হাসপাতালের সামনে স্বজনদের কান্না
হাসপাতালের সামনে স্বজনদের কান্না
নেপালে বিমান দুর্ঘটনা

পরিচয় সনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশি নাগরিকদের লাশ দ্রুত দেশে আনতে আরো কয়েকদিন লাগতে পারে। কারণ নিহত অনেকের লাশ পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। সোমবারের ওই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তবে নেপালের সংবাদমাধ্যমগুলো খবর দেয়, নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫১ জন, তাদের মধ্যে ২৮ জন বাংলাদেশি। এসব লাশ কাঠমান্ডুর ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা হাসপাতালের ফরেনসিক ল্যাবে রয়েছে। লাশ গুলোর ময়না তদন্ত করা হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া শেষ করে লাশ হস্তান্তরে আরো কয়েকদিন লাগবে বলে বাংলাদেশ ও নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নেপালে অবস্থানরত বাংলাদেশের বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল বলেছেন, নিহতদের ময়নাতদন্ত শেষ করতে অন্তত তিন দিন লাগবে। খবর হিমালয়ান টাইমস, কাঠমান্ডু পোষ্ট এর।

কাঠমান্ডুর ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তার প্রমোদ শ্রেষ্ঠকে উদ্ধৃত করে বিবিসির খবরে বলা হয়, পরিচয় সুনিশ্চিত হয়েই তারা লাশ হস্তান্তর করতে চান। লাশের পরিচয় জানতে চারটি দল কাজ করছে। এর মধ্যে দুটি দল ময়না তদন্ত করছে। একটি দল লাশের নানা স্যাম্পল নিয়ে সেখান থেকে পরিচয় জানার চেষ্টা করছে আর অন্য দলটি নিহতদের স্বজনদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য নিয়ে নিশ্চিত হবার চেষ্টা করছে। এই চারটি দল সম্মিলিতভাবে একটি লাশের পরিচয় নিশ্চিত করার কাজটি সম্পন্ন করবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রতিটি লাশের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও জানানো হচ্ছে।

মঙ্গলবার ১১ টি লাশের পোস্ট মর্টেম সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এই এগার জন কারা সেটি নিশ্চিত করা যায়নি। ৪৯টি লাশের ময়না তদন্ত চলবে আরো কয়েকদিন। কর্তৃপক্ষ বলছেন, পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে স্বজনের কাছে হস্তান্তর কিংবা নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়।

শ্রেষ্ঠ আরো জানান, এ প্রক্রিয়ার পরেও যদি পরিচয় নিশ্চিত না হয় তাহলে শেষ কাজটি হবে ডিএনএ পরীক্ষা করা। এখন লাশের পরিচয় নিশ্চিত করতে কতদিন সময় লাগবে সেটি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না, তবে অন্তত তিন চারদিন লাগবে ময়না তদন্তের জন্যই। প্রাথমিক তদন্তে পরিচয় নিশ্চিত হতেই এক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বুধবার কাঠমান্ডুর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল বলেছেন, নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে আটজনকে শনাক্ত করা সম্ভব। বাকি কারও চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, নিহতদের ময়নাতদন্ত শেষ করতে অন্তত তিন দিন লাগবে। যাঁদের শনাক্ত করা যাবে, তাঁদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব লাশ ঢাকায় নেওয়া হবে। যাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা যাবে না, তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য ঢাকা থেকে দুটি মেডিকেল টিম আজ কাঠমান্ডু আসবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ময়নাতদন্ত যেখানে হয় সেখানেও আমরা গিয়েছিলাম। তারা আমাদের নিশ্চিত করেছেন, তিন দিন পরেই লাশ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

বিমানমন্ত্রী জানান, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ টেস্ট শেষে লাশ শনাক্তের পর হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হবে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান তাকে জানিয়েছেন, যেসব লাশের পরিচয় পাওয়া যাবে, চাইলেই তা হস্তান্তর করা হবে। কোনও আইনি জটিলতা যেন না থাকে তাও তারা দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

মন্ত্রী বলেন, ‘নাম-পরিচয় দিয়ে স্বজনরা আমাদের দূতাবাসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ফরম পূরণ করে দেবেন। আমরা রাষ্ট্রদূতকে দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি এ ব্যাপারে তৎপর থাকবেন। যে লাশ আগে শনাক্ত হয়ে যাবে কিংবা যার চেহারা বোঝা যাবে, আমাদের রাষ্ট্রদূত সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন। লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ডিএনএ টেস্ট প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও চিকিৎসকদের নেপালে পাঠাবেন।

আহতদের উন্নত চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে সবাই বাইরে চিকিৎসা নিতে চাইলে করাতে পারবেন। তবে বিমান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করাতে চাইলে তা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

এদিকে কাঠমাণ্ডুতে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও জানানো হয়েছে আইনি জটিলতার কারণে নেপাল থেকে লাশ নিতে কিছুটা সময় লাগবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বলেন, ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্ত শেষ করতে আরও চার দিন সময় লাগবে। তারপর তারা স্বজনদের তালিকার সাথে মিলিয়ে তথ্য নিশ্চিত করে লাশের পরিচয় নিশ্চিৎ করবেন। লাশ ফেরত পাঠাতে হয়ত আরও দু’এক দিন বেশি লাগতে পারে। পুড়ে যাওয়ার কারণে যাদের লাশ শনাক্ত করতে ডিএনএ মেলানোর দরকার হবে, তাদের ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে জানান তিনি।

রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের বলেন, সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ১৮ জনের ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে। লাশ শনাক্ত করার পর দেশে কীভাবে পাঠানো হবে তা নিয়ে নেপাল ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

নেপালে স্বজনদের খোঁজে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে না- এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক হাসপাতালে থাকছেন। দূতাবাসেও একটি কো অর্ডিনেশন সেন্টার খোলা হয়েছে।

ইউএস বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল হাসান বুধবার ঢাকার বারিধারার সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ও নেপাল সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা এলে তারা যে কোনো মুহূর্তে নেপাল থেকে মরদেহগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসতে প্রস্তুত।

হাসপাতালের সামনে স্বজনদের কান্না
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেয় হচ্ছে কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে। তাদের স্বজনরা সেখানে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কাঠমান্ডুর এক হাসপাতালের সামনে দেখা গেছে স্বজনদের একজনকে আরেকজন জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। এমন ছবি প্রকাশ করেছে কাঠমান্ডু পোস্ট।

ওই পত্রিকার সাথে হাসপাতালের বিছানা থেকে কথা বলেছেন বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রী আশিষ রনজিত। তিনি বালাজুতে একটি ট্রাভেল এজেন্সির অপারেটর। তিনি সহ তাদের এজেন্সির বেশ কয়েকজন বাংলাদেশে এসেছিলেন প্রশিক্ষণ নিতে। আশিষ এখন চিকিৎসা নিচ্ছেন নরভিচ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে।

উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ চার ক্রু ও ৬৭ যাত্রীসহ ৭১ জন আরোহী নিয়ে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে পৌঁছায়। অবতরণের সময় এতে আগুন ধরে যায়। এরপর বিমানবন্দরের কাছেই একটি ফুটবল মাঠে সেটি বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫০ জন। এর মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক ২৬ জন। বেঁচে আছেন আরও ১০ বাংলাদেশি

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.