স্ক্রিপাল ও তার কন্যা
স্ক্রিপাল ও তার কন্যা

ব্রিটেনে রহস্যময় গোয়েন্দা তৎপরতা রাশিয়ার

আনিসুর রহমান এরশাদ

মস্কো-লন্ডনের বিরোধ এখন তুঙ্গে, চলছে ঠাণ্ডা লড়াই। পক্ষত্যাগী সাবেক রুশ গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার কন্যাকে হত্যা চেষ্টায় রাশিয়াকে দায়ী করে দেশটির বিরুদ্ধে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ওপর ক্রমেই চাপ বাড়ছে। ঘটনাটিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আখ্যা দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোরতর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়ার সম্ভাবনাও জোরালো হয়েছে। থেরেসা মে বলেছেন, ‘সাবেক সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার কন্যাকে রুশ গুপ্তচরেরা বিষপ্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করেছিল। এই ঘটনায় রাশিয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ওই হামলায় ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদানটি নার্ভ গ্যাসের একটি গ্রুপ। হয় রাশিয়া এ ধরনের কাজ করে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, নতুবা সরকার দেশের নার্ভ গ্যাস প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত আমরা কখনো মেনে নেব না। স্ক্রিপালের ওপর আক্রমণ আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ। তাদের এই আক্রমণ আমাদের দেশের বিরুদ্ধে বিরতিহীন আক্রমণের অংশ বলে মনে করছি। এ দিকে নার্ভ গ্যাস প্রয়োগের ফলে দু’টি নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু ঘটতে যাচ্ছে।’ 

ইতোমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন রাশিয়ার দূতকে ডেকে পাঠিয়েছেন। একই সাথে নোভিচক নামের কর্মসূচির বিষয়ে রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণসংক্রান্ত কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরবরাহের তাগিদ দেয়া হয়েছে। এ দিকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সাড়া না পেলে হাউজ অব কমন্সে দেশটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে আলোচনা চলবে বলেও জানান তিনি। অনেকে বলছেন- স্ক্রিপাল হত্যাচেষ্টাকে ব্রিটেনের মাটিতে রাশিয়ার চালানো ‘রাষ্ট্র-পরিচালিত হামলা’। ব্রিটেনের তদন্ত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনই হামলার অনুমোদন দিয়েছেন। এমতাবস্থায় থেরেসা মে’র সরকার রাশিয়া থেকে কূটনীতিক প্রত্যাহার করতে পারে কিংবা অবরোধ আরোপ করতে পারে এমন আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ব্রিটেন এ পদক্ষেপ নিলে সেই স্নায়ুযুদ্ধ যুগের পর এখন রাশিয়ার সাথে দেশটির সম্পর্ক একেবারে তলানিতে এসে ঠেকবে।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই ফাইভের কাজই হচ্ছে এসব আগ্রাসন থেকে ব্রিটেনকে মুক্ত করা। ব্রিটেনের মাটিতে এখনো রাশিয়ার অনেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা রয়েছেন। এমআই ফাইভ দাবি করেছে- ‘রাশিয়া ব্রিটেনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতি ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠেছে। রাশিয়া নিজ আয়ত্তে থাকা অত্যাধুনিক সব হাতিয়ারকে কাজে লাগাচ্ছে। পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে রাশিয়া ক্রমেই আরো আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণ করছে। প্রচারণা, গোয়েন্দা ও নাশকতামূলক তৎপরতার পাশাপাশি সামরিক, শিল্প প্রকল্প এবং অর্থনীতিবিষয়ক গোপন তথ্য হাতিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সাইবার হামলারও আশ্রয় নিচ্ছে মস্কো।’ গত কয়েক দশক ধরেই রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ব্রিটেনে গোপন তৎপরতায় নিয়োজিত রয়েছে এবং তারা ব্রিটেনকে গোপন হুমকি দিচ্ছে।

রাশিয়ার গুপ্তচরকে হত্যার চেষ্টায় ‘নার্ভ এজেন্ট’ রাসায়নিক প্রয়োগে তোলপাড় চলছে। নার্ভ এজেন্ট হচ্ছে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক যা স্নায়ুতন্ত্রকে বিকল বা অকার্যকর করে দিতে পারে এবং দৈহিক কর্মক্ষমতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সাধারণভাবে মুখ অথবা নাক দিয়ে এই রাসায়নিক দেহে প্রবেশ করানো হয়; কিন্তু চোখ বা ত্বক তা শোষণ করতে পারে। বিশেষ গবেষণাগারে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নার্ভ এজেন্ট বা ভিএক্স নার্ভ গ্যাস রাসায়নিকটি উৎপাদন করা হয়। তাদের শরীরে নোভিচক নামের যে ধরনের গ্যাস পাওয়া গেছে; বিশ্বে একমাত্র রাশিয়া ওই গ্যাস প্রয়োগ করে থাকে। আশির দশকে রাশিয়া ওই রাসায়নিক অস্ত্রের আবিষ্কার করে।
ব্রিটেনের পুলিশ বলছে, গত ৪ মার্চ বিকেলে সাবেক রুশ গোয়েন্দা ৬৬ বছর বয়সী সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার ৩৩ বছর বয়সী মেয়ে ইউলিয়া স্ক্রিপালকে হত্যার চেষ্টায় স্নায়ুকে আঘাতকারী রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে। ব্রিটেনের উইল্টশায়ারে সালিসবারি শহরের একটি বিপণি বিতানের বাইরে একটি পার্কে অচেতন অবস্থায় বাবা ও মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। কন্যাকে নিয়ে তিনি যেখানে দুপুরের খাবার খেয়েছিলেনÑ জিজ্জি নামের ওই পিজার দোকানেই তার স্নায়ুকে আঘাতকারী এই নার্ভ এজেন্টের খোঁজ মিলেছে। সের্গেই স্ক্রিপালের স্বজনদেরও দাবি এতে রাশিয়া জড়িত। যে নার্ভ গ্যাসে আক্রান্ত হয়েছেন স্ক্রিপাল ও তার কন্যা সেই গ্যাসটি সাধারণত কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বানাতে পারে না। তবে বিভিন্ন দেশের সরকার তা বানাতে সক্ষম।

রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ থেকে অবসরে যাওয়ার পরও ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন সের্গেই স্ক্রিপাল। রাশিয়ার একজন সামরিক গোয়েন্দা হয়েও নিজের দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এমআইসিক্সকে তথ্য দিতেন ইউরোপে রাশিয়ার এজেন্টদের সম্পর্কে। জিআরইউর পুরো টেলিফোন ডাইরেক্টরি তিনি সরবরাহ করেছেন ব্রিটেনের গোয়েন্দাদের কাছে। এ বিষয়টি ধরা পড়ার পর তাকে ২০০৪ সালে গ্রেফতার করা হয়। ২০০৬ সালে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয় রুশ কর্তৃপক্ষ। রুশ গোয়েন্দা বিভাগে তার কোড নাম ছিল ‘ফোর্থউইথ’। ব্রিটেনের হয়ে কাজ করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে রাশিয়ার সরকার জানায়, কর্নেল স্ক্রিপাল ১৯৯০ সাল থেকে ব্রিটেনের জন্য গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। এর জন্য তাকে এক লাখ মার্কিন ডলার দেয়া হয়েছিল। ২০১০ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) হাতে বন্দী ১০ রুশ গুপ্তচরের বিনিময়ে মস্কো কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত চার বন্দীর মধ্যে একজন ছিলেন স্ক্রিপাল। যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য আটক হওয়া রাশিয়ার গ্লামারাস নারী গোয়েন্দা আনা চ্যাপম্যানকে হস্তান্তরের বিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তির পর তিনি ব্রিটেনে আশ্রয় নেন।

মস্কোর সাথে লন্ডনের বিরোধ নতুন নয়। রুশ প্রশাসন স্বপক্ষত্যাগীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী ব্যবস্থা এর আগেও গ্রহণ করেছিল। এ ধরনের ১৪টি হত্যাকাণ্ড এমন সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছিল যে, হত্যাকারী কোনো প্রমাণ রেখে যায়নি। তা সত্ত্বেও ব্রিটিশ প্রশাসন ও জনমনে স্থির বিশ্বাস যে, এসব হত্যার পেছনে রুশ প্রশাসনের সক্রিয় তৎপরতা রয়েছে। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.