে। তখন রুহিকে আর রুহি মনে হয় না, মনে হয় বলিউড স্টার প্রীতি জিনতা।
প্রতিবার রুহিকে প্রেম নিবেদন করতে গেলে আব্বার বাগানের একটি করে গোলাপ ছিঁড়ে নিয়ে যাই। বাগান থেকে প্রকাশ্যে নয়, গোপনে ফুল ছিঁড়ি। আব্বা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, যে তার বাগানের ফুল ছিঁড়বে তার শাস্তি আছে। ফলে আব্বার অগোচরে রোজ একটি করে গোলাপ ছিঁড়ে রুহির জন্য নিয়ে যাই। কিন্তু রুহি আমাকে পাত্তা না দিয়ে গোলাপটি ছুড়ে ফেলে দেয়।
ফুল বাগানে আব্বার একরোখা মনোবল বলে তিনি অনুমান করতে পারেন তার বাগান থেকে রোজ কেউ-না-কেউ ফুল ছেঁড়ে। কিন্তু চোরকে হাতেনাতে ধরতে পারছেন না বলে কোনো প্রতিবাদ করতে পারছেন না। তবে রোজ একবার করে পরিবারের সদস্যদের সামনে ভাষণ দেন এভাবেÑ চোখের সামনে এ বাড়ির কাউরে ফুলে হাত দিতে দেখলে কাঁচা খাইয়া ফালামু কইলাম।

৩.
রুহির প্রেমে সকাল-সন্ধ্যা মশগুল থাকি বলে মন বসে না পড়ার টেবিলে। এই নিয়ে আমার প্রতি আম্মার অভিযোগের অন্ত নেই। ‘পড়ায় মন বসে না কেন’, ‘ফেল করলে মান যাবে’, ‘সারা দিন আনমনে কী ভেবে একা একা হাসো’Ñ এ ধরনের সংলাপ বলে আম্মা কানের কাছে এসে সারাক্ষণ ঘ্যানর ঘ্যানর করেন। ফলে আম্মার প্রতি আমার রাগ জমে। বিরক্ত হই। এত পড়ে কী হবে!
সেদিন দেখি আম্মা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে সাজছেন। মাথার বিশাল খোঁপায় শোভা পাচ্ছে লাল টকটকে এক গোলাপ। মানে কি! আম্মা কী করে আব্বার চোখ ফাঁকি দিয়ে এই গোলাপ ছিঁড়লেন! হুম, আজ আব্বাকে দিয়ে আম্মাকে একটা বকা খাওয়াতে হবে।
গেলাম আব্বার কাছে। আব্বা বারান্দার চেয়ারে মনোযোগ দিয়ে পেপার পড়ছেন। পাশে বসে বললাম, ‘আব্বা, আপনার বাগানের ফুল চোর ধরেছি, তাকে কেমন শাস্তি দেবেন?’
আব্বা হিংস্র গলায় বললেন ‘কে, কে সে? এক্ষুনি তাকে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে ফেলব।’
আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘আম্মা আপনার বাগানের ফুল ছিঁড়ে খোঁপায় পরেছে’।
আব্বা আমতা আমতা করে বললেন, ‘ইয়ে মানে...।’
আমি আহ্বানের সুরে বললাম ‘কী হলো, যান!’
আব্বা তরল গলায় বললেন, ‘পরে যাবো। এখন যা। পেপারে একটা জরুরি খবর পড়ছি।’
আমি জানি, আব্বা কোনো দিনও আম্মাকে কিছু বলবেন না। কারণ ফুলের মতো তিনি আম্মাকেও ভালোবাসেন।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫