শ্রীলঙ্কায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি মসজিদ
শ্রীলঙ্কায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি মসজিদ

মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা : শ্রীলঙ্কায় সামাজিক বিভেদ

আহমেদ বায়েজীদ

শ্রীলঙ্কার পর্যটন নগরী ক্যান্ডি ও আশপাশের এলাকার সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা একটি আকস্মিক ঘটনা ছিল বলে জানিয়েছেন, সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন। দেশটির সর্ববৃহৎ জাতিগত গ্রুপ সিংহলি সম্প্রদায়ের এক লরি ড্রাইভারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে ঘটনার সূত্রপাত। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ সিংহলিরা হামলা চালায় মসজিদ, মুসলিমদের বাড়িঘর ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে। ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। এতে নিহত হয় দুই মুসলিম নাগরিক। দাঙ্গার পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকায় ৬ মার্চ দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা।

প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী যে অতিরিক্ত ক্ষমতা লাভ করেছে তার উদ্দেশ্য ছিল শুধু সহিংসতা প্রতিরোধ করা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পর দিন সহিংসতায় উসকানি দেয়া ও গুজব ছড়ানো বন্ধ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেয় শ্রীলঙ্কা সরকার। অনলাইনে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানোর ঘটনার পরই মূলত সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন বেশ কয়েকজন উসকানিদাতাকে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ।

মন্ত্রিপরিষদের মুখপাত্র রাজিথা সেনারত্নে মনে করেন, এই সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো ছিল পরিকল্পিত ও সংগঠিত। অপরাধীদের অনেকেই অন্য এলাকা থেকে এসেছে বলে জানান তিনি। এ কথার মাধ্যমে এই কর্মকর্তা মূলত সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসের সমর্থকদের প্রতি ইঙ্গিত করেন। রাজাপাকসের শাসনামালে ২০১৪ সালে আলুথাগামায় সিংহলি-মুসলিম দাঙ্গায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছিল।

রাজাপাকসে বরাবরই সিংহলি জাতিয়তাবাদীদের সমর্থনপুষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে তার জনপ্রিয়তাও বেড়েছে বহুগুণে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তার গঠিত নতুন দল ৩৪০ আসনের মধ্যে ২৩৯টিতে জয়লাভ করেছে। যদিও সাম্প্রতিক এই সহিংসতার পেছনে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র থাকার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন রাজাপাকসে। তিনি সামাজিক উত্তেজনা নিরসনের সরকারের ব্যর্থতার নিন্দা জানান।

গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটি মুসলিম-সিংহলি দ্বিতীয় দফা সঙ্ঘাত। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি ভিডিওর সূত্র ধরে পূর্ব উপকূলীয় এলাকা আমপাড়ায় তাণ্ডব চালায় সিংহলিরা। ভিডিওটির বিষয়বস্তু ছিল এমন- এক মুসলিম রেস্টুরেন্ট কর্মী শিকার করেছেন যে, সিংহলি নারীদের কাছে বিক্রি করা খাবারে বন্ধ্যাকরণ ওষুধ মেশানো হয়। শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মুসলিম, যাদের একটি বড় অংশ বাস করে ক্যান্ডি ও দেশটির পূর্বাঞ্চলে। আর জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ বৌদ্ধ। তামিলদের সংখ্যা ১৩ শতাংশ, যাদের বেশিরভাগই হিন্দু।

দেশটিতে সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব ছিল তামিল ও সিংহলিদের মধ্যে। ২০০৯ সালে শেষ হয়েছে তামিলদের সাথে সিংহলি সরকারের ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের। রক্তক্ষয়ী এই গৃহযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে স্বাধীন তামিল ভূখণ্ডের দাবিতে অস্ত্র তুলে নেয়া লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম। সিংহলিদের দ্বারা বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা বলে তারা চাইতো স্বাধীনতা। সিংহলিদের সাথে মুসলিমদেরও আস্থার সঙ্কট রয়েছে। অনেক সিংহলি মনে করেন, মুসলিমদের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে, যা দেশটিতে তাদের সংখ্যাগুরু অবস্থানের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে গৃহযুদ্ধের পুরো সময়টাতে মুসলিম ও সিংহলিরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানেই ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, সিংহলি উগ্রবাদীরা তামিলদের সাথে তাদের শত্রুতাকে মুসলিমদের ওপর টেনে নিয়ে যেতে চায়। প্রসঙ্গত, শ্রীলঙ্কার মুসলিমদের বেশির ভাগেরই মাতৃভাষা তামিল, আর এটিও উগ্রবাদীদের মুসলিম বিদ্বেষের আরেকটি কারণ। মুসলিমদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দরিদ্র সিংহলিদের শোষণকারী হিসেবে তাদের আখ্যা দেয়া হচ্ছে। লঙ্কান কলামিস্ট তিসারানি গুনাসেকারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা সিংহলিরা তামিলদের সাথে (সম্পর্কের ব্যাপারে) ফেল করেছি, মুসলিমদের সাথে যদি একই পরিস্থিতি হয় ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না এবং একটি নতুন ও আরো ভয়াবহ যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের শাস্তি দেবে।’ 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.