লাশ দেশে আনতে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা
লাশ দেশে আনতে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা
নেপালে বিমান দুর্ঘটনা

লাশ আনতে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাহাড় পর্বতের দেশ নেপালের ত্রিভ, বন আন্তজার্তিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শের মুহুর্তে বেসরকারী বিমান পরিবহন সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের অত্যাধুনিক মডেলের একটি উড়োজাহাজ বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। ১২ মার্চ সোমবার দুপুরে ঘটনাটি ঘটলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত ওই ফ্লাইটের অভিজ্ঞ ও দক্ষ পাইলট আবিদ সুলতান, কো পাইলট, সাংবাদিকসহ মোট ৫০ জন নিহত হওয়ার বিষয় নিশ্চিত করেছে নেপাল সরকার।

এসময় বাংলাদেশ, নেপাল, চায়নাসহ অন্যান্য দেশের মোট ২১ জন যাত্রী গুরুতর আহত হন। তাদের আশংকাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দেশটির সরকারী এবং বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সোমবার দুপুরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করা ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বোম্বারডিয়ার মডেলের এয়ারক্রাফটে কোন ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা না পড়লেও ‘রহস্যজনকভাবে’ ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার আগেই একটি বাঁক খেয়ে বিস্ফোরিত হয়ে পাশের খোলা একটি মাঠে পড়ে। মুহুর্তে পুরো বিমানটিতেই আগুন ধরে যায়। এসময় বিমানের ভেতর শুধু চিৎকার আর আহাজারীর শব্দ শুনেছেন আশপাশের লোকজন। এরপরই আগুনে নিখোঁজ হয়ে পড়ে বেশীরভাগ যাত্রী। পরে দেখা গেছে আগুনে অধিকাংশ যাত্রী পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। কারো চেহারা চেনারই উপায় নেই। উদ্ধারকারী দল হতভাগ্যদের লাশগুলো উদ্ধার করে হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এ ঘটনার পর ব্যস্ত ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

মুহুর্তে খবরটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়লে এভিয়েশন ইন্ড্রাষ্টিসহ বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে। একইভাবে আতংক ছড়িয়ে পড়ে এয়ারলাইন্স সেক্টরেও। মর্মান্তিক বিমান দুঘটনার পর পরই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল সোমবার সকালে নেপালের উদ্দেশ্য ঢাকা ত্যাগ করেন। মন্ত্রীকে বহনকারী বিমানটিকেও ত্রিভুবন বিমানবন্দরের চারপাশে নির্ধারিত সময়ের এক ঘন্টারও বেশী চক্কর দিয়ে পরে অবতরন করাতে হয়। পাশাপাশি একই দিন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষও নিহতদের পুড়ে যাওয়া লাশ শনাক্ত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের খোজ নেয়ার জন্য প্রতি যাত্রীর স্বজনদের নিজ খরচে নেপাল নিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেন ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। তবে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিহত কারো লাশই দেশে আনা সম্ভব হয়নি।

এদিকে দুঘটনায় নিহতদের স্বজনরা তাদের প্রিয় মানুষটির লাশ দ্রুত যাতে দেশে আনা হয় সেজন্য বারিধারার ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করছেন। ঘটনার তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও লাশ দেশে না আসায় স্বজনরা এখন হতাশ।

এ প্রসঙ্গে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের পর পরই আগুন ধরে যায়। এতে অধিকাংশ লাশ পুড়ে বিকৃত হয়ে পড়েছে। বেশীরভাগ লাশ শনাক্ত করতে সমস্যা হচ্ছে। এজন্য ডিএনএ পরীক্ষার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে ডিএনএ পরীক্ষা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা নেপাল প্রশাসন থেকে আশানুরুপভাবে সাড়া পাচ্ছি না। লাশ দ্রুত দেশে আনতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী আলোচনায় যদি বসেন তাহলে সহজে সমস্যার সমাধান হতে পারে। তিনি বলেন, বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী এখন নেপালে আছেন। ওনার মাধ্যমে এ উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, নিহতদের স্বজনদের মধ্যে যাদের পাসপোর্ট নেই তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে তাদের পাসপোর্ট ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ নিজ খরচে করে নেপালে নিয়ে যাবে। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হলে বাবা, মা, ভাই-বোনের যে কারো নেপালে যেতে হতে পারে। আর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটিও ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ নিজ খরচে নিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।

কবে নাগাদ লাশ দেশে আসার সম্ভবনা রয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা আমরা বলতে পারবো না। তবে লাশ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। যেসব স্বজন নেপালে গেছেন তাদের লাশ দেখতে দেয়া হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা তাদের (নেপাল) প্রক্রিয়ার অংশ।

তিনি বলেন , আপাতত ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান পরিচালনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিস্তারিত আমরা পরে জানিয়ে দেবো। নেপালের আকাশে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিধ্বস্থ হওয়ার কারণ বলতে গিয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত তিনটি কারণে বিমান দুঘটনা ঘটে থাকে। এক যান্ত্রিক ক্রুটি, ২ আবহাওয়াজনিত এবং ৩ হিউম্যান ফেইলিউর।

এখন ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বেলায় কোনটি ঘটেছিল সেটি তদন্ত কমিটির পূর্নাঙ্গ প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আর এটির জন্য ওই বিমানে থাকা ব্ল্যাকবাক্সও ইতিমধ্যে উদ্ধার হয়েছে। ওই ব্ল্যাকবক্সের রেকর্ড পর্যালোচনা করলেই ককপিটে পাইলট ও কো পাইলট এবং টাওয়ারের দায়িত্বে থাকাদের মধ্যে কি কি ধরনের কথোপকথণ হয়েছিল, সেটি বেরিয়ে আসবে। একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, নিয়ম মোতাবেক ব্ল্যাকবক্সে কথোপকথনের রেকর্ড শেষের ৩০ মিনিট সংরক্ষণ থাকে।

ওই হিসাবে পাইলট ল্যান্ডিং করার আগের ৩০ মিনিটের কি কি কথা আছে সেটি পর্যালোচনা করলে তখন বোঝা যাবে আসলে কার দোষে বিমানটি ক্র্যাশ হলো ? তবে নেপালের এয়ারপোর্টটি খুবই ক্রিটিক্যাল মন্তব্য করে তিনি বলেন, একটি এয়ারক্রাফট যখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রবেশ করে থাকে, তখন প্রথমেই এরিয়া কন্ট্রোলার নিয়ন্ত্রনে নেয়। এক পর্যায়ে এরিয়া কন্ট্রোলার বিমানটি ল্যান্ডিং করানোর জন্য বিমানবন্দরের টাওয়ারের সাথে সংযোগ স্থাপন করে দেয়। কোন কোন দেশে টাওয়ারের পরে আবার এপ্রোচ কন্ট্রোলারের কাছেও পাইলটের যোগাযোগ স্থাপন করানোর নিয়ম আছে। যেমন মালয়েশিয়াতে টাওয়ার থেকে এপ্রোচ কন্ট্রোলারের কাছে সংযোগ তৈরী করানো হয়। তারাই বিমানটি অবতরনের পর কোথায় পার্কিং হবে সেটি নিশ্চিত করে দেয়। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক মতে, কোন একটি ‘ভুলের’ কারণে বিমানটি দুঘটনায় আছড়ে পড়ে আগুন ধরে যায়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.